ঢাকা, ২৩ মার্চ, ২০১৯ || ৯ চৈত্র ১৪২৫

পরীক্ষামূলক

LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
২১

নিমতলী থেকে চকবাজার ট্র্যাজেডি, এরপর…

প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

মোস্তফা হোসেইন

মোস্তফা হোসেইন


নিমতলী থেকে চকবাজার ট্র্যাজেডি– ধারাবাহিকতাই বলা যায়। ২০১০ সালে প্রাণহানীর পরও আমাদের শিক্ষা হয়নি। এই সময়ে আশ্বাসের তালিকাটাই শুধু স্ফীত হয়েছে। কবে শিক্ষা হবে আমাদের? গত দুই দশকে শুধু শিল্পকারখানাতে ২৬টি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণেই অধিকাংশ। এই তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও। এটা কি বিশ্বাস করা যায়? দুর্ঘটনাগুলোতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষ। হায়রে মানুষের জীবন! যে মরে, সে চলে যায়, আর আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা অপেক্ষা করি কখন কার জীবন যায়। প্রতিরোধের চেষ্টায় সাফল্য কতটা? জবাব পাওয়া গেলো ২১ ফেব্রুয়ারি শোকের রাতে-চকবাজারে ৭০ এর বেশি মানুষের প্রাণহানীর মাধ্যমে।
কেন এই মৃত্যুর মিছিল? দুই দশকের দুর্ঘটনাগুলোর দিকে তাকানো যাক– ১৯৯০ সালে ১৭ ডিসেম্বর সারেকা গার্মেন্টে মারা গেলো ২৭ জন, ১৯৯৫ সালে ইব্রাহিমপুরে লুসাকা অ্যাপারেলে মারা গেলো ১০ জন, ১৯৯৬ সালে ঢাকার তাহিদুল ফ্যাশনে ১৪ জন, একই বছর সানটেক্স লিমিটেড কারখানায় ১৪ জন, ১৯৯৭ সালে মিরপুরের রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলসে ২২ জন, ২০০০ সালে বনানীর গ্লোব নিটিংয়ে ১২ জন, ২০০১ সালে মিরপুরে মিকো সুয়েটারে ২৪ জন, ২০০৪ সালে মিসকো সুপারমার্কেট কমপ্লেক্সে ৯ জন, ২০১৬ সালে টঙ্গীতে ৩৫ জন মৃত্যু বরণ করেন। এই খণ্ড চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে– স্থানিক পরিবেশই অন্যতম কারণ এই মৃত্যুর জন্য। তখন থেকে জোরালো দাবি ওঠে- গার্মেন্টস কারখানাগুলো রাজধানী শহর থেকে দূরে সরানোর। গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড এবং দুর্ঘটনা রোধে অনেকটা কাজ হয়েছে, এমনটা বলা যায়। গত কয়েক বছরে গার্মেন্ট কারখানায় দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে গেছে, শুধু ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা থেকে এগুলো সরিয়ে নেওয়ার কারণে।

কিন্তু নিমতলী ট্র্যাজেডির পর থেকে জনদাবি ওঠে পুরনো ঢাকায় আর কোনও দাহ্য পদার্থের গুদাম কিংবা শোরুম থাকতে পারবে না। একইসঙ্গে বলা হতে থাকে– আবাসিক এলাকায় কোনোভাবেই শিল্পস্থাপনা নয়। এটা তো আইনেরও কথা। তারপরও যখন হচ্ছে এবং আগেরগুলোও বহাল তবিয়তে আছে, তখন বলতেই হবে কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

কোথাও শিল্পকারখানা করতে হলে, শুধু ট্রেড লাইসেন্সই যথেষ্ট নয়। পরিবেশ অধিদফতরসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স করতে গেলে আশপাশের বসতবাড়ির মালিকদেরও সম্মতি নিতে হয়। কেউ যদি সরল মনে এবং স্বাভাবিক পথে ট্রেড লাইসেন্স করতে যায়, তাহলে তাকে হাজারও ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। কিন্তু অবৈধ কারখানা এবং মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দ্রব্য বেচাকেনা এবং গুদামজাতকরণ সবই চলে পুরনো ঢাকার মতো ঘিঞ্জি পরিবেশে। আর সেটা চলে আসছে সব বাধা অতিক্রম করে এবং নির্বিঘ্নে।

