ঢাকা, ২৩ মার্চ সোমবার, ২০২৬ || ৯ চৈত্র ১৪৩২
good-food

ঘুমাতে গেলেই কি মাথায় ঘোরে পুরোনো কথা?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:৪১ ২৩ মার্চ ২০২৬  

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে যখন আপনি ক্লান্ত শরীরে বিছানায় যান এবং আলোটা নিভিয়ে দেন, ঠিক তখনই আপনার মস্তিষ্কের ভেতর এক অন্যরকম সিনেমা শুরু হয়। চারপাশ একদম শান্ত, কিন্তু আপনার মনের ভেতর তখন তীব্র কোলাহল।

বিশেষ করে সারাদিন কার সাথে কী কথা হলো, কে আপনাকে কীভাবে দেখল কিংবা আপনি কোনো কথা ভুল বলে ফেললেন কি না—এই সব ভাবনা একনাগাড়ে মাথায় ঘুরতে থাকে। আপনি হয়তো ভাবছেন, ইশ! কথাটা যদি ওভাবে না বলে অন্যভাবে বলতাম। অথবা আপনার মনে হয়, ওই মানুষটা কি আমার কথায় কোনো কষ্ট পেল?

এই যে রাতের বেলা কথোপকথনগুলো বারবার মনের ভেতর ঝালাই করা, এটি মানুষের মস্তিষ্কের একটি সহজাত জৈবিক প্রতিক্রিয়া। বিজ্ঞানের ভাষায় এর গভীর কিছু কারণ রয়েছে। 

আজ আমরা জানব কেন আমাদের মস্তিষ্ক রাতে এমন অবাধ্য হয়ে ওঠে এবং কীভাবে এই যন্ত্রণাদায়ক চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

রাতের বেলা কেন চিন্তাগুলো বেশি জোরালো হয়?

দিনের বেলা আমাদের মস্তিষ্ক বাইরের নানা উদ্দীপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কাজ, পড়াশোনা, মোবাইল ফোন কিংবা মানুষের সাথে কথা বলার কারণে আমাদের মনোযোগ থাকে বাইরের জগতের দিকে। কিন্তু রাতে যখন আমরা একা হই এবং বাইরের সব কোলাহল বন্ধ হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক আমাদের ভেতরে তাকানোর সুযোগ পায়।

স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্রামের সময় আমাদের মস্তিষ্কের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ বা ডিএমএন নামক একটি অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অংশটি মূলত আমাদের অতীত স্মৃতি এবং নিজেদের সম্পর্কে চিন্তা করতে সাহায্য করে।

২০২৫ সালে মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ বা এনআইএইচ এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষ যখন স্থির থাকে তখন এই ডিএমএন ব্যবস্থাটি পুরো মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সারাদিনের অমীমাংসিত ঘটনাগুলো সামনে নিয়ে আসে।

যেহেতু মানুষ সামাজিক প্রাণী, তাই সামাজিক নিরাপত্তা আমাদের মস্তিষ্কের কাছে টিকে থাকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো কথোপকথনে সামান্য অস্বস্তি থাকলেও মস্তিষ্ক সেটিকে বড় বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে।

সামাজিক চাপ যখন টিকে থাকার লড়াই

মানুষের বিবর্তন হয়েছে দলবদ্ধভাবে থাকার মধ্য দিয়ে। প্রাচীনকালে সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়া মানেই ছিল অবধারিত মৃত্যু। আমাদের মস্তিষ্কের সেই আদিম গঠন আজও রয়ে গিয়েছে। তাই কোনো আড্ডায় বা অফিসে কারও সাথে একটু ভুল বোঝাবুঝি হলে মস্তিষ্ক মনে করে আপনার অস্তিত্ব হয়তো হুমকির মুখে। ঠিক এই সময়েই শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। 

আকাশ হেলথকেয়ারের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান ডক্টর মধুকার ভরদ্বাজ বলেন যে, রাতে কথা বলা বা চিন্তার এই পুনরাবৃত্তি হলো অমীমাংসিত সামাজিক চাপের প্রতি মস্তিষ্কের এক ধরণের প্রতিক্রিয়া। মস্তিষ্ক আসলে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে চায় এবং সেই সব অস্পষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান খুঁজতে চায়। কিন্তু যখন এটি অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন তা আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।

মস্তিষ্ক কেন স্মৃতিগুলোকে বদলে দেয়?

