ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর বুধবার, ২০১৯ || ৩ আশ্বিন ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৬৭

কুদ্দুস মিয়ার আত্মপ্রতিকৃতি

মাহবুবর রহমান

প্রকাশিত: ১৪:২০ ২২ আগস্ট ২০১৯  


কুদ্দুস মিয়া যখন পেন্সিল নিয়ে মোটা আর্ট পেপারের উপর ছবির স্কেচ আঁকতে শুরু করে তখন তার ছোট ছোট চোখগুলো আরো ছোট হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর আলো আঁধারীতে চোখ যেখানে বিস্ফারিত হওয়ার কথা সেখানে তা আরো কুঞ্চিত হয়ে যায়। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়।

সন্ধ্যার পরে প্রতিদিন স্বাস্থ্যরক্ষার উদ্দেশ্যে অগুনতি মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউর উত্তর পাশের প্রশস্ত জায়গাটায় হেঁটে বেড়ায়। আরো উত্তরে হিমালয় পর্বতের মত মাথা উঁচু করে সংসদ ভবন, মাঝখানে বিশাল সমতল চত্বরটি বদ্বীপ বাংলা, আর তার দক্ষিণে মানিক মিয়া এভিনিউ নিজে বঙ্গোপসাগর হয়ে শুয়ে আছে।

ইদানীং সেল্ফীর অত্যাচার যখন চরমে তখন হঠাৎ করে ঢাকাবাসী কেন যে শিল্পপ্রেমিক হয়ে পড়ল সেটা একটি গবেষণার বিষয়। কুদ্দুস মিয়া একটা কাঠের স্ট্যান্ডকে পেইন্টিং ইজেল বানিয়ে সেখানে একদিকে নায়ক শাহরুখ খানের ফটোগ্রাফ এবং তারই পাশে তার আঁকা শাহরুখ খানের পেন্সিল স্কেচ ঝুলিয়ে রেখেছে, যাতে দর্শককূল সহজেই তার শিল্পগুণে মুগ্ধ হয়ে নায়কোচিত ভঙ্গিমায় আসন গ্রহণ করে।

এবং ঠিকই দেখা যাচ্ছে দু’চারজন মানুষ নিজের স্কেচে নিজের রূপ কেমন দেখায় তা পরীক্ষা করতে ফুটপাথে বিছানো পত্রিকার উপর বসে পড়ছে। মানুষ যে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার মায়াজাল ভালবাসে তারই একটি প্রমাণ হল এই প্রতিকৃতি।

প্রতিটি স্কেচ আঁকতে সাকুল্যে কুড়ি মিনিট সময় লাগে। তিনশ’ টাকা চাইলে লোকেরা দরদাম করে দু’শতে এসে ঠেকায়।প্রতিদিন চার পাঁচটা স্কেচ করতে পারলেই কুদ্দুস মিয়া বেজায় খুশি। মোহম্মদপুরের ছোট্ট এক কামরার ভাড়া বাসা, দুই ছেলেমেয়ে আর বউ নিয়ে তার সুখের সংসার। দশ বছরের কুসুম ক্লাস ফোর এ সরকারী স্কুলে পড়ে, আর চার বছরের সম্রাটকে সে নিজেই পড়ায়। সম্রাটের আসল নাম অবশ্য সম্রাট না। কুসুমের আসল নামও কুসুম না। তার বউ নামের বই দেখে আল্লাহ রসুলের নামে মেয়ের নাম রেখেছে আম্বিয়া আখতার। আয়েশা আখতারের মেয়ে আম্বিয়া আখতার। ছেলের নাম আব্দুল জলিল। আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে আব্দুল জলিল। বেশ ভরা ভরা। মুখ ভরে বলা যায়, কান ভরে শোনা যায়। “আজকাল ধনীলোকেরা ছেলেমেয়ের নাম রাখে ফাটুস ফুটুস, কাটুস কুটুস । মন্ত্রীর নাম যদি হয় চন্টু মিয়া, কুট্টু মিয়া, গুড্ডু মিয়া তাহলে তার কথা কেউ মানবে? “ একথা মনে হতেই আয়েশা আখতার ফিক করে হেসে দেয়। তবে শিল্পী কুদ্দুসের কাছে ব্যাপারটা একেবারে আলাদা। তার কাছে ছেলেমেয়ে কেবলই কুসুমকলি আর সম্রাট!

