ঢাকা, ০৬ নভেম্বর শুক্রবার, ২০২৬ || ২১ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৭

দিনে কত কাপ চা পান করা উচিত

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০১:৫৭ ৬ নভেম্বর ২০২৬  

সকালে এক কাপ চা পান করা অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। চা মন সতেজ করার পাশাপাশি হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও কমাতে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা রয়েছে।

তবে চায়ের উপকারিতা শুধু কতটা পান করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। চা কীভাবে তৈরি করছেন এবং কতটা গরম অবস্থায় পান করছেন, সেটিও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে উঠে এসেছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায়।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই গবেষণার ফলাফল এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চায়ের প্রভাব ব্যাখ্যা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. লিয়ানা ওয়েন।

গবেষণায় চীনের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ৪ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা সপ্তাহে কত দিন চা পান করেন, কোন ধরনের চা পছন্দ করেন, চা কতটা কড়া করে তৈরি করেন এবং কী পরিমাণ গরম অবস্থায় পান করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষকেরা প্রায় নয় বছর ধরে তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ১৪ হাজার ৮০০টির বেশি রোগের ঘটনা শনাক্ত হয়। এসব রোগের মধ্যে ছিল হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (হাত ও পায়ে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিগুলো সরু হয়ে যায়)।

নিয়মিত চা পানে ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত

ডা. লিয়ানা ওয়েনের ভাষ্য, গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, যারা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন চা পান করেন, তাদের রক্তনালির রোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম। বয়স, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রম, শরীরের ওজন এবং আগে থেকে থাকা অন্যান্য রোগের বিষয়গুলো হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পরও এই পার্থক্য দেখা গেছে।

তবে শুধু চা পান করাই ঝুঁকি কমার একমাত্র কারণ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ধূমপান করেন না, নিয়মিত চা পান করেন এবং শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয়, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম।

চায়ের ঘনত্বের সঙ্গেও ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মাঝারি মাত্রার কড়া চা পানকারীদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি কম দেখা গেছে। একইসঙ্গে গ্রিন টির তুলনায় লিকার চা বা ব্ল্যাক টি বেশি ধরনের হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

তবে গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া গেছে চায়ের তাপমাত্রা নিয়ে। যারা ‘জিভ পুড়ে যাওয়ার মতো’ অতিরিক্ত গরম চা পান করেন বলে জানিয়েছেন, নিয়মিত চা পান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের রক্তনালির রোগের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বেশি দেখা গেছে।

অন্যদিকে, স্বাভাবিক তাপমাত্রার বা সহনীয় গরম চা পানকারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নিয়মিত চা পান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।

গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওয়েন। গবেষকেরা চায়ের তাপমাত্রা সরাসরি না মেপে এ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে একজনের কাছে যে চা অতিরিক্ত গরম মনে হয়, অন্যজনের কাছে সেটি স্বাভাবিক মনে হতে পারে। এ ছাড়া যারা খুব গরম চা পান করেন, তাদের খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাপনের অন্য কোনো বিষয়ও হৃদরোগের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

চা কীভাবে হৃদযন্ত্রের উপকার করে

চায়ের সম্ভাব্য উপকারিতার পেছনে রয়েছে এতে থাকা প্রাকৃতিক কিছু উপাদান। ওয়েন জানান, চায়ে ‘পলিফেনল’ নামের যৌগ থাকে, যার মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েডও রয়েছে। এসব উপাদানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহরোধী গুণ আছে। এই উপাদানগুলো রক্তনালির ভেতরের কোষকে সুরক্ষা দিতে এবং ধমনির প্রসারণক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ কমে।

বিভিন্ন গবেষণাতেও নিয়মিত চা পানের সঙ্গে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা উন্নত হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ কারণে নিয়মিত চা পানকারীদের মধ্যে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের হার তুলনামূলক কম দেখা যায়।

চিনি ছাড়া চা পান করলে আরও একটি উপকার পাওয়া যেতে পারে। ফলের জুস, সোডা বা কোমল পানীয়ের পরিবর্তে চা পান করলে শরীরে বাড়তি চিনি প্রবেশ করে না। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুবিধা হয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টির মধ্যে কোনটি ভালো

ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি তৈরি হয় একই উদ্ভিদ ‘ক্যামেলিয়া সিনেনসিস’ থেকে। তবে চা-পাতা প্রক্রিয়াজাত করার পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় দুই ধরনের চায়ে পলিফেনলের গঠনে পার্থক্য তৈরি হয়।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের বিভিন্ন গবেষণায় ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি, দুই ধরনের চায়েরই স্বাস্থ্যগত উপকারিতা পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণাতেও গ্রিন টির উপকারিতা দেখা গেছে। তবে ব্ল্যাক টির ক্ষেত্রে হৃদরোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক আরও ধারাবাহিকভাবে পাওয়া গেছে।

তবে এ কারণে গ্রিন টি ছেড়ে ব্ল্যাক টি পান করার কিংবা ব্ল্যাক টি ছেড়ে গ্রিন টি বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ওয়েন। তার মতে, চিনি ছাড়া পান করলে দুই ধরনের চা-ই হৃদযন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

দিনে কত কাপ চা পান করা উচিত

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা সপ্তাহে অন্তত একবার চা পান করেন, তাদের দৈনিক চা পানের পরিমাণের সঙ্গেও রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা হয়েছে। এতে দেখা যায়, যারা দিনে প্রায় ছয় থেকে আট কাপ চা পান করেন, তাদের রক্তনালির রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল। তবে এই পরিমাণের চেয়ে বেশি চা পান করলে ঝুঁকি আবার বাড়তে শুরু করে।

কিন্তু এই ফলের অর্থ এই নয় যে সবার দিনে ছয় থেকে আট কাপ চা পান করা উচিত। ওয়েন এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, গবেষণায় কাপের নির্দিষ্ট কোনো মাপ নির্ধারণ করা হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া হিসাবের ওপর ভিত্তি করেই চা পানের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই দিনে ছয় থেকে আট কাপ চাকে চা পানের আদর্শ পরিমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

চা পানের পরিমাণ ঠিক করার ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। আট আউন্স বা প্রায় ২৪০ মিলিলিটার ব্ল্যাক টিতে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। গ্রিন টিতে এর পরিমাণ কিছুটা কম।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে গর্ভবতী নারীদের দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শিশুদের ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করা উচিত নয়।

চা পানের সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

চা পান করার সময় সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে এর তাপমাত্রার দিকে। ওয়েনের পরামর্শ, মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়ার মতো গরম চা পান করা উচিত নয়। কারণ, বারবার অতিরিক্ত গরম পানীয় পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসার বা ইসোফেজিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই চা তৈরি করার পর কিছুটা ঠান্ডা হতে দেওয়া ভালো। এমন তাপমাত্রায় চা পান করা উচিত, যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চুমুক দেওয়া যায় এবং মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে। এতে অতিরিক্ত গরম পানীয়ের ঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি চায়ের হৃদযন্ত্রের জন্য সম্ভাব্য উপকারিতাও পাওয়া যেতে পারে।

চিনি ছাড়া ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের চা বেছে নিতে পারেন। তবে যাদের ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ বা বুক ধড়ফড় করার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্যাফেইন গ্রহণের ব্যাপারে থাকা প্রয়োজন।

আর যারা একেবারেই চা পান করেন না, তাদের নতুন করে চা পান শুরু করার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ওয়েন। তার মতে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমেও হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর