ঢাকা, ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food
১০

যেভাবে এড়াবেন গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:৪০ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বাসাবাড়িতে এই সিলিন্ডারের ব্যবহার অনেকটাই বেড়েছে। শহর থেকে গ্রাম, প্রায় সর্বত্র রান্নার প্রধান ভরসা এখন এই সিলিন্ডার। তবে এই জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্ঘটনার আতঙ্ক। প্রায়ই সংবাদপত্রে আমরা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা গ্যাস থেকে লাগা আগুনের খবর দেখি। এই ধরণের খবর সাধারণ মানুষের মনে এক অজানা ভীতি তৈরি করে।

অনেকে মনে করেন ঘরে সিলিন্ডার রাখা মানেই বোধহয় একটি জীবন্ত বোমা নিয়ে বাস করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো যদি আমরা সঠিক নিয়ম জানি এবং একটু সচেতন থাকি তবে এই ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আজ আমরা জানব কীভাবে খুব সহজে কিছু নিয়ম মেনে চলে সিলিন্ডার দুর্ঘটনা থেকে নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখা যায়।

সিলিন্ডার কতটা নিরাপদ?

বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি গ্রাহক এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করছেন। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় দুই কোটি সিলিন্ডার রয়েছে। একটি মজার তথ্য হলো সিলিন্ডারগুলো আসলে নিজে থেকে খুব একটা বিস্ফোরিত হয় না। প্রতিটি সিলিন্ডার এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন তা গ্যাসের চাপের চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি চাপ সহ্য করতে পারে। তাই সিলিন্ডার ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি এমনিতে নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে মূলত অসাবধানতা এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে। যখন গ্যাস লিক হয়ে ঘরের কোথাও জমে থাকে এবং সেখানে কোনো আগুনের স্ফুলিঙ্গ পায় তখনই বড় ধরণের বিস্ফোরণ ঘটে।

কেনার সময় যা খেয়াল রাখবেন

সিলিন্ডার বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনার সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় আমরা সামান্য টাকা বাঁচাতে গিয়ে নিম্নমানের পাইপ বা রেগুলেটর কিনে ফেলি যা জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

১. অবশ্যই অনুমোদিত ডিলার বা সার্টিফাইড কোম্পানির কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনবেন।

২. সিলিন্ডারের গায়ে এর মেয়াদের তারিখ লেখা থাকে। সাধারণত একটি সিলিন্ডার ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। কেনার আগে অবশ্যই দেখে নিন সেটির মেয়াদ আছে কি না। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া সিলিন্ডার ঘরে আনা মানেই বিপদ ডেকে আনা।

৩. সিলিন্ডারের মুখটি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখুন সেখানে কোম্পানির সিল এবং সেফটি ক্যাপ ঠিকমতো লাগানো আছে কি না।

৪. পাইপ এবং রেগুলেটর কেনার সময় মানের দিকে খেয়াল রাখুন। বাজারে অনেক সস্তা পাইপ পাওয়া যায় যেগুলো খুব দ্রুত ফেটে যায় বা ছিদ্র হয়ে যায়। ভালো মানের রাবারের পাইপ ব্যবহার করা জরুরি।

সিলিন্ডার রাখার সঠিক জায়গা

  • সিলিন্ডারটি কোথায় রাখছেন তার ওপর আপনার নিরাপত্তা অনেকখানি নির্ভর করে। অনেক বাড়িতে দেখা যায় সিলিন্ডার খুব ঘিঞ্জি বা বদ্ধ জায়গায় রাখা হয় যা একদমই উচিত নয়।
  • সিলিন্ডার সব সময় খাড়াভাবে দাঁড় করিয়ে রাখুন। কোনোভাবেই এটি কাত করে বা উপুড় করে রাখা যাবে না।
  • সিলিন্ডার রাখার জন্য সমতল জায়গা বেছে নিন। উঁচু নিচু জায়গায় রাখলে এটি পড়ে গিয়ে লিকেজ তৈরি হতে পারে।
  • রান্নাঘরের চুলা থেকে সিলিন্ডারের দূরত্ব অন্তত তিন ফুট হওয়া উচিত। চুলার খুব কাছাকাছি সিলিন্ডার রাখলে আগুনের তাপে এটি গরম হয়ে বিপদ ঘটাতে পারে। একটি লম্বা পাইপ ব্যবহার করে সিলিন্ডারটি কিছুটা দূরে রাখুন।
  • সিলিন্ডার কখনোই চুলার নিচে বা কোনো ক্যাবিনেটের ভেতরে বদ্ধ অবস্থায় রাখবেন না। এটি এমন জায়গায় রাখুন যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে। বদ্ধ জায়গায় গ্যাস জমে থাকার ঝুঁকি বেশি থাকে।
  • সিলিন্ডার রাখার জায়গার জানালা সব সময় খোলা রাখার চেষ্টা করুন। যদি ঘর অন্ধকার বা বদ্ধ হয় তবে ওপরে এবং নিচে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর বা বাতাস চলাচলের পথ রাখুন। মনে রাখবেন গ্যাস বাতাসের চেয়ে ভারী তাই এটি মেঝের দিকে বেশি জমে থাকে।

