ঢাকা, ২৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২১ || ১২ ফাল্গুন ১৪২৭
good-food
৩১০

সুখের ছাড়পত্র

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২২:২৮ ১৭ জানুয়ারি ২০২১  

জন্ম থেকে মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষ যে "সোনার হরিণের" পেছনে বিরামহীন ছুটে চলে তাকে সাধারণত আমরা সুখ বলেই জেনে আসছি। তবে "সুখ” শব্দটা বড্ড আপেক্ষিক অর্থ বহন করে থাকে। সুখের সংগা ব্যক্তিভেদে তাই একেকরকম। জীবন দর্শন নিয়ে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আর মননশীলতার ব্যাপক তারতম্যের জন্যই প্রত্যেকটা মানুষের সুখানুভবে ভিন্নতা রয়েছে। তাই বলে সুখকে উপেক্ষা করে এমন সাধ্য কার আছে?

 

জীবনের প্রতি স্তরেই অফুরন্ত সুখ লুকিয়ে রয়েছে, শুধু সেটাকে উপলব্ধি করার মতো অনুভূতি থাকা চাই। অনেকেই মনে করেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ আর দামী গাড়ি, বাড়িতেই বুঝি সব সুখ নিহিত রয়েছে। অনেকের কাছে আবার কুঁড়ে ঘরে থেকে দু’বেলা দু’মুঠো আহার যোগানোতেই জীবনের চরম তৃপ্তি। কেউ আবার চায়- অফুরন্ত নাম, যশ আর সুখ্যাতি। এতেই নিহিত বুঝি সব সুখ! অনেকের আবার শুধু চাই -ই, চাই -ই,আর চাই...ই!

 

যেন এই চাওয়ার পেছনে ছুটে চলাতেই সব সুখ! আর একশ্রেণি আছে যারা এসব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুধু ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরেই মহা সুখী !! যেন ভালোবাসার কোমল ছোঁয়া দিয়েই তারা জীবনের সকল অপ্রাপ্তি-অপূ্র্ণতা আর চরম দীনতাকে একেবারে নিমিষেই উধাও করে দিতে পারে। প্রতিহিংসা আর প্রতিদন্দ্বীতার রাজ্যে এ শ্রেণির মানুষ যেন এক প্রেমের জাদুকর !! তাদের অভাবের রাজ্যে যেন ভালোবাসা পদ্যময়। 

 

কেউ আবার আছে আত্নভোলা যাযাবর, দেশ-বিদেশে ঘুরেই সে যেন সব সুখ মুঠোয় ভরে আনতে পারে। কেউ কেউ আবার নিজের জন্য ভোগ, বিলাসে মত্ত। আবার অনেকে আছে অন্যের উপকার করে, বিপদে অন্যের পাশে থেকে তাকে সাহায্য করেই মহাতৃপ্ত। কেউ আবার নিজের জন্য সন্চয় করাতেই খুশি। আবার অনেকে আছে নিজের সবটুকু পরের স্বার্থে উজাড় করেই মহা তৃপ্ত। 
সুখের এ মহারাজ্যে দিনমান যেন হাজারো প্রাপ্তির হাতছানি আর অগনিত অধরা বাসনা। 


পুরো পৃথিবীটা জুড়েই যেন চলছে সুখের মহাযজ্ঞ। শুধু কে কিভাবে তা উপভোগ করতে পারে সেটাই হলো মূখ্য বিষয়। সুউচ্চ অট্টালিকার গাঁ ঘেঁষেই যে ছোট্ট টিনের চালার খুপরি ঘরটা রয়েছে আর তাতে বসবাসকারী হতদরিদ্র মানুষগুলো হয়তো অবাক বিষ্ময়ে উঁচু প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে কত অফুরন্ত সুখই বুঝি মজুদ আছে ওই অট্টালিকায়! 


সীমাহীন অর্থ আর প্রাচুর্যে বুঝি পৃথিবীর সব সুখ এসে লুটোপুটি খাচ্ছে তাদের বুকের মাঝে!  কিন্তু সেই প্রাসাদের ভিতরেই হয়তোবা লুকিয়ে রয়েছে হাজারো শূন্যতা আর দুঃখ-ব্যথার হাজারো ইতিহাস !! সেই অট্টালিকার প্রাচীর জুড়ে কত নীরব রাতে নীরবেই হয়তো ঝরে পড়ে কত গোপন ব্যাথার অশ্রু !!

 

সুখপাখি টা বুঝি তারও নাগালের বাইরে!  হয়তোবা সেও জানালায় চোখ রেখে ছোট্ট ওই কুঁড়েঘরটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে প্রচুর অর্থ -সম্পদের মাঝেও প্রকৃত সুখ নেই, সুখ বুঝি কুঁড়েঘরের ওই সীমাহীন স্বাধীনতায়...! সুখ বুঝি তখন তার কাছে ব্যাপ্তিতে নয়, বিশালতায় নয়-- রয়েছে বরং অতি সামান্যে, ক্ষুদ্রতায়! 

