ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২৯ মাঘ ১৪৩২
good-food
১৯

কবিতার খাতা ছেড়ে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন বিদ্রোহী কবি

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২২:১৭ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা চিনি বিদ্রোহের কবি হিসেবে। তিনি লিখেছেন অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে, মানুষের অধিকার নিয়ে, সাম্য আর মানবতার কথা বলে গেছেন সারা জীবন। জীবন। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তার লেখা ছিল ধারালো। কিন্তু তার জীবনের একটি অধ্যায় অনেকেরই অজানা। এক সময় তিনি জনপ্রতিনিধি হতে চেয়েছিলেন। সত্যিই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চেয়েছিলেন। 

১৯২৬ সালের ঘটনা। ভারতবর্ষ তখনো ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। সেই বছরের শেষ দিকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। নজরুল তখন সারা বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এক নাম। সেই সময় ঢাকা বিভাগ থেকে আইনসভায় দুজন মুসলিম প্রতিনিধির আসন ছিল। নজরুল ঠিক করলেন তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা আইনসভায় পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার মূল লক্ষ্য। তিনি কংগ্রেস সমর্থিত স্বরাজ দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান। তার নির্বাচনি এলাকাটি ছিল বিশাল। বর্তমান ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ নিয়ে গঠিত একটি আসন থেকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

নজরুল যখন নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তার মনে ছিল অগাধ আত্মবিশ্বাস। তিনি ভাবতেন বাংলার মানুষ যেভাবে তাকে এবং তার কবিতাকে ভালোবাসে, নির্বাচনে তারা তাকে ঠিক সেভাবেই দুহাত ভরে ভোট দেবে। নির্বাচনের প্রচারে কবি যখন ফরিদপুরে যান, তখন সেখানে দেখা হয় পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের সাথে। নজরুল খুব হাসিমুখে জসীমউদ্দীনকে বলেছিলেন, জসীম তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। নিশ্চয়ই সবাই আমাকে ভোট দেবে। আমি তো ঠিক করেছি ঢাকা থেকে শতকরা নিরানব্বইটি ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি অল্প কিছু পাই তবেই কেল্লাফতে। নির্বাচনে জিতলে আমাকে মাঝে মাঝে দিল্লি যেতে হবে, তখন তোমরাও আমার সাথে যাবে।

কিন্তু ভোটের মাঠে নামতেই বাস্তবতা বদলে যায়। রাজনীতি আর সাহিত্য এক জিনিস নয়। নির্বাচনে টাকা লাগে, সংগঠন লাগে, কর্মী লাগে। কবিতার জগত আর ভোটের মাঠের হিসাব যে সম্পূর্ণ আলাদা, তা কবি খুব দ্রুতই বুঝতে পারলেন। এখনকার সময়ে নির্বাচনে যেমন জলের মতো টাকা খরচ হয়, সেই সময়েও খরচ করার মতো সামর্থ্য সবার থাকত না। নজরুলের সম্বল ছিল কেবল মানুষের ভালোবাসা। নির্বাচন করতে কেমন টাকা লাগে সে বিষয়ে তার কোনো ধারণাই ছিল না। স্বরাজ দলের নেতা বিধানচন্দ্র রায় তাকে নির্বাচনের খরচের জন্য মাত্র ৩০০ টাকা দিয়েছিলেন। এই সামান্য টাকা নিয়ে বিশাল নির্বাচনি এলাকায় প্রচারণা চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব। প্রচারের লোকবল কম থাকায় কবি নিজেই দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করেন।