দৈনন্দিন ব্যবহারের নিয়ম

প্রতিদিন রান্নার সময় আমাদের কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত যা বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করবে।

১. রান্না শুরু করার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে রান্নাঘরের সব জানালা খুলে দিন। এতে ঘরে জমে থাকা কোনো গ্যাস থাকলে তা বেরিয়ে যাবে।

২. রান্না শেষ হওয়ার পর প্রথমে চুলার নব বন্ধ করুন এবং এরপর অবশ্যই সিলিন্ডারের রেগুলেটর সুইচটি বন্ধ করে দিন। আমরা অনেকেই কেবল চুলার নব বন্ধ করে রাখি যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

৩. সিলিন্ডার পরিবর্তনের সময় নিশ্চিত হোন যে আশেপাশে কোনো আগুন বা চুলা জ্বলছে কি না।

৪. সিলিন্ডারের ওপরে কখনোই কোনো ভারী বস্তু বা অন্য কিছু রাখবেন না।

৫. সিলিন্ডার টানা হেঁচড়া করা বা মাটিতে গড়িয়ে নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এতে সিলিন্ডারের গায়ে ঘর্ষণ লেগে লিকেজ হতে পারে।

গ্যাসের গন্ধ পেলে যা করবেন

যদি কখনো ঘরে প্রবেশের পর বা রান্নার সময় গ্যাসের গন্ধ পান তবে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত মাথায় নিচের পদক্ষেপগুলো নিন।

  • সাথে সাথে ঘরের সব দরজা ও জানালা খুলে দিন।
  • ভুল করেও দেশলাই বা ম্যাচের কাঠি জ্বালাবেন না।
  • বৈদ্যুতিক কোনো সুইচ অন বা অফ করবেন না। এমনকি মোবাইল ফোনও সেখানে ব্যবহার করবেন না। বৈদ্যুতিক স্পার্ক থেকে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যেতে পারে।
  • সিলিন্ডারের রেগুলেটরটি বন্ধ করে দিন এবং সম্ভব হলে সেফটি ক্যাপ লাগিয়ে দিন।
  • লিকেজ কোথায় তা পরীক্ষা করার জন্য কখনোই মোমবাতি বা আগুন ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজনে সাবান পানির ফেনা দিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন। বুদবুদ উঠলে বুঝবেন সেখানে লিকেজ আছে।
  • অবিলম্বে আপনার নিকটস্থ ডিলার বা সরবরাহকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।

পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ

সিলিন্ডার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার সময় আমাদের দেশে প্রায়ই অসাবধানতা দেখা যায়। সাইকেল বা মোটরসাইকেলে করে সিলিন্ডার বহন করা ঠিক নয় কারণ এতে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাছাড়া সিলিন্ডার ঝাঁকানো বা গরম করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকে মনে করেন সিলিন্ডার ঝাঁকালে বেশি গ্যাস পাওয়া যায় কিন্তু এটি ভুল ধারণা। উল্টো এতে ভেতরে চাপের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

বছরে অন্তত একবার আপনার সিলিন্ডার এবং এর সাথে যুক্ত পাইপ ও রেগুলেটর কোনো দক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিন। যদি দেখেন পাইপটি একটু ফেটে গেছে বা শক্ত হয়ে গেছে তবে মেরামত করার চেষ্টা না করে দ্রুত বদলে ফেলুন। নিরাপত্তামূলক যন্ত্রপাতি হিসেবে রান্নাঘরে একটি গ্যাস ডিটেক্টর লাগাতে পারেন যা গ্যাস লিক হলে আপনাকে অ্যালার্ম দিয়ে সতর্ক করে দেবে। এছাড়া একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা অন্তত একটি মোটা কম্বল হাতের কাছে রাখুন যা জরুরি প্রয়োজনে আগুন নেভাতে সাহায্য করবে।

সচেতনতাই হলো সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। গ্যাস সিলিন্ডার ভয়ের কিছু নয় যদি আপনি এর সঠিক ব্যবহার জানেন। আপনার সামান্য একটু সাবধানতা আপনার সাজানো সংসারকে বড় কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। সুস্থ থাকুন এবং নিয়ম মেনে নিরাপদ থাকুন।