ঢাকা, ২৬ জুন বুধবার, ২০১৯ || ১২ আষাঢ় ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৬৬

উপেক্ষিত নজরুল, উপেক্ষিত খালিদ হোসেন

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

প্রকাশিত: ১৩:৫৯ ২৬ মে ২০১৯  


১. পূর্ব পাকিস্থান নামের জনপদটি হানাদারমুক্ত হলে কী নাম হবে সদ্য স্বাধীন দেশের? অনেক নামের ভিতর ' বাংলাদেশ ' নামটিকেই বেছে নেয়া হল। আর বাংলাদেশ শব্দটি নজরুলই প্রথম ব্যবহার করেন। ' বিশবকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যেথা নাইকো শেষ'। এই চরণকটির ভিতরেই নান্দনিক শোভায় তার প্রামাণিক দলিল আছে। আমাদের রণসংগীত ' চল চল চল, উর্ধ গগণে বাজে মাদল', নজরুলেরই রচনা। 'বিদ্রোহী' কবিতার মত বিস্ময় আর শিহরণ জাগানো কবিতা তামাম দুনিয়ায় অল্পই রচনা হয়েছে। কবিতা লিখে ব্রিটিশরাজের গদি কাঁপাতে নজরুলই পেরেছিলেন। ভীত সাদা চামড়ার মানুষরা সেই নজরুলকে এক বছর জেলে পুরে রেখেছিল। একাত্তরের দামাল ছেলেরা যে কজন অগ্নিগর্ভ পুরুষের ছবি বুকে এঁকে হাসতে হাসতে মৃত্যুকে বরণ করেছিল নজরুল তাঁদেরই একজন।

 

২. বিনিময়ে কিভাবে আমরা তাঁকে স্মরণ করি? বিশেষ দিবসে লোক দেখানো কিছু আয়োজন বোকার বাক্সে দেখা যায়। ইফতার সেহেরির আগে ইসলামি গান হিসেবে নজরুলের কিছু গান প্রচার করা হয়। আর সারা বছর নজরুলকে ভয়াবহ স্মৃতি বিভ্রান্তি নিয়ে হাইবারনেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। চব্বিশ ঘন্টাই সম্প্রচারিত চ্যানেলগুলিতে নজরুল ভিত্তিক দৈনিক তো দূরের কথা, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, এমন কি ত্রৈমাসিক কোন অনুষ্ঠান খুঁজে পাওয়া দুস্কর। অনলাইন এবং হার্ডকপির প্রিন্ট মিডিয়ায় হার্ডডিস্ক যেন ভুলে গেছেই নজরুল নামের এক ক্ষণজন্মা এই মাটিরই সন্তান। মহাপর্বতসম উচ্চতার এই কবিকে ভুলে যাচ্ছে এই প্রজন্ম। নজরুলের আকাশস্পর্শী মনীষাকে জানবার জন্য যে ব্যপক গবেষনার প্রয়োজন তার ভগ্নাংশটুকুও আমাদের জন্মান্ধ চোখে পড়ে না। নজরুলের কবিতাকে জঘন্যভাবে ব্যবচ্ছেদ করে পাঠ্যবইয়ে সংযুক্ত করে কোমলমতি শিশুদের শেখানো হচ্ছে বিকৃত সব রচনা। জীবদ্দশাতেই নিজের গানের সুর ও বানীর বিকৃতকরণের বহ্নতসব দেখে বোবা নজরুল মরমে মরমে শুধু কেঁদেছেন।আজও অনেক ' সেলিব্রিটি ' শিল্পীকে উদ্ধত্ত কন্ঠে বিকৃত সুর ও বানীর নজরুল সংগীত পরিবেশন করতে দেখা যায়। নজরুল মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে চেয়েছিলেন। অথচ তাঁর কবরকে ঘিরে থাকা গঞ্জিকাসেবী আর দেহপসারিনীদের উল্লম্ফন দেখবার মত নারকীয় যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর পরেও প্রতিদিনই তাঁকে আরেকবার করে মৃত্যুর হলাহল পান করতে হচ্ছে।

 

৩. খালিদ হোসেন এক বহুমাত্রিক শিল্পীর নাম।তিনি পদ - পদবী- পুরস্কারের মোহজালকে উপেক্ষা করে অন্তত একটি কাজ নিরলসভাবে আমৃত্য করে গেছেন -- সেটি হল বিকৃতির হাত হতে নজরুলের সৃষ্টিকর্ম বাঁচানো। বেনিয়া তস্কর ধর্মান্ধদের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে একজন খালিদ হোসেন এক কদম এগুলেও দুর্বিনীত ধাক্কায় তাঁকে আবার দুকদম পিছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

 

৪. নজরুলের জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রের কষাঘাতের মধ্য দিয়ে । যারা খালিদ হোসেনের কাছের মানুষ ছিলেন তাঁরা জানতেন এই মনীষীও শেষজীবনে কতটুকু অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন!

 

৫.  ক্রিকেটে ভাল করলে ফ্লাট গাড়ি মোটা ব্যাংক ব্যালান্স হয়। চাকুরেরা অবসরে গেলে প্রভিডেন্ট ফান্ড,গ্র‍্যাচুইটি পান। ক্ষেত্র বিশেষে জমি বা প্লট পান। শিল্পীরা ক্ষয় হতে হতে নিঃ শেষ হয়ে 'দুস্থ শিল্পী' হিসেবে ধারকর্জ বা দানে হাসপাতালের বিল শোধ করে পরকালে পারি জমাতে বাধ্য হন। আমরা কী খালিদ হোসেনকে এই কষ্টকর ধারাবাহিক গীতি আলেখ্য বৃত্তের বাহিরে নিতে পেরেছিলাম?

 

৬. খালিদ হোসেন,প্রিয় পিতৃব্য, আপনি চলে যেয়ে বরং ভালই করেছেন!নজরুলকে বা আপনাকে যথাযথ সন্মান দেওয়ার দৃশ্য দেখবার সৌভাগ্য তো দূরেই থাক, উপেক্ষার জগদ্দল পাথরের ভার বহন করার কষ্ট থেকে তো অন্তত মুক্তি পেলেন। প্রিয় শিল্পী, অন্যভূবনে আপনার যাত্রা শুভ হোক।