ঢাকা, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার, ২০২৬ || ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
good-food
১৩

প্রক্রিয়া শুরু

মালয়েশিয়ায় যেভাবে হবে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০০:৩১ ১৬ অক্টোবর ২০২৬  

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর জন্য ৩৩৮টি রিক্রুটিং ও প্রসেসিং এজেন্সিকে এরইমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে মালয়েশিয়া। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে নিয়োগে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে দেশটি।

বৃহস্পতিবার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া।

নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো বৈধ ও যোগ্য এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।

১০ হাজার কর্মী যাবেন বিনা ব্যয়ে

মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা ব্যয়ে নিয়োগের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কর্মীদের আর্থিক চাপ কমাতে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার।

তবে এ সব কর্মী কোন কোন খাতে নিয়োগ পাবেন, কবে থেকে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে এবং বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর শর্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি বিজ্ঞপ্তিতে।

এর পরিবর্তে মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারের লক্ষ্য শুধু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা নয় বরং কর্মীরা যেনো আইনসম্মত, সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কাজের সুযোগ পান তা নিশ্চিত করা। নিয়োগের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও অনিয়ম বন্ধেও নজরদারি বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

যেভাবে চলবে নিয়োগপ্রক্রিয়া

নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার সংগ্রহ করতে পারবে। এরপর বাংলাদেশের আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে কর্মী নির্বাচন এবং নিয়োগের পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করবে তারা।

যে এজেন্সি জব অর্ডার সংগ্রহ করবে, কর্মী নির্বাচনের দায়িত্ব সেই এজেন্সির হাতেই থাকবে। প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করে নিজস্ব রিক্রুটিং লাইসেন্সের আওতায় বাংলাদেশের সরকারি ছাড়পত্রসংক্রান্ত কার্যক্রমও সম্পন্ন করতে পারবে তারা।

অন্যদিকে, বোয়েসেল ও অনুমোদিত ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহায়তা করবে। এর মধ্যে কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং নির্ধারিত অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বিষয় রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এর মধ্যে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র সংগ্রহও রয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বোয়েসেল ও অনুমোদিত ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি বিএমইটির ছাড়পত্র গ্রহণের জন্য অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিতে পারবে। এর মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নিজস্ব দায়িত্ব ও জবাবদিহি বজায় রেখেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বাড়বে।

সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সরকার।

৪২৩ এজেন্সির তালিকা থেকে অনুমোদন ৩৩৮টির

মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর আওতায় মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে যাচাই ও তালিকাভুক্ত করার দায়িত্ব পায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এজেন্সি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু শর্তের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।

এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা এবং প্রয়োজনীয় আইনি নথি ও সহায়ক কাগজপত্র মালয়েশিয়ায় পাঠালে যাচাই-বাছাই চলার মধ্যেই বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার বন্ধ ও সীমিত শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালু এবং সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেয়। এর মধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় প্রথম সরকারি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। এরপরও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকে।

এ সব আলোচনার ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়া এখন নিজস্ব যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী বোয়েসেল, ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।

চূড়ান্ত হবে মেডিকেল সেন্টারের তালিকা

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার নির্ধারণে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় দেশের দায়িত্ব রয়েছে।

শ্রমবাজার দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এমন কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত অবশিষ্ট মেডিকেল সেন্টারগুলো ব্যবহার করে কার্যক্রম শুরু করতে বাংলাদেশের অনুরোধে সম্মত হয়েছে দেশটি।

নতুন নীতিমালার আওতায় মেডিকেল সেন্টারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করতে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ সফর করবে। পরিদর্শনের পর অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কথা রয়েছে।

মালয়েশিয়ার ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত মেডিকেল সেন্টারগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির আওতায় থাকবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের কার্যক্রম স্থগিত করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন মেডিকেল সেন্টারও তালিকায় যুক্ত করা যাবে। নতুন অনুমোদনের তথ্য মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় থেকেও জানানো হবে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোনো একটি নির্দিষ্ট মেডিকেল সেন্টারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। অনুমোদিত ব্যবস্থার আওতায় কর্মীরা তালিকাভুক্ত কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারবেন।

প্রতারণা ও অতিরিক্ত ব্যয় ঠেকাতে সতর্কতা

শ্রমবাজার চালুর সঙ্গে কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিয়োগ ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। অনুমোদিত এজেন্সিগুলোকে নতুন জব অর্ডার সংগ্রহ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি প্রচলিত আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এর আগে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ জানিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য কাজ করছে সরকার।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব ও ইস্ট ওয়েস্ট হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার লিমিটেডের পরিচালক আলী হায়দার চৌধুরী দেশকাল নিউজকে বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যয় ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়াসহ বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ কিংবা সরকারি অনুমোদন ছাড়া কর্মীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। গোয়েন্দা শাখাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘যারা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের এসব কাজ বন্ধ করতে হবে। ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। এখনই এসব বন্ধ না করলে পরিণতি ভোগ করতে হবে।’’

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগে সহযোগিতার জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। নতুন ব্যবস্থাকে সফল করতে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকেরা দুই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে এজেন্সির অংশগ্রহণ বাড়ানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে দুই দেশের শ্রম অভিবাসন সহযোগিতায় নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলে আশা করছে সরকার।