 

আসলে কোনও মানুষই নিজের অবস্থানে নিজেকে সুখী ভাবতে পারে না। নিজেকে সে সবসময়ই তুচ্ছ ভাবতে সদা প্রস্তুত থাকে। তাই তার নিজের সব প্রাপ্তি আর অর্জনকে অন্যের চেয়ে সর্বদা কম মনে হয়। অপরের সব কিছুকে অনেক বেশি বেশি বলে মনে হয়। মানুষ তার প্রাপ্তিকে নিয়ে মোটেও তৃপ্ত হতে চায় না আর এজন্যই তার কাছে মনে হয় অন্যে তার চেয়ে বেশি সুখী। 

 

তার যেটা নেই আর একজনের সেটা আছে এর অর্থ এই নয় যে, সে ওর চেয়ে অনেক বেশি সুখী। 
কেননা একটু নীরিক্ষা করলেই দেখা যাবে যে, অপর ওই ব্যক্তিটির আবার এমন অনেক কিছুই নেই যা আবার তার রয়েছে। তাই সবসময় অন্যকে বেশী সুখী ভাবাটা চরম বোকামি আর ভীষণ নির্বোধের পরিচয়। 

 

কারণ, সবসময় এটা মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবীতে কোনও মানুষই পরিপূর্ণ নয়, সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেকের জীবনেই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা রেখে দিয়েছেন। কারণ, তা না হলে দম্ভ আর আত্ন অহমিকায় সে স্রষ্টাকেও প্রতিদন্দ্বী ভাবতে পিছপা হতো না। আর তাই বুঝি মহান আল্লাহ পাক সব এভাবেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।  কিছুটা অপূর্ণতা আর সীমাবদ্ধতা দিয়ে মানব জাতিকে সীমা লঙ্ঘন করার প্রবণতা থেকে বিরত রাখতে...। 

 

ধনে-জ্ঞানে-মানে যে ব্যক্তি পূর্ণ তার হয়তো অন্য রকম অনেক শূন্যতা রয়েছে। আবার যার অন্য আর সবকিছু আছে কিন্তু এসব কিছুই নেই। কাজেই নিরর্থক নিজেকে অসুখী ভেবে হীনমন্যতায় ভোগার কোন কারণ নেই। কেননা কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কখনো যদি অন্যের কোনও একটা দিকে প্রচুরতা দেখে এটা মনে হয় যে সে বুঝি আমার থেকে অনেক সুখী, তখনই নিজের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। 

 

নিজের থাকা বিষয়গুলোকে অনেক মূল্যবান মনে করতে হবে। নিজেকে তার চেয়ে কম মূল্যবান মনে করলে চলবে না। মনকে বোঝাতে হবে -আমারও এমন অনেক কিছু আছে যা তার নেই,যেমন-তার বাড়ি -গাড়ি আছে , কিন্তু শিক্ষা নেই। আর আমার বাড়ি -গাড়ি না থাকলেও মূল্যবান জিনিস "শিক্ষা " আছে, যা তার নেই। এমন অনেক বিষয় নিয়েই নিজেকে বোঝানো যেতে পারে।  এভাবে বিভিন্ন বিষয়ে অতৃপ্ততা নিয়ে "সুখপাখি" টা যখন মনের মধ্যে দাপাদাপি করে তখনই নিজেকে বোঝাতে হবে যে "আমার নিজের এমন অনেক কিছুই আছে যা অন্যের নেই"। সুতরাং নিজেকে তার চেয়ে কম সুখী ভেবে অতৃপ্ত হওয়ার কোনও মানেই হয় না। 

 

নিজের যা নেই তাই নিয়ে আফসোস বা মন খারাপ না করে বরং যা আছে তাকে অসীম ও অমূল্য মনে করে তার সর্বোত্তম ব্যবহার করে তৃপ্ত থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই সবসময় অন্যের দিকে দৃষ্টিপাত না করে, "সুখ" টাকে শুধুই সোনার হরিণ না ভেবে, নিজের যা যা আছে তাকেই অসীম ও মূল্যবান মনে করে তৃপ্ত থাকাতেই অফুরন্ত সুখের অনুভব সম্ভব। 

 

কেননা এই পৃথিবীতে কোনও মানুষই পরিপূর্ণ নয়, স্বয়ংসম্পূর্ন নয়। অতএব, পরশ্রীকাতরতা সম্পূর্ণ পরিহার করে নিজেকে নিয়ে তৃপ্ত থাকাতেই জীবনের সকল সুখ নিহিত।  সুতরাং জীবনের সকল প্রত্যাশাকে প্রাপ্তির মোড়কে না মুড়িয়ে বরং কিছু শূন্যতায় নিজেকে গাহন করে সুখের ছাড়পত্রকে একান্ত, চুড়ান্ত ও সমৃদ্ধ করে সুখপাখিটাকে আপন খাঁচায় বন্দী করে একটা জীবন খুব সহজেই পার করে দেওয়া যায়। তাই নয় কি?

 

লেখক: আজমেরিনা শাহানি
সাবেক রানারআপ, খুলনা ডিভিশন, লাক্স আনন্দধারা মিস বাংলাদেশ ফটোজনিক