ঢাকা, ০৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার, ২০২৬ || ২১ মাঘ ১৪৩২
good-food
১০

বাচ্চাদেরও শেখান মানি ম্যানেজমেন্ট

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৮:১২ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

আপনার বাচ্চা কি বারবার খেলনা, চিপস বা চকলেট চায় দোকানে গেলেই কি নতুন কিছু কেনার আবদার শুরু হয়? বেশিরভাগ অভিভাবকের অভিজ্ঞতা এমনই। আমরা অনেক সময় ভেবে নিই, ও তো বাচ্চা, না বুঝেই চাইছে। তাই মন খারাপ হবে ভেবে যা চায় তাই দিয়ে দিই। কিন্তু এই জায়গাতেই আমরা অজান্তে একটা বড় ভুল করি। আমরা তাকে ভালোবাসা দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু অর্থ বোঝার সুযোগটা দিচ্ছি না।

জাপানে যখন কোনো শিশু এলিমেন্টারি স্কুলে পড়ে, তখন থেকেই তাদের জন্য আলাদা ব্যাংকের ব্যবস্থা থাকে। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলেও সত্যি যে, সেখানে শিশুরা নিজেদের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলে। তারা নিজেরাই সেই অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেয় এবং প্রয়োজন হলে নিজেরা গিয়েই টাকা তোলে। বাবা মা পাশে থাকেন ঠিকই, কিন্তু শিশুকে কোনো সাহায্য করেন না। জাপানিদের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুকে টাকা পয়সার হিসাব বা ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি শেখানো এবং তাকে স্বাবলম্বী করে তোলা।

আমাদের দেশে চিত্রটা একটু ভিন্ন। আমরা চাই না বাচ্চা কষ্ট পাক। চাই না সে কোনো কিছু না পেয়ে মন খারাপ করুক। তাই অনেক সময় প্রয়োজন আর শখের পার্থক্য না করেই সবকিছু তুলে দিই। কিন্তু এতে বাচ্চা এক ধরনের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সে ধরে নেয় চাইলেই পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন সে কেন এমন করে এর কারণ খুব সহজ। সে জানে না এই জিনিসগুলো কিনতে কত টাকা লাগে অথবা এই টাকাগুলো আপনার কাছে কোথা থেকে আসে। টাকা যে আয় করতে হয় এবং তা সঠিক জায়গায় খরচ করতে হয়, এই ধারণাটি তার মধ্যে নেই। অথচ একটু অপেক্ষা এবং কিছুটা না পাওয়া বা অভাবই একজন শিশুকে বাস্তববাদী করে তুলতে পারে। চাওয়া মাত্র সবকিছু পেয়ে গেলে শিশুর মধ্যে অর্থনৈতিক জ্ঞান তৈরি হয় না।

এর ফল হয় বেশ ভয়ানক। সেই শিশু যখন একটু বড় হয়, তখন আপনার দেওয়া টিফিনের টাকাও তার কাছে কম মনে হয়। বন্ধুর দামি ফোন বা বাইক তাকে টানে। তার মনে কেবল একটাই ইচ্ছা থাকে, তা হলো আমার ওটা চাই। সেই জিনিসটি কিনতে আপনার কত কষ্ট হবে বা টাকা কোথা থেকে আসবে, তা সে একবারও ভাবে না। এই সন্তানটিই যখন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হোস্টেলে থাকা শুরু করে, তখন সে টাকার সঠিক ব্যবহার করতে পারে না। আপনি আপনার সাধ্যমতো টাকা পাঠালেও সে নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করে। কাছেই গন্তব্য অথচ সে রিকশা বা হেঁটে না গিয়ে উবার নিয়ে নেয়। অনলাইনে যা ভালো লাগে তাই কিনে ফেলে। বন্ধুদের সাথে দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া দাওয়া করে মাসের অর্ধেক সময়েই সব টাকা শেষ করে দেয়। এরপর মাসের কুড়ি তারিখে যখন আবার টাকা চায়, তখন আপনি অবাক হয়ে ভাবেন সব টাকা গেল কোথায়। তখন তাকে বকাঝকা করে আসলে কোনো লাভ নেই। কারণ টাকা জমানো বা খরচের শিক্ষা তো আপনি তাকে ছোটবেলায় দেননি।

