ঢাকা, ০৫ জুন শুক্রবার, ২০২৬ || ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
good-food
১৩

রামিসা হত্যার রায় রোববার, সৃষ্টি হতে যাচ্ছে নতুন ইতিহাস

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:৪০ ৫ জুন ২০২৬  

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় রোববার (৭ জুন) রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছেন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর মাধ্যমে দেশের বিচারিক ইতিহাসে কোনো হত্যা ও ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তির অন্যতম নজির সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে গত ১ জুন অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর ৪ জুন আইনি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ায় অভিযোগ গঠনের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় মামলার রায় ঘোষণার পথ সুগম হলো।

সরকারের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলার বিচারকার্যে দ্রুত অগ্রগতি দেখা গেছে। গত ২৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দেন, ‘এক মাসের মধ্যে রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

অন্যদিকে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, সরকার এই মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় গত ১৯ মে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে তার প্রতিবেশী সোহেল রানা নিজের ফ্ল্যাটে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় পরদিন রামিসার বাবা মামলা দায়ের করেন।

সরকার ২৩ মে শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া সহিংসতার মামলার বিচারের জন্য বিশেষভাবে গঠিত নবগঠিত ‘ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’-এ রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়।

পুলিশ ২৪ মে মূল অভিযুক্ত ধর্ষক ও হত্যাকারী সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী ও সহযোগী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। একই দিনে ট্রাইব্যুনালে আসামিদের পক্ষে লড়ার জন্য সরকার অ্যাডভোকেট মুসা কলিমুল্লাহকে রাষ্ট্রীয় ডিফেন্স কাউন্সেল (আসামিপক্ষের আইনজীবী) হিসেবে নিয়োগ দেয়।

ট্রাইব্যুনাল গত ১ জুন এই মামলার অভিযোগ গঠন করে এবং ২ জুন মাত্র এক দিনেই রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড করার কাজ শেষ করা হয়। তালিকাভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন সেদিন আদালতে সাক্ষ্য দেন এবং পরবর্তীতে আসামিপক্ষ তাদের জেরা করে।

সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, খালা মাহমুদা আক্তার, মামা মিজানুর রহমান লিটন ও মনিরুজ্জামান শাহীন, প্রতিবেশী মনির হোসেন, জাকিরুল ইসলাম রাজু ও শেখ আবু সামা, কনস্টেবল রমা আক্তার ও শরিফ মিয়া, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ড. নাসাদ জাবিন, মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনায়েদ, উপ-পরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান।

এরপর, সরকার নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কলিমুল্লাহ সব সাক্ষীকে জেরা করেন।

গত ৩ জুন দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের বক্তব্য পেশ করেন। সেখানে সোহেল রানা ক্ষমা প্রার্থনা করে। অন্যদিকে স্বপ্না আক্তার নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।

৪ জুন এই মামলার আইনি যুক্তিখণ্ডন (আর্গুমেন্ট) অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে।

দেশের ইতিহাসে অতীতেও ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দ্রুত সময়ে রায় ঘোষণার নজির রয়েছে। এর আগে, ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ একটি ধর্ষণ মামলার রায় দেয়, যা মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় মূল আসামি খালাস পেয়ে যায়।

এছাড়া, ২০২৫ সালের ১৭ মে মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও পরবর্তীতে হত্যার একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ট্রাইব্যুনাল ২০ কার্যদিবসের মধ্যে এই মামলার নিষ্পত্তি করে।

ওই বছরের ৬ মার্চ শিশুটি তার বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গেলে বোনের শ্বশুর হিটু শেখ তাকে ধর্ষণ করে। এরপর ১৩ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।

ঘটনার পর, ভুক্তভোগী শিশুর মা ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ১৩ এপ্রিল পুলিশ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় এবং ২৩ এপ্রিল আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।

ফেনীর একটি দ্রুত বিচার আদালত ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর বহুল আলোচিত সোনাগাজী মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ জন আসামির সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন এবং প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।

এর আগে, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গত ২৯ জুন মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয়। ফেনী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১০ জুলাই এটি আমলে নেয় এবং ২০ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। আদালত ২৭ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৬২টি শুনানির কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও সাক্ষ্যগ্রহণ করে। মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচারকার্য নিষ্পত্তি করা হয়।