ঢাকার বেচারাম দেউড়ির ৫২ নম্বর বাড়িতে পীর সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ ইউসুফ কাদেরীর আস্তানায় তিনি কিছুদিন অবস্থান করে প্রচার চালান। ফরিদপুরেও কয়েক দিন মাঠে কাজ করেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সব জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। নজরুলের এই নির্বাচনি যাত্রা সহজ ছিল না। সেই সময় রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ নজরুলের ওপর বেশ ক্ষিপ্ত ছিল। তার নামে কাফের ফতোয়াও দেওয়া হয়েছিল। তবে কবি দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। ফরিদপুরের পীর বাদশা মিয়া কবিকে সমর্থন করে একটি ফতোয়া লিখে দিয়েছিলেন যাতে মানুষ তাকে ভোট দেয়। সেই ফতোয়ার কাগজ নিয়ে নজরুল খুব উৎসাহের সাথে ফরিদপুরে প্রচার চালান। জসীমউদ্দীন কবির সাথে থেকে এই প্রচারণার সাক্ষী ছিলেন।

একটি মজার কিন্তু কষ্টের স্মৃতি জসীমউদ্দীন তার লেখায় তুলে ধরেছেন। কবি যখন ফরিদপুরের প্রভাবশালী নেতা তমিজউদ্দীন খানের বাড়িতে ভোট চাইতে গেলেন, তখন সেখানকার এক সভাসদ কবিকে কাফের বলে অপমান করেন। নজরুল সেই অপমান গায়ে না মেখে কেবল হাসলেন। তিনি বললেন, আপনারা আমাকে কাফের বলছেন এর চেয়েও কঠিন কথা আমাকে শুনতে হয়েছে। আমার গায়ের চামড়া অনেক পুরু। তবে আমি খুশি হবো যদি আপনারা আমার দু একটি কবিতা শোনেন। এরপর কবি যখন তার মহররম কবিতাটি আবৃত্তি করলেন, তখন দেখা গেল যে মানুষটি তাকে অপমান করেছিলেন তার চোখ দিয়েই সবার আগে পানি পড়ছে। কবিতা শুনে সবাই মুগ্ধ হলেও রাজনীতির মারপ্যাঁচে তারা কবির পাশে দাঁড়াতে রাজি হননি। তমিজউদ্দীন সাহেব তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে জানিয়ে দিলেন যে তারা অন্য এক জমিদার প্রার্থীকে সমর্থন করবেন। এমনকি সেদিন কবিকে সেই বাড়িতে দুপুরবেলা খাওয়ার জন্য কেউ একবার অনুরোধ পর্যন্ত করেনি। ক্ষুধার্ত কবিকে নিয়ে জসীমউদ্দীন পরে এক সাধারণ হোটেলে খাবার খেয়েছিলেন।

নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে নজরুল বুঝতে পারলেন যে মানুষের ভালোবাসা আর ভোট পাওয়া এক বিষয় নয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী তিনজনই ছিলেন প্রভাবশালী জমিদার। তাদের টাকা ও ক্ষমতার দাপটের কাছে সাধারণ এক কবির প্রচার ছিল খুবই ম্লান। ১৯২৬ সালের ২৩ নভেম্বর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হলো। দেখা গেল মোট ১৮ হাজার ১১৬ জন ভোটারের মধ্যে নজরুল পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৬২টি ভোট। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে তিনি হয়েছিলেন চতুর্থ। তার প্রাপ্ত ভোট এতই কম ছিল যে তার জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়। এই পরাজয় কবিকে এক বড় শিক্ষা দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কাব্য আর রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভোটের মাঠে কবিখ্যাতি খুব একটা কাজে আসে না।

ব্রিটিশ আমল থেকেই অনেক কবি লেখক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মোহাম্মদ আকরম খাঁ, সৈয়দ আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক শাহেদ আলী নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু নজরুলের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। এরপর তিনি আর কখনো নিজে নির্বাচনে দাঁড়াননি। রুটির দোকানে কাজ করা থেকে লেটো গানের দলে যোগ দেওয়া, সৈনিক জীবন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সাহিত্য ও সংগীত সৃষ্টি সব মিলিয়ে নজরুলের জীবন ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। ভোটে তিনি হেরেছিলেন, কিন্তু মানুষের মনে তিনি অনেক আগেই জিতে গিয়েছিলেন।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর