ঢাকা, ১৬ মে রোববার, ২০২১ || ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
good-food
৭০

বাংলাদেশে তিন ধরনের সাংবাদিক আছেন!

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০০:১৩ ৩ মে ২০২১  

বাংলাদেশে মোটা দাগে তিন ধরনের সাংবাদিক আছেন। একদল অন্য কিছু করতে পারেননি, তাই সহজ পথ সাংবাদিক। একদল ধান্দাবাজি করার জন্য সাংবাদিক। আর তৃতীয় দলে আছেন সেই মানুষগুলো, যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে, নীতি-নৈতিকতা নিয়ে দেশ আর মানুষের জন্য কিছু করার ব্রত নিয়ে সাংবাদিকতায় এসেছিলেন। এই সময়টা তাদের জন্য ভয়াবহ দুঃসময়। 

 

প্রথম দলে যারা আছেন, মানে যারা অন্য কিছু না পেয়ে সাংবাদিকতা করছেন; তাদের কাছে পেশাটা আর কাজের মতোই একটা চাকরি। যতেক্ষণ না অসৎ হচ্ছেন, এদের নিয়ে সমস্যা নেই। এরা বিপ্লব না করলেও কারও ক্ষতি করেন না।  কিন্তু দ্বিতীয় দলে যার আছেন, তারা নানা ধান্দাবাজি করার জন্য আসেন। তাদের কেউ সাংবাদিকতা করে টাকা চান, কেউ সম্পদ, কেউ বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, আবার কেউ রাজনৈতিক পদ। এদের জন্য মানুষ মূলত সাংবাদিকদের গালি দেয়। তবে এরা এসব পরোয়া করেন না। নিজেদের স্বার্থ ফিকিরেই এরা ব্যস্ত থাকেন। যত সংকট তৃতীয় দলকে নিয়ে যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে সাংবাদিকতায় আসেন। 

 

ততৃীয় দলের এই মানুষদের কাছে সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। আরও অনেক কিছু করার কমবেশি সুযোগ থাকলেও দেশ-মানুষের জন্য কাজ করবেন-এমন স্বপ্ন নিয়েই এই মানুষেরা সাংবাদিকতায় এসেছিলেন, এখনো কিছু আসেন। এদের অনেকেই পুরোপুরি পেশা ছেড়েছেন, কেউ কেউ আমার মতো আধাআধি আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকেই এখনো আছেন। আমি নিজেকে এই তৃতীয় দলের মনে করি।

 

নিজের অভিজ্ঞতায় জানি, তৃতীয় এই দলের মানুষেরা যখন দেখেন কোনও অন্যায় দেখেন, তারা মেনে নিতে পারেন না। এই মানুষগুলো এখন খুব যন্ত্রণায় আছেন। এই মানুষগুলো যখন দেখে, সাংবাদিকতার নামে মরে যাওয়া ভিক্টিমকে অপরাধী আর অভিযুক্তকে নিষ্পাপ বানানোর নিদারুণ চেষ্টা চলছে, তখন তারা কষ্ট পান। যে গণমাধ্যমেই তারা থাকুন তারা কষ্ট পান। 


সাংবাদিকরা তিন ধরনের হলেও এই দেশের গণমাধ্যম মালিকদের চরিত্র দেখলে একটাই চরিত্র খুঁজে পাবেন। এই দেশে ট্রান্সকম গ্রুপসহ হাতে গোনা কয়েকটা প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বেশিরভাগই নিজের ব্যবসা বা স্বার্থ হাসিলে গণমাধ্যম করেছেন। আর সেই কারণেই যখনই প্রয়োজন তারা নিজের স্বার্থে গণমাধ্যমকে কাজে লাগায়। রাষ্ট্রের এখানে কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।

 

নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও নেই।  একবার ভাবেন, ক্ষমতাশালী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নতুন পুরান মিলে হাজারো অভিযোগ আছে। কিন্তু গণমাধ্যম মালিক-সম্পাদক-সাংবাদিক সবাই সেখানে চুপ। কেউ চুপ ব্যবসা বা বিজ্ঞাপনের স্বার্থে, কেউ চুপ বাধ্য হয়ে। এখানে কোনও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেই। এটা গণমাধ্যমের সামস্টিক ব্যর্থতা। এর কারণ ওই মালিকানা। 

 

এই মালিকানা বা স্বার্থের কারণেই মৃত একটা মেয়েকে অপরাধী বানাতে ফরমায়েশি দারুণ সব অনুসন্ধান চলছে। না সব গণমাধ্যম হয়তো সেটা করছে না। কিন্তু যারা করছে তাদের জন্য লজ্জিত হতে হচ্ছে পুরো সাংবাদিকতাকে। এ নিয়ে দীর্ঘ একাডেমিক আলোচনা হওয়া দরকার। আগেই বলেছি, এই দেশের সাংবাদিকতায় রাষ্ট্রীয় বাঁধা আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা সেলফ সেনসরশিপ। মালিক-সম্পাদকরা তাদের স্বার্থে নানা নিউজ গিলে ফেলে। এটাই সমস্যা। 


আমি মনে করি, এই দেশের সাংবাদিকতা যদি ঠিক করতে হয়; তাহলে তৃতীয় দলের মানুষ যারা সত্যি সত্যি দেশ ও মানুষদের জন্য সাংবাদিকতা করতে চান; তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর দরকার এমন একজন মালিককে যারা চাইবেন গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে চলবে, নিজের আয়ে নিজে চলবে। এক্ষেত্রে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত লতিফুর রহমান ছাড়া আমার সামনে খুব সফল আর কোনও নাম নেই। 

 

এই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে তিনিই বোধহয় একমাত্র মানুষ যে তার মিডিয়াগুলোকে সেভাবে ব্যবহার করতে চাননি বা করলেও সামান্য করেছেন। কিন্তু এমন লোক আর কোথায়? এই দেশে কী এমন একজন ব্যবসায়ী বা কোনও প্রতিষ্ঠান আছে, যিনি বলতে পারেন আমি রাজি, আমি স্বাধীন সাংবাদিকতা করার জন্য একটা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করবো। 


খুঁজতে থাকুন। পাওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। আচ্ছা আসলেই যদি এমন মালিক না পাওয়া যায়, তাহলে কীভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নেওয়া যায়? কোনও ট্রাস্ট? নাকি অন্য কিছু। রাষ্ট্র কি অসৎ সাংবাদিকতা বন্ধের উদ্যোগ নিতে পারে? কোনও আইনকানুন করে কী নিয়ন্ত্রণ বরা সম্ভব? নাকি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। 

 

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের বলবো, আলোচনা করুন। গণমাধ্যমকে যদি প্রতিষ্ঠান বানানো না যায়, যদি সত্যিকারের মালিক আর সৎ সাংবাদিক-এই দুই একসাথে না হয়, তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যত আরও অন্ধকার। তখন দেখা যাবে, বাংলাদেশে ডিজিটাল মিডিয়ায় কিছু ব্যক্তি হয়তো ভালো সাংবাদিকতা করছেন। কিন্তু সত্যিকারের কোনও গণমাধ্যম নেই যাকে মানুষ আস্থায় নিতে পারে। 

 

আমি মনে করি এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার। আপনারা যারা লোকজন কথায় কথায় সাংবাদিকদের গালি দেন, আপনাদের কাছে সমস্যা সমাধানের কোনও মন্ত্র আছে কী? থাকলে দিন। আমাদের সবাইকে মিলেই এই সংকটের সমাধান করতে হবে। কারণ, একটা দেশের অগ্রগতির জন্য স্বাধীন ও সত্যিকারের সাংবাদিকতা খুব জরুরী। এখন ভাবুন তাহলে উপায় কী?

 

লেখক : শরিফুল হাসান

ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট ডেইলি স্টার