ঠিক এই জায়গাতেই জাপানিরা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে আছে। তারা অনেক দূরদর্শী চিন্তা করে। একজন জাপানি অভিভাবক জানেন যে বিশ থেকে পঁচিশ বছর পর তিনি তার সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চান। তারা ছোটবেলা থেকেই সেই ভিত্তি তৈরি করে দেন। শিশুদের জন্য ব্যাংকিং সিস্টেম রেখে তারা শেখাতে চান যে নিজের টাকার দায়িত্ব নিজের। আজ যদি সব খরচ করে ফেলা হয়, তবে কাল হাতে কোনো টাকা থাকবে না। এই সাধারণ জ্ঞানটি যখন একটি শিশু নিজে কাজ করে শেখে, তখন সে মানসিকভাবে অনেক বেশি পরিণত হয়। সে শেখে যে তার শখ এবং প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য কী। ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার ফল যে নিজেকেই ভোগ করতে হয়, এই শিক্ষাটি তাকে সাবলম্বী করে। সে টাকার গোলাম হয় না বরং টাকা তার জন্য একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশে হয়তো জাপানের মতো ব্যাংক ব্যবস্থা নেই, কিন্তু আমরা চাইলেই আমাদের সন্তানদের ঘরে বসেই অনেক কিছু শেখাতে পারি। আপনার আয়ের উৎস কী এবং কত কষ্ট করে আপনি টাকা উপার্জন করেন, তা আপনার সন্তানের সাথে শেয়ার করুন। অনেকে ভাবেন অভাবের কথা শুনলে বাচ্চার মন খারাপ হবে। কিন্তু আসলে শিশুকে অন্তত এটা বুঝতে দিন যে টাকা আকাশ থেকে পড়ে না। সে যখন লিখতে শিখবে, তখন তাকে বাজারের তালিকা করার দায়িত্ব দিন। তাকে সাথে নিয়ে বাজারে যান। দোকানদারকে টাকা দেওয়া এবং রিকশাভাড়া দেওয়ার কাজগুলো তাকে দিয়ে করান। এই ছোট ছোট কাজগুলোই তার মনের মধ্যে টাকার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করবে।

যদি সে কোনো কিছুর আবদার করে, তবে তা সাথে সাথে কিনে দেবেন না। তাকে বলুন যে পরের মাসের বেতন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এতে সে বুঝবে যে টাকা নির্দিষ্ট সময়ে আসে এবং টাকা আসার একটি প্রক্রিয়া আছে। অফিস থেকে ফিরে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ফিরে সারাদিন আপনার কেমন কাটল সেই গল্প বাচ্চার সামনে করুন। পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে কেন অনেক টাকার প্রয়োজন হয় এবং বিপদের সময়ের জন্য কেন টাকা জমিয়ে রাখা জরুরি, তা তাকে বুঝিয়ে বলুন।

বাস্তব জীবন থেকেই শিশুরা সবচেয়ে ভালো শিক্ষা পায়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে কেবল পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা দিয়ে জীবন জয় করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক জ্ঞান বা মানি ম্যানেজমেন্ট শেখানো আপনার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য অনেক বেশি দরকারি। সে যদি ছোটবেলা থেকেই টাকার গুরুত্ব বোঝে, তবে সে বড় হয়ে একজন দায়িত্বশীল এবং সচেতন মানুষ হবে। মনে রাখবেন, আজকের এই ছোট ছোট শিক্ষাগুলোই তাকে আগামীর কঠিন পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করবে। তাই আজ থেকেই আপনার সন্তানকে শেখান কীভাবে টাকা জমাতে হয় এবং কীভাবে তা সঠিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হয়। এতে তার নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং সে জীবনে অনেক বড় হতে পারবে।

 

শিশু বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর