ঢাকা, ১৭ অক্টোবর শনিবার, ২০২৬ || ১ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৭৭২

ডাকসু-তে ছাত্রলীগের একচেটিয়া জয়

কোটা নেতা নূর ভিপি, রাব্বানী জিএস

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৪২ ১২ মার্চ ২০১৯  

অনিয়ম-কারচুপি-নির্যাতন-জালভোট-জোর করা সহ  অভিযোগ অনেক।  পাশাপাশি অধিকাংশ প্যানেলের প্রার্থীদের বর্জন। এসবেরই মধ্যেই শেষ হয় ২৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ - ডাকসু ও হল নির্বাচন।  
এতে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্রলীগ প্রায় সব পদেই জয়ী হলেও ভিপি পদটিতে জিতেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা নূরুল হক নূর। জিএস পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রলীগের রাব্বানী।

সোমবার অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ছাত্র হল সংসদগুলোতেও ছাত্রলীগ পেয়েছে একচেটিয়া জয়। অবশ্য ছাত্রী হলগুলোকে জয়ী হয়েছে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

তবে স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেলের বাইরে থেকে কাউকে ডাকসুর ভিপি পদে দেখার সুযোগ ঘটছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছর বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ব্যানারে জোরাল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিত পান এই ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক নূর।

ভিপি পদে নূর পেয়েছেন ১১ হাজার ৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট।

সোমবার ভোটচলাকালিন রোকেয়া হলে নূরের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় আহত হন এই ভিপি প্রার্থী। যদিও একে ‘নাটক’ বলেছেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

 

জিএস পদে ছাত্রলীগের রাব্বানী ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের রাশেদ খান পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৩ ভোট।

এজিএস পদে জয়ী হয়েছেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ফারুক হোসেন পেয়েছেন ৫ হাজার ৮৯৬ ভোট।

ভোররাত সাড়ে ৩ টার পর সিনেট ভবনে উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন।  

 

ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে বিজয়ী

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক - সাদ বিন কাদের

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক - আরিফ ইবনে আলী

কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক - বিএম লিপি আক্তার

আন্তর্জাতিক সম্পাদক - শাহরিমা তানজিনা অর্নি

সাহিত্য সম্পাদক - মাজহারুল কবির শয়ন

সাংস্কৃতিক সম্পাদক - শামস ই নোমান

ক্রীড়া সম্পাদক - শাকিল আহমেদ তানভীর

ছাত্র পরিবহন সম্পাদক - রাকিব হাওলাদার

সদস্য

চিবল সাংমা, নজরুল ইসলাম, রাকিবুল হাসান, রাকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য, তানভীর হাসান সৈকত, রাইসা নাসের, সাবরিনা ইতি, ইশাত কাশফিয়া ইরা, নিপু ইসলাম তন্বী, হাইদার মোহাম্মদ জিতু, তিলোত্তমা শিকদার, জুলফিকার আলম রাসেল ও মাহমুদুল হাসান।

 

ভিপি পদে নূরের নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হৈ চৈ শুরু করেন ছাত্রলীগ কর্মীরা। তারা ভিপি পদের ফল না মানার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও ব্যালট ছিনতাইকারীয়ের জন্য নূরকে দায়ী করে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। 

রাব্বানী বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইমোশনকে ব্যবহার করে রোকেয়া হলের প্রভোস্টের ওপর হামলা চালিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মামলা করেছে। আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।

নূরকে ইসলামী ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্ট দাবি করেও স্লোগান তোলেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ২৫টি পদের ২৩টিতে ছাত্রলীগের প্যানেলের (সম্মিলিত শিক্ষার্থী পরিষদ) প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন।

ভিপির পাশাপাশি সমাজসেবা সম্পাদক পদে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আখতার হোসেন জয়ী হয়েছেন।

 

সোমবার ভোট শেষ হবার আগেই অধিকাংশ প্রার্থীর সঙ্গে নূরুল হক নূরের প্যানেলও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল।

ছাত্রদল, বাম জোট ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলেন। আগে থেকে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়েছিল বলে তাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ভোটারদের বাধা দেয়া অভিযোগও তুলেছেন।

এই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে উপাচার্য ভবন ও কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের পর ভোট বর্জনকারীদের পক্ষে মঙ্গলবার বিক্ষোভের ডাক দেন বাম জোটের ভিপি প্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী।

বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র তুল ধরে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন নিজস্ব উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ৮ শিক্ষকও।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ নেতারা দাবি করেছেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং তাদের ঠেকাতে ছাত্রদলসহ অন্য প্যানেলগুলো পরিকল্পিতভাবে ‘নাটক’ সাজিয়েছে।

বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন হয়েছে বলে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান দাবি করলেও এই নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনায় ‘বিব্রত ও ভাষাহীন’ হওয়ার কথা বলেছেন।

 

৪৩ হাজার ভোটারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে স্থাপিত কেন্দ্রে সকাল ৮টায় ভোট শুরুর কথা থাকলেও কুয়েত মৈত্রী হলে ভোট দওয়া বস্তাভরতি ব্যালট পেপার উদ্ধার হওয়ায় এবং রোকেয়া হলে ব্যালট বাক্স নিয়ে শিক্ষার্থীদের সন্দেহে ভোট শুরু হয়নি নির্দিষ্ট সময়। পরে ওই দুই ছাত্রী হলে দেরিতে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

ডাকসুর ২৫টি পদের পাশাপাশি হল ছাত্র সংসদের ১৩টি পদে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দেন শিক্ষার্থীরা।

ভোটগ্রহণের পর গণনা শেষে হল সংসদগুলোর ফল হলেই ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

সব হল থেকে ফলাফল পৌঁছনোর পর কেন্দ্রীয় সংসদ অর্থাৎ ডাকসুর ফল ঘোষণা করা হয় নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন থেকে। উপাচার্য বলেন, তিনি প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার তৈরি করা ফলাফল উপস্থাপন করছেন।

স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট নামে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দুটি জোট করে নামে ভোটের লড়াইয়ে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদও দেয় পূর্ণ প্যানেল।

সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রদল, বাম জোট, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ-বিসিএল, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, ইশা ছাত্র আন্দোলন, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ও ছাত্র সমাজের পূর্ণ প্যানেল ছিল।

মোট ১২টি প্যানেলের বাইরেও ভিপি পদে ৯ জন এবং জিএস পদে ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। ভিপি পদে মোট প্রার্থী ছিলেন ২১ জন; জিএস পদে ১৪ জন এবং এজিএস পদে ১৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

 

সব মিলিয়ে ডাকসুতে ২৫ পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ২২৯ জন। ১৮টি হল সংসদে ১৩টি করে ২৩৪টি পদের বিপরীতে ৫০৯ জন নেমেছিলেন ভোটের লড়াইয়ে।

ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। এরশাদ সরকারের আমলে ওই নির্বাচনে ছাত্রদল জয়ী হয়েছিল; ভিপি হয়েছিলেন আমানউল্লাহ আমান, জিএস হয়েছিলেন খায়রুল কবির খোকন।