ঢাকা, ২১ আগস্ট বুধবার, ২০১৯ || ৫ ভাদ্র ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
১৪৩

ডেঙ্গু থেকে রেহাই পাবেন যেভাবে

প্রকাশিত: ২০:০৬ ৩১ জুলাই ২০১৯  


এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে কাজ করছে উদ্বেগ, আতঙ্ক, অস্থিরতা। এই রোগ ভয়াবহ আকারে ছড়ানোর কারণ কী, এডিস মশা ও ডেঙ্গু কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানী ড. কবিরুল বাশার।

এ বছর এডিস মশার প্রকোপ বেশি কেন? 
এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বৃষ্টি হওয়ায় এডিস মশার বিস্তার এতটা ব্যাপকভাবে হয়েছে। ১৯৫৩ সালের পরে এবারই ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এডিস মশার একটি ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টারেস্টিক আছে। এ মশার ডিম ধানের বীজের মতো। শুকনা অবস্থায় ৬ মাস থাকতে পারে। এর মধ্যে ডিমটা নষ্ট হবে না। আগের বছরের ডিম অর্থাৎ অক্টোবর মাসে যে ডিমটা এডিস মশা ছেড়েছে এর চারমাস পর যখন ফেব্রুয়ারিতে পানি পেয়েছে তখন এডিস মশার বড় গ্রুপ ঢাকা শহরে জন্ম হয়েছে। এরপর মার্চ-এপ্রিল মাসে যখন থেমে থেমে বৃষ্টি হলো তখন এডিস মশার বিস্তার বা সংখ্যাটা বেড়ে গেল ব্যাপকভাবে। অন্যদিকে ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিবছর কমবেশি আছেই, এডিস মশার ঘনত্ব যখন বেশি মাত্রায় বেড়ে গেছে তখন এটা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। অপরিকল্পিত নগরায়ন তা ছড়াতে আরও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

ঢাকা শহরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু কত সালে?
১৯৬৪ সালে ঢাকাতে প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয়। তখন ডেঙ্গুকে বলা হতো ঢাকা ফিভার। এরপর ২০০০ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। ২০০০ সালের পর প্রতিবছরই কম-বেশি ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গু এডিস মশার কামড়ে হয়। এডিস মশার দুটি প্রজাতি রয়েছে। একটি হচ্ছে এডিস এলবোপিকটাস আর একটা এডিস ইজিপটাই। এই ইজিপটাই মশাটিই হচ্ছে ৯৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগের বাহক। ঢাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার কারণ এই এডিস ইজিপটাই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতি জনসংখ্যার অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে। এ বিষয়ে আপনার কী মন্তব্য?
আমরা ঢাকা শহরে বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা বা জরিপ করে দেখেছি যে, অপরিকল্পিত নগরায়নের সঙ্গে এডিস মশার নিবিড় একটা সম্পর্ক আছে। এডিস ইজিপটাই মশাকে গৃহপালিত মশা হিসেবে ধরা হয়। ইংরেজিতে একে ডমিস্টিক মসকিউটো বলে। যে মশা ঘরের আশপাশে থাকতে পছন্দ করে, বিশেষত বাড়ির পাশে, বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে। নির্মাণাধীন ভবন এডিস মশার প্রিয় আবাসস্থল। ঢাকা শহরে অনেক ভবন নির্মাণে প্রায় কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যা ভয়ঙ্কর। খুবই ভয়ঙ্কর।

এডিস মশা প্রতিরোধে করণীয় কী? 
আমাদের দেশে যতক্ষণ আমরা বিপদে না পড়ি ততক্ষণ পর্যন্ত কাজে নামি না। সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল একটা অ্যাকশন-প্ল্যান তৈরি করা। ডেঙ্গু পরিস্থিতি জুন-জুলাইয়ে অবনতি হলে কীভাবে মোকাবেলা করবে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য এনটোমোলজিস্ট বা কীটতত্ত্ববিদের দরকার। সিটি করপোরেশনের আসলে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। সিটি করপোরেশন মসকুইটো কন্ট্রোলের যে প্রোগ্রামটা করে তা মূলত কিউলেক্স প্রজাতির মশার জন্য। কিউলেক্স মশা ড্রেন, ডোবা, নর্দমা, পচা পানিতে হয়। কিন্তু এডিস মশা পচা পানিতে হয় না। এখানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং কিউলেক্স মশার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এক হবে না। দুটির প্রক্রিয়া আলাদা। আর এডিস মশা তো রাস্তায় থাকে না। এডিস মশা হচ্ছে গৃহপালিত মশা। এখন এই মুহূর্তে রাস্তায় স্প্রে করলে লাভ হবে না। আর যে স্প্রে-ম্যানরা কাজ করছেন তাদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মশা দুইভাবে কন্ট্রোল হয়। একটা হয় পানিতে। মশা ডিম পাড়ে পানিতে, সেখানে লার্ভা হয়, এরপর পিউপা হয়। পিউপা পর্যন্ত এটি পানিতে থাকে। এই পিউপা দশা পর্যন্ত সেটাকে পানিতে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সেটা একধরনের ইনসেক্টিসাইড ব্যবহার করতে হয়। যখন মশাটা উড়ন্ত হয়ে যায় তখন সেটাকে আরেকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই দুটো নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে একসঙ্গে চালাতে হবে। একটা উড়ন্ত মশাকে মারার একঘণ্টা পর আবার পানি থেকে আরেকটা মশা চলে আসছে। আমরা যদি দুটো পদ্ধতিই যুগপৎভাবে চালিয়ে না নিই তাহলে মশা নিয়ন্ত্রণ হবে না। আর সিটি করপোরেশন এর সঙ্গে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে না পারলে কোনোভাবেই সফলতা আসবে না।

বিতর্ক উঠেছে, সিটি করপোরেশনের ব্যবহৃত মশা মারার ওষুধ কাজ করছে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
মশা মারার জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে তার আয়ু শেষ হয়ে গেছে-এটা একটা ভুল তথ্য। সায়েন্টিফিক্যালি বলি, সিটি করপোরেশন দক্ষিণ ও উত্তর তিনটা ‘ইনসেক্টিসাইড’-র একটা কম্বিনেশন ব্যবহার করে। টেট্রামেট্রিন, পেলেথ্রিন ও পারমাথ্রিন। এই তিনটা ইনসেক্টিসাইডের তিন ধরনের কার্যকারিতা আছে। একটা হচ্ছে নকডাউন এজেন্ট, যেটা মশাকে ফেলে দেবে; আরেকটা হচ্ছে কিলিং এজেন্ট, যেটা মশাকে মেরে ফেলবে; আরেকটা এক্টিভিটিং এজেন্ট, যেটা মশাকে এক্টিভ করবে। অর্থাৎ এক্টিভেট করলে ইনসেক্টিসাইডটা সহজে মশার দেহে ঢুকবে। তিনটির তিন ধরনের কার্যকারিতা। এই তিনটা অস্ত্র একসঙ্গে সিটি করপোরেশন ব্যবহার করে। এটা কাজ করার কথা। এটা রিকমেন্ড করা হয়েছে। সেটা সিটি করপোরেশন ব্যবহার করছে।

একটা তথ্য নিয়ে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে-আইসিডিডিআর’বি একটা গবেষণা করেছে, সেই গবেষণার ম্যাথেডোলজিটা ভিন্ন। তারা এই তিনটা উপাদানের মধ্যে একটা উপাদান কিলিং এজেন্ট নিয়ে টেস্ট করেছে, যেটা মশাকে মেরে ফেলে। সেটাকে তারা অকার্যকর দেখতে পেয়েছে এবং তারা ঘোষণা দিয়েছে, সিটি করপোরেশনের মশা মারার যে ওষুধ সেটা কার্যকর নয়। আমি একজন মশা গবেষক হিসেবে এই গবেষণা পদ্ধতি পুরোপুরি একসেপ্ট করতে পারি না। যুক্তিটা হচ্ছে তিনটার যে ককটেল সিটি করপোরেশন ব্যবহার করে, সেই তিনটাকে একসঙ্গে পরীক্ষা করা হয়নি। তিনটা উপাদান একসঙ্গে নিলে কাজ করবে বেশি। এজন্য উচিত ছিল তিনটা উপাদানের সম্মিলিত কীটনাশক টেস্ট করা। একটা টেস্ট করেই এই মুহূর্তে মিডিয়ার কাছে বলে দেওয়াটা ঠিক হয়নি।

