ঢাকা, ২৭ নভেম্বর শনিবার, ২০২১ || ১৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৮
good-food
৫৩

তিস্তা প্রকল্প দুর্দশাপীড়িত উত্তরের জনপদ বদলে দেবে

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৩৩ ৩ নভেম্বর ২০২১  


ড. মইনুল ইসলাম: তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ অত্যধিক গতিতে বাড়লে ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে দেয়। ফলে বাংলাদেশের ডালিয়া পয়েন্ট থেকে শুরু করে লালমনিরহাট জেলার চারটি উপজেলা এ বর্ষায় প্রবল বন্যায় তলিয়ে যায়। অনেক সড়ক ভেঙে গেছে, ধান-পাট-শাকসবজির ক্ষেত ভেসে গেছে, ঘরবাড়ি পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে, মানুষের জীবন-জীবিকা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর প্রতি বছর চার থেকে ছয়বার এভাবে তিস্তার বন্যার কবলে বিধ্বস্ত হওয়ায় রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা-তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের ভবিতব্য হয়ে গিয়েছিল। তিস্তা নদীর উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি সম্পূর্ণভাবে আটকে দেয়ার পর তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশ বছরের বেশির ভাগ সময় প্রায় পানিশূন্য থাকছে। আবার ভরা বর্ষায় কয়েকবার গজলডোবা ব্যারাজের গেটগুলো খুলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ জেলাগুলোর তিস্তা-তীরবর্তী বিভিন্ন অংশ বন্যায় বারবার বিধ্বস্ত হচ্ছে। কারণ বাঁধ নির্মাণের কারণে তিস্তা নদীর পুরো বাংলাদেশ অংশের ১১৫ কিলোমিটারের তলদেশ ভরাট হয়ে নদীর পানি বহন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে, নদীর যত্রতত্র চর পড়েছে, নদীর প্রশস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আমরা সবাই জানি যে তিস্তা নদী ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং খামখেয়ালি আচরণের একটি নদী। বলা হতো, এলাকার জনগণের জীবন ও জীবিকার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তিস্তা নদী। এলাকার জনগণ সেজন্য এ নদীকে ‘পাগলা তিস্তা’ নামেই অভিহিত করে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর সমস্যাগুলো মহাসংকটে পরিণত হয়েছে। উপরন্তু, সিকিম রাজ্যের সীমানায় তিস্তা নদীতে অনেক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ব্যারাজ নির্মাণের ফলে গজলডোবা পয়েন্টেও পানিপ্রবাহ একেবারেই স্তিমিত হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ উভয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সেচের পানি পাওয়ার সম্ভাবনা এখন নেই বললেই চলে। দুঃখজনক হলো, একটি আন্তর্জাতিক নদীর উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি সম্পূর্ণভাবে আটকে দেয়া এবং ভরা বর্ষায় কয়েকবার গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোকে বন্যায় বারবার বিধ্বস্ত করার কোনো নৈতিক দায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র গ্রহণ করার প্রয়োজন বোধ করছে না।

দীর্ঘ তিন দশকের কূটনৈতিক আলোচনার পথ ধরে যখন ২০১১ সালে দুই দেশ শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং চুক্তি স্বাক্ষর থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। দুটো সার্বভৌম দেশের সম্পর্ক একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিলতার কাছে জিম্মি হতে পারে না। অন্যদিকে এ সম্পর্কে একটি সুখবর হলো, তিস্তাপাড়ের জনগণের এই মানবেতর দুঃখ-কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে চীনের সহায়তায় বাংলাদেশ ‘তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প প্রস্তুত করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তা অনুমোদনের জন্য একনেকে এখনো উপস্থাপন করা হচ্ছে না! প্রায় আড়াই বছর আগে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চীন সফরের সময় এ প্রকল্প প্রণয়নের জন্য চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যাতে ‘চীনের দুঃখ’ হিসেবে একসময় বিশ্বে বহুল পরিচিত হোয়াংহো নদী বা ইয়েলো রিভারকে চীন যেভাবে ‘চীনের আশীর্বাদে’ পরিণত করেছে, ওই একই কায়দায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনগণের জন্য প্রতি বছর সর্বনাশ ডেকে আনা তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনাকেও একটি বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করা যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে সম্পূর্ণ চীনা অর্থায়নে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পর প্রকল্প প্রস্তাবটি চীনের পক্ষ থেকে বছরখানেক আগেই বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে ঋণ প্রদানেরও প্রস্তাব দেয়।

প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশের সীমানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ১১৫ কিলোমিটারে ব্যাপক খনন চালিয়ে নদীর মাঝখানের গভীরতাকে ১০ মিটারে বাড়ানো হবে এবং নদীর প্রশস্ততাকে ব্যাপকভাবে কমানো হবে। একই সঙ্গে রিভার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক ভূমি উদ্ধার করে চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। নদীর দুই তীর বরাবর ১১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হবে। উপযুক্ত স্থানে বেশ কয়েকটি ব্যারাজ-কাম-রোড নির্মাণ করে নদীর দুই তীরের যোগাযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্ষাকালে প্রবাহিত নদীর বিপুল উদ্বৃত্ত জলরাশি সংরক্ষণের জন্য জলাধার সৃষ্টি করে সেচ খাল খননের মাধ্যমে নদীর উভয় তীরের এলাকার চাষযোগ্য জমিতে শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রায় ছয় লাখ হেক্টর জমি নাকি এ সেচ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। উপরন্তু, নদীর উভয় তীরের সড়কের পাশে ব্যাপক শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সুবিধা গড়ে তোলা হবে। ইন্টারনেটে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির বর্ণনা জেনে আমার মনে হয়েছে এটি বাস্তবায়ন হলে সত্যি সত্যিই তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনজীবনে একটা যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে সমর্থ হবে। আমি প্রকল্প প্রস্তাবের অনুমোদন-প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সেজন্যই অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে ২০২০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটির অনুমোদন হয়ে যাবে। কিন্তু খবর নিয়ে জানা গেল এ প্রকল্প আটকে রয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের বর্ণনা জানাজানি হওয়ার পর দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ খুশি। প্রকল্পটির আশু বাস্তবায়নের জন্য উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক বছরে বেশ কয়েকটি মানববন্ধন ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি অক্টোবরের শেষ দিকে খবর বেরিয়েছে যে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী পানি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়কে ‘তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্ত থেকে তিস্তা নদীর ১৬ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত নদী খননের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করবে বাংলাদেশ সরকার। এই অংশের কাজ এ বছর শুষ্ক মৌসুমে শুরু করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রকল্প প্রণয়ন করার নির্দেশ জারি হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। ছয় মাসের মধ্যে এই অংশের নদী খনন সম্পন্ন হওয়ার পর বাকি প্রকল্পের কাজ নাকি শুরু করবে চীনের ঠিকাদার এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই সাহসী সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিস্তা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো ‘প্রেস্টিজ প্রজেক্ট’ নয় কিন্তু দুর্দশাপীড়িত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণের জীবন ও জীবিকাকে এ প্রকল্প বিপ্লবাত্মক গতিতে বদলে দেবে।