ঢাকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার, ২০২৬ || ৫ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food

গণতন্ত্রের ‘বিকল্প’ দর্পণ: ছায়া সরকার ও ছায়া মন্ত্রিসভা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:০২ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য কেবল সংখ্যাগুরু দলের শাসন নয়, বরং সংখ্যালঘুর গঠনমূলক সমালোচনা। এই সমালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো ‘ছায়া সরকার’ ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’। সহজ কথায়, মূল সরকারের সমান্তরালে বিরোধী দল যখন নিজেদের দক্ষ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে একটি বিকল্প কাঠামো গঠন করে, তাকেই বলা হয় ছায়া সরকার।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি ‘অপেক্ষমাণ সরকার’। সরকার যদি কোনো ভুল করে বা ব্যর্থ হয়, তবে বিকল্প হিসেবে ছায়া সরকার তার ভুল ধরিয়ে দেয় এবং জনসমক্ষে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।

ছায়া সরকার ও ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?

একটি ছায়া সরকার পরিচালিত হয় বিরোধী দলীয় নেতার নেতৃত্বে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর নজরদারির জন্য বিরোধী দল থেকে একজন করে সদস্যকে নির্দিষ্ট করা হয়। যেমন— সরকারের একজন অর্থমন্ত্রী থাকবেন, তেমনি বিরোধী দলেও একজন ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’ থাকবেন।

সরকারের মন্ত্রী যখন কোনো বাজেট বা পরিকল্পনা পেশ করেন, ছায়া অর্থমন্ত্রী তখন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এবং বিকল্প প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এতে সাধারণ মানুষ জানতে পারে যে বর্তমান সরকারের বাইরেও সমস্যা সমাধানের অন্য কোনো পথ আছে কি না।

একাডেমিক প্রেক্ষাপটে ছায়া সরকার বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ হলো সংসদীয় শাসনব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক কাঠামো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আইভর জেনিংস (Ivor Jennings) একে ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি মূলত ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনিস্টার মডেলের একটি উদ্ভাবন, যেখানে বিরোধী দল কেবল সরকারের সমালোচনা করে না, বরং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন নির্দিষ্ট ‘ছায়া মন্ত্রী’ নিয়োগের মাধ্যমে বিকল্প নীতি প্রণয়ন করে।

তাত্ত্বিকভাবে, ছায়া মন্ত্রিসভা সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিপ্পা নরিস (Pippa Norris) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একটি শক্তিশালী ছায়া সরকার থাকলে তথ্য বৈষম্য হ্রাস পায়। কারণ, সরকারি মন্ত্রীরা যখন প্রশাসনিক তথ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তখন ছায়া মন্ত্রীরা বিশেষজ্ঞ ও থিংক-ট্যাংকের সহায়তায় সেই তথ্যের ব্যবচ্ছেদ করেন।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান মনে করতেন, নিয়মিত ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘পলিসি রিসার্চ’ বা নীতি-গবেষণার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এটি ক্ষমতার আকস্মিক পটপরিবর্তনের সময় প্রশাসনিক শূন্যতা বা বিশৃঙ্খলা রোধে সহায়তা করে। একাডেমিক বিশ্লেষণে, একে কেবল বিরোধী দলের কৌশল হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস (Checks and Balances) ব্যবস্থার একটি কার্যকরী অংশ হিসেবে দেখা হয়।

এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

•    জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা।
•    বিকল্প নীতি প্রণয়ন: সমালোচনার পাশাপাশি নিজস্ব নীতি ও সমাধান পেশ করা।
•    প্রস্তুতি গ্রহণ: ভবিষ্যতে ক্ষমতা লাভের পর কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে, তার একটি মহড়া বা চর্চা।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ছায়া সরকার’ শব্দটি অনেকবার উচ্চারিত হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা অত্যন্ত সীমিত। ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনিস্টার মডেলের সংসদীয় গণতন্ত্র অনুসরণ করলেও আমাদের দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরার পর থেকে বিরোধী দলগুলো মাঝেমধ্যে ছায়া সরকার গঠনের কথা বললেও তা মূলত রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

এর প্রধান কারণগুলো হলো-

১. রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা

সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বৈরী সম্পর্ক।

২. সংসদ বর্জন

দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি ছায়া সরকারের কার্যকারিতাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

৩. কাঠামোগত অভাব

বিরোধী দলের ভেতরে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে। এতে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের সক্ষমতা যেমন প্রকাশ পাবে, তেমনি সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতার ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হবে।

বিশ্বজুড়ে ছায়া সরকারের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ

ছায়া সরকারের ধারণাটি সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তরাজ্যে, তবে অন্যান্য দেশেও এর বৈচিত্র্যময় চর্চা রয়েছে। নিচে উদাহরণ দেওয়া হলো-

ক্রমিক দেশ, ধরন ও বৈশিষ্ট্য

১. যুক্তরাজ্য: এটিই ছায়া সরকারের ধ্রুপদী উদাহরণ। এখানে বিরোধী দলীয় নেতাকে ‘রাজকীয় বিরোধী দল’ (His Majesty's Loyal Opposition) বলা হয়। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা সংসদে সরকারি মন্ত্রীদের সরাসরি প্রশ্ন করেন।

২. কানাডা: কানাডায় একে বলা হয় ‘অফিসিয়াল অপজিশন শ্যাডো ক্যাবিনেট’। এখানে ছায়া মন্ত্রীদের নির্দিষ্ট বাজেট এবং কার্যালয় দেওয়া হয় যাতে তারা দক্ষতার সাথে সরকারি নীতি পর্যালোচনা করতে পারেন।

৩. অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলীয় রাজনীতিতে শ্যাডো ক্যাবিনেট অত্যন্ত শক্তিশালী। বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যরা এই কমিটির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের নীল নকশা তৈরি করেন।

৪ নিউজিল্যান্ড: এখানে ছায়া মন্ত্রীরা জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন এবং সরকারি খসড়া আইনের বিপরীতে নিজেদের সংস্করণ পেশ করেন।

৫ জাপান: জাপানি রাজনীতিতে ‘নেক্সট ক্যাবিনেট’ (Next Cabinet) নামে একটি ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। মূল সরকারের বিকল্প হিসেবে এটি নীতি নির্ধারণী বিতর্ক পরিচালনা করে।

কেন বাংলাদেশে এটি প্রয়োজন?

বাংলাদেশের সংবিধানে বিরোধী দলীয় নেতাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেবল পদমর্যাদাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল অংকে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের খুঁটিনাটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োজন।

শিক্ষিত রাজনীতির চর্চা

ছায়া সরকার থাকলে বিরোধী দলের নেতারা কেবল রাজপথে স্লোগান না দিয়ে নথিপত্র এবং উপাত্ত নিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হতেন।

জাতীয় সংকট নিরসন

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা জ্বালানি সংকটের মতো সময়ে ছায়া মন্ত্রিসভা যদি কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব দিত, তবে জনমনে আস্থার জায়গা তৈরি হতো।

গণতান্ত্রিক ভারসাম্য

সরকার যখন জানবে যে তাদের প্রতিটি ফাইল একজন ‘ছায়া মন্ত্রী’র আতশিকাঁচের নিচে আছে, তখন দুর্নীতি বা অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে।

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়, বরং ভোটের পরবর্তী পাঁচ বছর সরকারকে প্রশ্নের মুখোমুখি রাখা। একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য বাংলাদেশে ছায়া সরকার গঠনের চর্চা শুরু হওয়া এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার একটি বুদ্ধিভিত্তিক প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ব্যক্তিপূজা থেকে বেরিয়ে এসে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারে, তবেই প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।