ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০২৩ || ১৩ আশ্বিন ১৪৩০
good-food
৩৬১

যুবক বিজ্ঞানীর ব্লগারে পরিণত হওয়ার গল্প

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০০:০৮ ৪ জানুয়ারি ২০২৩  

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সারাবিশ্বের জনগণের জীবনযাপনে অনেক পরিবর্তন বয়ে এনেছে।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণার ব্যাপার নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের ওপরও প্রভাব বিস্তারকারী ফ্যাক্টর।

 

সম্প্রতি কিছু চীনা যুবকবিজ্ঞানী গবেষণার পাশাপাশি, অনলাইনে ব্লগার হিসাবে কাজ করছেন। তারা বিভিন্ন মজার জ্ঞান অনলাইনে ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করেন।তাদের এ কাজের ফলে এখন আরও বেশি নেটিজেন বিজ্ঞানসম্পর্কিত নানান তথ্য জানার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন।তেমনি একজন ব্লগার হলেন চান ছেন লিয়াং।

 

৩৪ বছর বয়সের চাং ছেন লিয়াং চীনের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বহুমুখী মিডিয়া কেন্দ্রের পরিচালক।ছোটবেলা থেকে তিনি বিজ্ঞানসম্পর্কিত থিসিস পড়তে পছন্দ করতেন এবং মাস্টার্স ডিগ্রীর জন্য পড়াশোনাকালে তিনি বিজ্ঞান ম্যাগাজিনের জন্য অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন।সেই সময় ইন্টারনেটে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ বা ব্লগ লেখা ব্যাপক প্রচলিত হয়ে গেছে। তখন থেকে গবেষক চাং অনলাইনে তাঁর গবেষণার লেখাও প্রকাশ করতে থাকেন।

 

২০১৯ সাল থেকে তিনি ছোট ভিডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্য তুলে ধরতে শুরু করেন। তা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে যুবকরা মোবাইলে ভিডিও দেখতে বেশ আগ্রহী। অনলাইনে বিজ্ঞান সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। সঠিক তথ্যের পাশাপাশি, অসত্য তথ্যও পাওয়া যায়। এটা বিজ্ঞানীদের জন্য দুঃখের ব্যাপার। কারণ এমন ভিডিও সবাইকে ভুল বুঝতে সাহায্য করে।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর গবেষক চাং খেয়াল করেন যে, একটি পোস্ট দিলে কম সময়ের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রায় পাওয়া যায়। অনেকে তাঁর পোস্ট শেয়ার করেন। কেউ কেউ একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেন, যা গবেষক চাংয়ের জন্য উত্সাহব্যাঞ্জক ব্যাপার। তিনি নিয়মিত ওয়েবসাইটে সবার সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতে থাকেন। এর কারণ তিনি নেটিজেনদের চিন্তাভাবনা বা আগ্রহ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

 

কেউ কেউ ভ্রমণের সময় প্রকৃতিতে বিদ্যমান বিভিন্ন উদ্ভিদ, পশুপাখির  ছবি বা ভিডিও পোস্ট করেন। সাধারণত এমন পোস্ট অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেকে তা নিয়ে আলোচনা করেন। প্রজাতির নাম কী? উদ্ভিদ বা পশুর নাম কী?—ইত্যাদি নানান প্রশ্নের উত্তর তারা জানতে চান। অনেকেই এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পান না বা পোষ্টদাতাও কখনও কখনও এসব প্রশ্নের উত্তর জানেন না। তখন গবেষক চাং এ বিষয় নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

 

গবেষক চাং ধারাবাহিক ভিডিও বানিয়ে আসছেন। এসব ভিডিওর শিরোনাম ‘ইন্টারনেটে জনপ্রিয় বিভিন্ন প্রজাতির সনাক্তকরণ’। ভিডিওতে মজার মজার কথা বলে যুবকদের আকর্ষণ করেন তিনি।বর্তমানে অনেক ভ্লগার গবেষক চাংয়ের মতো বিজ্ঞানভিত্তিক ভিডিও পোস্ট করছেন। সেটা বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট  তথ্য প্রচারে খুব ভালো পদ্ধতি।

 

বায়োমেট্রিক্স ব্লগার চাং ছেন লিয়াংয়ের ওয়েবসাইটের ফলোয়ারের সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি।তাঁর দৃষ্টিতে প্রামাণ্যচিত্র দেখতে ভালো। আর বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য তেমন একটা আকর্ষণীয় নয়। তাই তিনি নিজের সংগৃহীত বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

 

তিনি বলেন, চীন অনেক বিশাল দেশ। এখানে বিভিন্ন ধরনের জীব দেখা যায়। এমন বিশেষ পশুপাখিও রয়েছে, যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই। তাই পান্ডা বা সোনার বানর বাদ দিয়ে, তিনি সবার জন্য অপরিচিত পশুপাখিসম্পর্কিত তথ্য-উপাত্তা তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী। এটা তাঁর জন্য বেশ মজার ব্যাপার। তিনি চান, তাঁর ভিডিও নতুন প্রজাতি তথা অপরিচিত বা কম পরিচিত প্রজাতি সম্পর্কে নেটিজেনদের শিক্ষিত করে তুলুক।

 

চীনের হাইনান প্রদেশের রেইনফরেস্ট পার্ক নিয়ে ভিডিও তৈরির সময় তিনি ভাবলেন যে, কিভাবে সবার সামনে সরাসরি মজার রেইনফরেস্ট তুলে ধরতে পারেন? পরে তিনি একটি ছোট খাঁড়ি অনুসরণ করে আশেপাশের বিশেষ প্রজাতির তথ্য তুলে ধরেন। যদিও তা ছিল হাইনান প্রদেশের বিভিন্ন প্রজাতির একটি ক্ষুদ্রাংশ।

 

ছোট দিক থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমের বড় প্রকৃতির গল্প শেয়ার করেন তিনি। এটা সবাই পছন্দ করে।বিজ্ঞানবিষয়ক ভিডিও বানানোর অনুভূতি সম্পর্কে চাং ছেন লিয়াং বলেন, আসলে ভিডিও বানানোর জন্য বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হয়।

 

যেমন, ভিডিওর খসড়ায় বিভিন্ন প্রজাতির তথ্য যুক্ত করতে হয়, প্রতিদিনের শুটিংয়ের কাজও অনেক ক্লান্তিকর। ভিডিওতে একটি ক্যাপশন বা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দুই-তিনটি লাইনের কথা থাকে।তবে এর পেছনে আধা ঘন্টারও বেশি সময় ধরে শুটিং করতে হয়। হাইনান প্রদেশে ধারাবাহিক ভিডিও করা হয়েছে। রেইনফরেস্টসম্পর্কিত হলেও, প্রতিটি ভিডিওর আলাদা বিষয়। তাই প্রতিবার খসড়ার প্রস্তুতিমূলক কাজও আলাদা।

 

গবেষক চাংয়ের কাছে বাচ্চাদের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।তাঁর সবচেয়ে খুশির ব্যাপার বাচ্চারা তার ভিডিও দেখে বড় হয়ে বিজ্ঞানী হতে চায়।কারণ বাচ্চারা চীনা জাতির ভবিষ্যতের আশা।

 

যদি তাদের মধ্যে আরো বেশি বিজ্ঞানী হয়, তবেতারা অবশ্যই দেশের উন্নয়নে আরো বেশি অবদান রাখতে পারবে।এ সম্পর্কে চাং বলেন, অনেক বাচ্চা মনোযোগ দিয়ে ভিডিও দেখে এবং তারা অনেক বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্য মুখস্ত করতে পারে।তারা পিতামাতাকে বলে, তাড়াতাড়ি হোমওয়ার্ক শেষ করে বিজ্ঞানভিত্তিক ভিডিও দেখতে হবে। তারা জাদুঘর বা বইয়ের দোকান থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক বই পড়ে। এটা চাংয়ের জন্য উত্সাহব্যাঞ্জক ব্যাপার।

