ঢাকা, ০৯ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ২৫ পৌষ ১৪৩২
good-food
৩১

শীতে বায়ুদূষণ বেড়ে যায় কেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:১৫ ৮ জানুয়ারি ২০২৬  

প্রতি বছর শীত এলেই বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, বায়ুদূষণ যেন এক অনিবার্য দুর্যোগে পরিণত হয়। তখন দায় চাপানো হয় ইটভাটা, নির্মাণকাজ, যানবাহন কিংবা ফসলের অবশিষ্ট পোড়ানোর ওপর। কিছু অস্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সংবাদ শিরোনাম বদলায়, তারপর বিষয়টি আবার আড়ালে চলে যায়।

কিন্তু যেটা প্রায় সব সময় উপেক্ষিত থাকে, তা হলো—শীতকালের বায়ুদূষণের পেছনের জলবায়ু ও বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদ্যা। শীত দূষণ সৃষ্টি করে না, শীত দূষণকে আটকে রাখে—আর সেই আটকে পড়াই দূষণকে কয়েকগুণ বেশি প্রাণঘাতী করে তোলে।

শহরের ওপর অদৃশ্য ঢাকনা

শীতকালের দূষণের মূল কারণ হলো তাপমাত্রা বিপর্যয়।

সাধারণত ভূমির কাছের উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠে যায়, সঙ্গে দূষণও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু শীতকালে রাতের দিকে মাটি দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়, নিচে ঠান্ডা বাতাস আটকে থাকে এবং তার ওপর উষ্ণ বাতাসের স্তর তৈরি হয়। এর ফলে শহরের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য ঢাকনা পড়ে যায়। ফলে দূষণ চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে না।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই অবস্থায় যানবাহন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, ময়লা পোড়ানো ও ঘরোয়া জ্বালানি থেকে নির্গত দূষণ ওপরে উঠতে পারে না। দূষণের বিষাক্ত কণাগুলো শ্বাস নেওয়ার উচ্চতাতেই দিনের পর দিন ভাসতে থাকে। অক্টোবর ও জানুয়ারিতে দূষণের উৎস প্রায় একই হলেও জানুয়ারিতে তার স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

শহরের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য ঢাকনা পড়ে যায়।

বাতাস নেই, তাই নিঃশ্বাসও বিষাক্ত

শীতকালে বাংলাদেশে বাতাসের গতি কমে যায়। গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ভৌগোলিক অবস্থান দূষণ আটকে রাখার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো কার্যত নিজের দূষণে নিজেই শ্বাস নেয়।

এই বাস্তবতায় কয়েক দিন নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা বা ডিজেল জেনারেটর নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ খুব একটা কাজে আসে না।

কারণ সমস্যার মূল হলো আবহাওয়াগত স্থবিরতা। যদিও আবহাওয়া ও বায়ুদূষণ পূর্বাভাসের উন্নত মডেল রয়েছে, নীতিনির্ধারণে সেগুলোর ব্যবহার এখনো সীমিত।

শীত, জ্বালানি ও দারিদ্র্যের ফাঁদ

শীতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষেরা উষ্ণতার জন্য কাঠ, কয়লা, খড়, এমনকি প্লাস্টিকও পোড়াতে বাধ্য হন। এতে ঘরের ভেতর ও বাইরের দূষণ একসঙ্গে মিশে যায়। বাংলাদেশে জ্বালানির ব্যবহারে আলো ও রান্নার প্রাধান্য থাকলেও শীতকালীন উষ্ণতার বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। ফলে শীতকালীন দূষণ আসলে দারিদ্র্য এবং অবহেলার প্রতিচ্ছবি।

দায় কার, সমস্যা কোথায়

শীতকালে দূষণের জন্য শুধু ইটভাটা বা কৃষিজ অবশিষ্ট পোড়ানোকে দায়ী করা সহজ, কিন্তু তাতে বাস্তবতা কমই বোঝা যায়। শীতে একই দূষণ মারাত্মক হয়ে ওঠে মূলত বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির কারণে। কৃষক বা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করলে শহরের সারা বছরের দূষণ আড়ালেই থেকে যায়।

শহরগুলো কার্যত নিজের দূষণে নিজেই শ্বাস নেয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতের নতুন ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শীত কমে যাচ্ছে—এমন ধারণা থাকলেও বাস্তবে বাতাসের স্থবিরতা, আর্দ্রতা ও মৌসুমি পরিবর্তনের ধরন বদলে যাচ্ছে। এতে শীতকালীন দূষণ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই এটি এখন শুধু পরিবেশগত নয়, জলবায়ু অভিযোজনের সমস্যা।

শীতকে নতুন চোখে দেখা জরুরি

শীত দূষণকে অনিবার্য করে তোলে না; শীত আমাদের পরিকল্পনার ব্যর্থতাকে নগ্ন করে দেয়। বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানকে নগর পরিকল্পনা, জ্বালানি নীতি ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত না করা হলে, ঢাকাসহ বাংলাদেশের শহরগুলো প্রতি শীতে একই বিষাক্ত চক্রে আটকে থাকবে।