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন যে, রাতে যখন কোনো পুরনো কথা মনে পড়ে, তখন সেটি মোটেও সাধারণ থাকে না মস্তিষ্ক সেটিকে অনেক বেশি জটিল এবং নেতিবাচক করে উপস্থাপন করে। একে বলা হয় ‘মেন্টাল টাইম ট্রাভেল’। মস্তিষ্ক কেবল স্মৃতি হাতড়ায় না বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সে ভাবতে থাকে, যদি পরেরবার এমন হয় তবে আমি কী বলব। 

আমেরিকান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ এর মতে, মস্তিষ্ক সবসময় তার অভিজ্ঞতার মডেলগুলো আপডেট করে যাতে ভবিষ্যতে আপনি আর বিপদে না পড়েন। উদ্দেশ্য সুরক্ষা দেওয়া হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা।

ঘুম আর স্মৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন

রাতের এই চিন্তাগুলো আমাদের ঘুমের একটি ধাপের সাথেও জড়িত। ঘুমের শুরুর দিকে আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিনের অভিজ্ঞতাগুলো বাছাই করে। যে স্মৃতিগুলোর সাথে আবেগ জড়িয়ে থাকে, মস্তিষ্ক সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদি কোনো কথায় সামান্যতম মানসিক চাপও থাকে, মস্তিষ্ক সেটিকে একটি বিশেষ সংকেত দিয়ে আলাদা করে রাখে। যদি আপনি সেই সময়েই গভীর ঘুমে যেতে না পারেন, তবে সেই স্মৃতি নিয়ে আপনার সচেতন মন কাজ করতে শুরু করে, যা অত্যন্ত ক্লান্তিকর।

কীভাবে থামাবেন এই চিন্তার পাহাড়?

এই চক্র থেকে বের হওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি চিন্তা করা বন্ধ করে দেবেন। বরং আপনার মস্তিষ্ককে এটি বোঝাতে হবে যে আপনি এখন নিরাপদ। কিছু ছোট কৌশল আপনাকে সাহায্য করতে পারে

প্রথমত, ডায়েরি লেখার অভ্যাস করুন। ঘুমানোর আগে আপনার মনের অস্থিরতা বা যে কথাগুলো মাথায় ঘুরছে তা একটি কাগজে লিখে ফেলুন। এতে আপনার মস্তিষ্ক মনে করবে যে তথ্যটি সংরক্ষিত হয়েছে এবং এখন সে বিশ্রাম নিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন। এটি শরীরের কর্টিসল লেভেল কমিয়ে দেয় এবং স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। যখন শরীর শান্ত হয়, মস্তিষ্কও তখন বিশ্রামের সংকেত পায়।

তৃতীয়ত, নিজের জন্য একটি মানসিক সীমানা তৈরি করুন। নিজেকে বুঝিয়ে বলুন যে, “এখন মধ্যরাতে এই সমস্যার কোনো সমাধান হবে না, এটি নিয়ে আমি কাল সকালে ভাবব।” এই সহজ কথাটি আপনার ওপর থেকে চিন্তার বোঝা অনেকখানি কমিয়ে দেবে।

রাতের এই চিন্তা আপনার কোনো চারিত্রিক ত্রুটি নয়। এটি আপনার মস্তিষ্ক অত্যন্ত সতর্ক এবং সামাজিক হওয়ার একটি প্রমাণ। রাতের নীরবতা এই চিন্তাগুলো তৈরি করে না বরং এটি কেবল মনের আড়ালে থাকা ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করে দেয়। 

যখন আপনি এই বিষয়টি বুঝতে শিখবেন, তখন অহেতুক দুশ্চিন্তাগুলো কাটিয়ে নিজেকে শান্ত রাখা অনেক সহজ হয়ে উঠবে। নিজের ওপর সদয় হোন এবং সুন্দর ঘুমে ডুবে যান কারণ আগামীকালের জন্য আপনার মস্তিষ্ককে সতেজ রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর