ঢাকা, ১৮ মার্চ বুধবার, ২০২৬ || ৪ চৈত্র ১৪৩২
good-food

হরমুজ প্রণালী: উত্তেজনার এক দীর্ঘ ইতিহাস

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:২৯ ১৮ মার্চ ২০২৬  

স্ট্রেইট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালীর কথা ইদানীং খুব শোনা যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরের সরু যে জলপথটি, ওটাই হলো বিখ্যাত এবং বহুল আলোচিত হুরমুজ প্রণালী।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’ গুলোর একটি এই প্রণালী। এর সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২০ মাইল চওড়া, অথচ প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এখান দিয়ে পরিবাহিত হয়।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশই এই প্রণালী দিয়ে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ মানেই বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব।

ঐতিহাসিকভাবে হাজার বছরের পুরোনো এই বাণিজ্য রুটটি মধ্যপ্রাচ্যকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তবে আধুনিক সময়ে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিষ্কারের পর এর গুরুত্ব সীমাহীন।

১৫০৭: পর্তুগিজ দখল

১৬শ শতকে পর্তুগিজরা প্রথম এই অঞ্চলে এসে হরমুজ দ্বীপ দখল করে। তারা সেখানে দুর্গ ও কাস্টমস ব্যবস্থা গড়ে তুলে জাহাজ থেকে কর আদায় করত। একশ বছর ধরে তারা এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। ১৬২২ সালে পারস্যের সাফাভি শাসক শাহ আব্বাস এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যৌথ অভিযানে তাদের বিতাড়িত করা হয়।

শিল্পীর চোখে হরমুজে পর্তুগিজ জাহাজ- ১৫০৭ সাল। 

১৯৫১: ব্রিটিশ অবরোধ

তেল আবিষ্কারের পর ব্রিটিশদের প্রভাব বাড়ে। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেঘ ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ক্ষুব্ধ হয়। তারা রয়্যাল নেভি পাঠিয়ে আবাদান বন্দরে অবরোধ সৃষ্টি করে এবং হরমুজ দিয়ে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। পরে ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে সরানো হয়।

১৯৮৪: ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’

ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালী হয়ে ওঠে সংঘর্ষের কেন্দ্র। ইরাক ও ইরান একে অপরের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। ১৯৮৮ সালে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের ওপর বড় আকারের হামলা চালালে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।

২০১২: নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইরান বারবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধজাহাজ পাঠালে ইরান শেষ পর্যন্ত সে পদক্ষেপ নেয়নি।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে সিঙ্গাপুরের একটি জাহাজে হামলা চালায় ইরানের যুদ্ধ জাহাজ। 

২০১৫–২০২৪: জাহাজ আটক ও হামলা

এই সময়ে ইরান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাহাজ আটক করে। ২০১৫ সালে একটি ডেনিশ কনটেইনার জাহাজ আটক, ২০১৯ সালে ব্রিটিশ ট্যাঙ্কার জব্দ এবং ২০২৪ সালে একটি তেলবাহী জাহাজ দখলের ঘটনা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়ায়।

২০২৫: বন্ধের সিদ্ধান্ত

ইসরায়েলের বিমান হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের জেরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ইরানের সংসদ হরমুজ প্রণালী বন্ধের পক্ষে ভোট দেয়, যদিও যুদ্ধবিরতির কারণে তা কার্যকর হয়নি।

২০২৬: সাম্প্রতীক উত্তেজনা

অবশেষে ২০২৬ সালে, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরান সত্যিই প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের তেল রপ্তানি থেমে যায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়।

আলী খামেনিকে হত্যা করার পর ইরান সত্যিই প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়।

হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়, এটি ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও শক্তির এক জটিল কেন্দ্রবিন্দু।