বর্তমান ক্রাইসিস মুহূর্তে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেটা একটা বড় সংকট। এই পরিস্থিতিতে কমপ্লিট যুদ্ধে নামতে হবে। এই যুদ্ধ শুধু সিটি করপোরেশনের একার নয়, এখানে জনগণকে অংশ নিতে হবে। এডিস মশা যেহেতু বাড়িতে হয়, সেহেতু নগরবাসী সচেতন না হলে এটা নিয়ন্ত্রণ হবে না। সিটি করপোরেশনকে একদম ক্রাস প্রোগ্রাম করতে হবে। যে মশাগুলো উড়ন্ত অবস্থায় আছে, যে মশাগুলো ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করছে, সেগুলোকে ফেলে দিতে হবে। আগে যেভাবে রাস্তাতে, ড্রেনে স্প্রে করা হতো সেখানে স্প্রে করা যাবে না। মানুষের ঘরবাড়ির ভেতরে ঢুকে, বাড়ির চারপাশে স্প্রে করতে হবে। এটা করে ইনফেক্টেড মশাটা মেরে দিতে হবে। আর জনগণের কাজ হচ্ছে, প্রত্যেকে তার বাড়ির চারপাশে পরীক্ষা করতে হবে। যদি ঘরের বা বাড়ির চারপাশে কোথাও পানি জমে থাকে, সেখানে পোকা হচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। যদি পোকা হয় সেটা উল্টে দিতে হবে। যদি নগরবাসী একযোগে আধাঘণ্টা সময় তার বাড়িটা একটু চেক করেন তাহলে পঞ্চাশ শতাংশ মশা এমনিতেই কমে যাবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন? 
মশা নিয়ন্ত্রণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ না, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার নেতৃত্বে আমরা বিভিন্ন জায়গায় এডিস মশার জরিপ, ঘনত্ব নির্ণয় করছি ও জনগণকে সচেতন করছি। ডাক্তারদের জন্য গাইড লাইন তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে কীভাবে ডেঙ্গু রোগীর ম্যানেজমেন্ট করবে, সেটা নিয়ে তারা কাজ করছে। সেটা নিয়ে খুব বেশি গাফিলতি আমি দেখি না। এখন ডাক্তাররাও ভালোভাবে ট্রেইন্ড এবং ডেঙ্গুজ্বর নির্ণয় খরচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

এরই মধ্যে প্রায় সব জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন পরই ঈদ। ঢাকা থেকে মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাবে। এর ফলে সারা দেশে ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে কি?
এরমধ্যে অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। কারণ এসিড মশা সব শহরেই আছে। ঢাকা থেকে অন্য শহরের মানুষ র‌্যাপিড মুভমেন্ট করছেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী এ ভাইরাস এক শহর থেকে আরেক শহরে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানেও এডিস মশা রয়েছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে, কারণ সামনে ঈদে। এ সময়ে বড় একটা কমিউনিটি ঢাকা থেকে অন্যান্য শহরে যাবে। এখন থেকে অন্য শহরের মেয়রদেরকেও অ্যাকশন প্ল্যানে যেতে হবে। তা না হলে ঢাকা থেকে রোগী যাবে, সেখানে এডিস মশা আছে। তাই ভাইরাস ছড়াবে।

এডিস মশা কি আসলেই রক্ত খায়? মশা মানুষের শরীরে হুল ফুটায় কেন?
মজার তথ্য হলো, পুরুষ মশা কিন্তু রক্ত খায় না। স্ত্রী মশা রক্ত খায় যখন তার পেটে ডিম আসে। কারণ রক্ত না খেলে তার ডিম বাচ্চাতে রূপান্তরিত হয় না। এ জন্য বাচ্চা ফোটার জন্য মা মশা রক্ত খায়। স্ত্রী মশার পেটে গড়ে ১৫০-২০০টি ডিম থাকে। যখন সে মনে করবে এই ডিমের ব্লাড প্রোটিন ফুল হয়েছে তখন সে রক্ত নেওয়া বন্ধ করে দেবে।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে লন্ডন থেকে ‘ভদ্র মশা’ আমদানির চিন্তা করা হচ্ছে। এটি কতটা কার্যকর হবে?
এটি ল্যাবে তৈরি করা একধরনের মশা। ওলবাকিয়া নামক একটি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে সেগুলো প্রকৃতিতে যে মশা আছে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য গ্রহণ করার আগে গবেষণা দরকার।

বাংলাদেশে কত প্রজাতির মশা রয়েছে? 
বাংলাদেশে ১২৩ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। আর ঢাকা শহরে রয়েছে ১২ প্রজাতির মশা। এর মধ্যে দুই ধরনের মশা ঢাকা শহরে খুবই প্রভাবশালী। একটি এডিস অপরটি কিউলেক্স।