সন্ধ্যার পরে যখন কুঞ্চিত চক্ষুযুগল আলো আঁধারীর মায়াজাল ভেদ করে তার সম্মুখে বসা মডেল কাম ক্রেতার মুখমন্ডলের সহস্ররেখা নিরীক্ষণ শেষ করে চোখের তারায় নিবদ্ধ হয় তখন নিজেকে সহসা মনে হয় বিস্তীর্ণ আকাশের নীচে উন্মুক্ত হলুদ গমক্ষেতের সামনে জ্বলে ওঠা ক্ষ্যাপা ভ্যান গগ!

আর্ট কলেজের বারান্দা দিয়ে কুদ্দুস মিয়ার শিল্পজীবনের শুরু। কলেজের ছাত্রদের ছবি আঁকার ফাইফরমাশ খেটে খেটে নিজের অজান্তেই সে শিল্পের ভালবাসায় আসক্ত হয়ে পড়ে। কলেজের পানিশূন্য বিশাল পুকুরপাড়ে বসে সে উদাসীন হয়ে স্বর্ণলতার সোনালী আভায় কেমন করে বরই গাছের ডালপালার মোহাচ্ছন্ন আত্মসমর্পন ঘটছে তাই দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়ত সে। সকালের কাঁচা রোদে স্বর্ণলতার যে স্নিগ্ধ রূপ তা দুপুরের খরতাপে ঝলসে গিয়ে বিকেলের নরম রোদে প্রশান্ত আভায় পরিণত হয়ে একটি পরিপূর্ণ আনন্দে মনকে ভরে দিত। তখন এই পানিশূন্য পুকুর ক্লদ মনের জলজ শাপলা ফুলের হাসিকে হার মানিয়ে দিত। এভাবে কবিয়াল যেমন দিনে দিনে একদিন কবি বনে যায়, তেমনি বনবাদাড়ের কুদ্দুস একদিন স্বশাসিত স্বশিক্ষিত শিল্পী হয়ে পড়ে।

ইদানিং এডিস মশার অত্যাচার বড্ড বেড়ে গেছে। সকাল সন্ধ্যায় এদের জমজমাট আসর বসে। সেই আসরে বাচ্চারাই মূল টার্গেট। কুদ্দুস মিয়া এটা নিয়ে বেশ চিন্তিত। সে একটা মশার কয়েল জ্বালিয়ে রেখে ছবি আঁকার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডেঙ্গুর গুন্ডামির ভয়ে অঙ্কনপ্রার্থীদের আনাগোনা অনেকটা কমে গেছে। কুদ্দুস মিয়া তার বাচ্চাদের নিয়েও চিন্তিত ।
সে নতুন দুটো মশারি কিনে আয়েশা আখতারের কাছে দিয়ে ডেঙ্গু বিষয়ে সতর্ক করেছে। কিন্তু দিনের বেলায় বাচ্চাদের বন্দী করে রাখা সহজ কাজ নয়। তারা হইহুল্লোড় করে সবদিকে ঘুরে বেড়াবে, অকারণে জীবনের সব রহস্যের জট খুলে কল্পনার ফানুস উড়িয়ে শৈশবের আকাশকে স্মৃতিময় করে তুলবে।

এদিকে আয় ইনকামও কমে গেছে। লোকজনের মধ্যে একটা আতঙ্কবোধ কাজ করছে। মশার আতঙ্কে ঘর থেকে বের হতেই চায় না। ছবি আঁকা তো আরো পরের ব্যাপার। দেখতে দেখতে কুরবানীর ঈদও সমাগত। এবারে সবার আশা ছিল গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাবে। আবার সম্রাট আবদার করেছে একটি নতুন সাইকেলের। নতুন সাইকেলে চড়ে সে গ্রামের রাস্তায় ক্রিং ক্রিং হর্ন বাজিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবে।

জীবনের এই বিষয়টি কুদ্দুস মিয়াকে ভাবায়। অন্যকে চমকে দেয়া, তাক লাগিয়ে দেয়া। তাতে কী সুখ পায় মানুষ? ছোটবেলায় সেও এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী। তখন কেবল যুদ্ধ শেষ হয়েছে। সারাদেশ বিধ্বস্ত। তাদের ঘরে কোন রেডিও নেই। পশ্চিম পাড়ার আশরাফ গাজীর একটি তিন ব্যান্ডের রেডিও ছিল। তার বোন মরিয়মের বাড়ি ছিল কুদ্দসদের পাড়ায়। সে যখনই বোনের বাড়িতে আসত রেডিওটি সঙ্গে নিয়ে আসত। দূর থেকে রেডিওর উচ্চস্বর শুনেই বোঝা যেত যে, আশরাফ গাজী আসছে। সে সহ সব বাচ্চারা দৌড়ে রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়াত। তা দেখে আশরাফ গাজীর দেড়হাত বুক ফুলে দু’হাত হয়ে যেত। সে রেডিওর ভলিউম সর্বোচ্চ উচ্চতায় দিয়ে গটগট করে হেঁটে যেত। কুদ্দুসের দল তা দেখে শুনে বিমোহিত, চমৎকৃত এবং হতাশায় বিধ্বস্ত হয়ে হা হয়ে তাকিয়ে থাকত।

সেই হতাশা এখনো কাটেনি। তার ছেলেমেয়ের অপূরিত আবদারের ভেতর সে ছোটবেলার সেই আকাঙ্খার ছবি দেখতে পায়। রঙিনফিতায় অলংকৃত একটি ছোট রিকসার দাম বেশি নয় কিন্তু তার মূল্য কুদ্দুসের কাছে অপরিসীম। রিকসার প্যাডেল সম্রাটের পায়ের সংস্পর্শে হিল্লোলিত হয়ে খুশির ঝিলিক দিকবিদিকে বিচ্ছুরিত হবে।

এদিকে নগরপিতার গুজবতত্ত্বে কান না দিয়ে ডেঙ্গু তার সমহিমায় আবির্ভূত হল। কুদ্দুস যা আশঙ্কা করছিল তাই হল। ছেলেটার দু’দিন ধরে জ্বর। গা ব্যথা, মাথা ব্যথা , খেতে গেলেই বমি। তিনদিনের দিন তাকে নিয়ে শিশু হাসপাতালে গেল। সবদেখে ডাক্তার বললেন-পানিশূন্য হয়ে গেছে, ভর্তি করতে হবে।

ভর্তির কথা শুনে কুদ্দুসের মাথা চক্কর দিল। হাসপাতালে সম্রাটের সাথে কে থাকবে? মাকে এখানে রাখলে মেয়েটাকে কে দেখবে? আবার কাজে না গেলে খরচ কোত্থেকে আসবে? ওষুধের দাম কোত্থেকে যোগাড় হবে? বড়ই জ্বালায় পড়ে গেল।

আজ তিনদিন ধরে সম্রাট হাসপাতালে ভর্তি। কিচ্ছু খাচ্ছে না। শুধু স্যালাইন দিতে হচ্ছে। রক্তের প্লেটলেট কমে চল্লিশ হাজারে নেমে এসেছে। এই তিনদিন কুদ্দুস কাজে যাচ্ছে না। পয়সাকড়িও শেষ হয়ে আসছে। সামনের পথ এমন অন্ধকার হয়ে এলো কেন?

ডাক্তার বলেছেন প্লেটলেট আরো কমে গেলে রক্ত দিতে হতে পারে। তাকে প্রস্তুত হতে বলেছেন। প্রস্তুতিহীন জীবনে সে কী প্রস্তুতি নিবে?

শিশু হাসপাতাল থেকে পায়ে হেঁটে সে মানিক মিয়া অভিমুখে রওনা দেয়। তার কর্মক্লান্ত ক্ষুধার্ত শরীর আর শক্তি পাচ্ছে না। সামনে কুরবানী। রাস্তায় অসংখ্য বন্দী গরুর দল। সবাই দাম জানতে চায়।
-কত হল ভাই?
-আশি হাজার।

একটু পরে আরেকজন- কত দাম ভাই?
-“এক লাখ দশ। আরে ভাই আর বইলেন না। আজ গরুর রাজা ‘বস’ বিক্রি হইছে সাতত্রিশ লাখে! বাপের বেটা ভাতিজা দ্যাখাইয়া দিল।”

কুদ্দুস একা একা শুনে যায়। কুরবানী কি তাক লাগিয়ে দেয়া? ভাতিজা কি দ্যাখাইল? কাকে দ্যাখাইল? সে মেঘশূন্য আকাশের দিকে একবার তাকায়। একটা গরুর দামের সমানও দাম তার নেই। দাসপ্রথা আবার চালু করা যায় না? তাহলে সে নিজেকে বিক্রি করে সম্রাটের চিকিৎসার জন্য টাকা যোগাড় করত।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কুদ্দুস পেন্সিল হাতে ফুটপাথে বসে পড়ে। সে পেইন্টিং ইজেল থেকে শাহরুখ খানের ছবি নামিয়ে ফেলে। সেখানে সম্রাটের একটি ছবি ঝুলিয়ে দেয়। সে অসহায়ের মত পথচারীদের ছবি করার জন্য অনুরোধ করে।

-ভাই আমার ছেলে ডেঙ্গু জ্বরে খুব অসুস্থ। একটা ছবি করে দিই? আমার কিছু টাকা দরকার।
তার এই অনুরোধ সহজে কেউ ভ্রূক্ষেপ করে না। অবশেষে একজন দয়াপরবশ হয়ে মডেল হয়ে বসলেন।

কুদ্দুস পেইন্টিং পেপারে পেন্সিল চালনা শুরু করল। মডেল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কুদ্দুসকে উদ্ভ্রান্তের মত লাগছে। ছবির অর্ধেক শেষ হতেই সে দেখল ভুল করে সম্রাটের ছবিই সে আঁকছে। বিব্রত হয়ে নতুন কাগজে আবার আঁকা শুরু করল। তার টাকা লাগবে। সম্রাটের জন্য রক্ত যোগাড় করতে হবে । ইনজেকশন কিনতে হবে। একটি নতুন সাইকেল। ক্রিং ক্রিং।

কিন্তু না। এবারেও সে একই ভুল করল। সে ঘুরেফিরে কেবল আত্মজের ছবিই এঁকে যাচ্ছে।মডেল দিয়ে শুরু করছে, কিন্তু অজান্তেই তা হয়ে উঠছে সম্রাটের ছবি। হঠাৎ সে দেখতে পেল ক্যানভাসের ঈশানকোণ থেকে নেমে আসছে ভ্যান গগের একঝাঁক কালো কাক। তার বুকটা ধক করে উঠল। সে তড়িঘড়ি সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার মাথা কাজ করছে না। সে তার হাতে থাকা পেন্সিল আর সম্মুখে থাকা পেইন্টিং আইজেলকে ফুটপাথে ছুঁড়ে ফেলল।

“বাবা সম্রাট তুই আমাকে ছেড়ে যাইস না! আমাকে সঙ্গে নিয়ে যা বাবা!”- এই বলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কুদ্দুস শিশু হাসপাতাল অভিমুখে দৌড় শুরু করল।