 

মনোবিজ্ঞানবিষয়ক তথ্য প্রচারকারী ব্লগার ইথানের ফলোয়ারের সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। তাঁর মতো ব্লগাররা পিলিপিলি, ওয়েপো আর টিকটকসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে মজার কথা ও চমত্কার উদাহরণের মাধ্যমে চীনা নেটিজনেদের জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন কঠিন  বিষয় তাঁরা সহজ-সরল ভাষায় তুলে ধরেন। সাধারণ মানুষ তাই তাদের উপস্থাপনা পছন্দ করেন।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত উন্নয়নের কারণে তথ্য সম্প্রচারের পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। যুবক বিজ্ঞানীরা এ শ্রেষ্ঠ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের জানা তথ্য-উপাত্ত সম্প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভুমিকা পালন করে যাচ্ছেন।আমরা জানি ইন্টারনেটে অনেক মিথ্যা তথ্য রয়েছে।তাই ইন্টারনেট থেকে সত্যি কথা ও তথ্য খুঁজে নেওয়া অতি জরুরি ব্যাপার।জটিল ও কঠিন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও জ্ঞানের ব্যাপারে এ কথা আরও বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

 

সহজ ভাষায় প্রচারিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও তথ্য-উপাত্ত সমাজের মানুষকে বিজ্ঞানমনষ্ক করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।তাই, যুবক গবেষকদের ব্লগিংয়ের কাজ অতি গুরুত্বপূর্ণ।তাঁরা কেবল নিজেদের গবেষণার বিষয়ে বেশ দক্ষ তা নন, বরং তারা অনেক সহজভাবে এ সব জটিল জটিল তথ্য সাধারণ মানুষের উপযোগী করে প্রকাশও করতে পারেন।ফলে তাঁদের ব্লগ নেটিজনেদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়।

 

আসলে অনেক ওয়েবসাইটের ব্লগার কেবল টাকা উপার্জনের জন্য তাদের অ্যাকাউন্ট চালু করেছেন।যত বেশি ফলোয়ার তত বেশি টাকা উপার্জনের সুযোগ। তবে, যুবক বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি আলাদা।তাঁরা মনে করেন, সবার জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত প্রচার করা স্বেচ্ছাসেবকের মতো কাজ।কারণ, জ্ঞান হচ্ছে সমাজের অভিন্ন সম্পত্তি। এ জ্ঞান জানার অধিকার সবার আছে।

 

অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কেউ কেউ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ পাননি।তাদের অনেকেই এখন সহজে ব্লগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।জ্ঞানের কোনো সীমা নেই। যুবক বিজ্ঞানীরা তাই বিনা পয়সায় ওয়েবসাইটে বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারে ভূমিকা রাখছেন।

 

অতীতকালে বিজ্ঞান গবেষণার জ্ঞান বা তথ্য কেবল বিজ্ঞানীদের মধ্যে আদান-প্রদান ও বিনিময় হতো।এখন যুবক বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রয়াসে আরও বেশি জ্ঞান ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।বিজ্ঞানের প্রসারের পথে অন্তত একটি বাধা দূর হয়েছে। বস্তুত, জনগণকে বিজ্ঞানমনষ্ক করে তুলতে ইন্টারনেট রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা।

 

মোদ্দাকথা, ইন্টারনেটযুগ বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রচার ও প্রসারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।নতুন মিডিয়ার উন্নয়নও বিভিন্ন জ্ঞানের সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।এখন যুবকবিজ্ঞানীদের উচিত পেশাগত ও জটিল তথ্য সঠিকভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি, সাধারণ দর্শকদের অনুভূতি ও নতুন জ্ঞানের জন্য তাদের চাহিদার বিষয়ও বিবেচনা করা। 

 

আশা করা যায়,নতুন গণমাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানীরা আরও বেশি সংখ্যায় কনটেন্ট প্রচার করবেন এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আরও সচেতন হবে এবং সমাজ গড়ে উঠবে বিজ্ঞানমনষ্ক হয়ে।