পুরনো ঢাকায় রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসা বন্ধে ২০১৩ সাল থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল সিটি করপোরেশন। বন্ধ হয়নি ব্যবসা। সিটি করপোরেশনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লাইসেন্স ছাড়াই চলতে থাকে ব্যবসা। এখানেই থেমে থাকেনি তারা। ট্রেড লাইসন্স ছাড়া ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় না বলে ব্যবসায়ীরা চাপ দিতে থাকে সিটি করপোরেশনকে। সিটি করপোরেশন কাত হয়ে যায় আবার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এতটাই কাত হয়ে গেছে যে,চকবাজার দুর্ঘটনার মাত্র দুদিন আগে পরিদর্শন করতে গিয়ে পাঁচটি রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিক লাইসেন্স নবায়ন করে দেয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠান আছে কলকারখানা পরিদর্শনের জন্য। তারা চুপ, ঢাকা সিটি করপোরেশন আছে বাণিজ্য পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার জন্য, পরিবেশ অধিদফতর আছে, এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। তাদের কাজ পরিচালনা করার জন্য আছে আইনও। বাস্তবতা হচ্ছে- তাদের চোখের সামনেই অবৈধভাবে কিংবা বৈধভাবে ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠছে ঢাকার অলিতে গলিতে। কোনোভাবে যদি শোয়ার জায়গার অতিরিক্ত কোনও জায়গা থাকে তাহলে সেখানেই একটা কারখানা। এমনটাইতো পুরনো ঢাকার চিত্র!

রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামগুলোকে বাইরে থেকে চেনা কঠিন। কারণ কোনও গুদামেই সাইনবোর্ড নেই। শাটার বন্ধ রাখা ভবনের ভেতরে কী আছে বোঝার উপায় নেই। ভবন মালিকেরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন মোটা অংকের টাকা অগ্রিম পায় সঙ্গে মাসভিত্তিক ভাড়া। আর সেই লোভে তারা বিপজ্জনক কিনা সেই ভাবনার ধারে কাছেও যায় না।

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। যেখানে কিছু সুপারিশও ছিল। নিয়মমাফিক সুপারিশ বাস্তবায়নে টাস্কফোর্সও গঠিত হয়েছিল। সুপারিশমালা বিদ্যমান কারখানা আইন, পরিবেশ আইন, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, বিস্ফোরকদ্রব্য আইন, মাদকদ্রব্য আইনসহ আরও কিছু আইনের আলোকেই প্রণীত হয়েছিল। কমিটির পর উপকমিটি হয়েছে, পুরনো ঢাকা থেকে বিপজ্জনক কারখানা ও দোকানগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। গত নয় বছরে কয় কদম এগিয়েছে কাজ তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে কি? পুরনো ঢাকা থেকে এসব ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটা নীতিমালার কথা বলা হয়েছিল, দুঃখজনক হচ্ছে- এই পর্যন্ত তাও আলোর মুখ দেখেনি।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার আগুনে সত্তরের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। অন্যদিকে পুরনো ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে কারখানা স্থানান্তরের জন্য ৫০ একর জমি পেতেই সময় যায় চার বছর। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে এখনও জটিলতা রয়ে গেছে। টাকা বরাদ্দের জন্য একনেকের বৈঠকে উত্থাপন হয় নিমতলী ট্র্যাজেডির আট বছর পর। এবং গত বছর নভেম্বর মাসে ২০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একনেকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের নিমতলী ট্র্যাজেডির পর দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য হয়েছে। শুধু তাই নয় পুরান ঢাকার বাসা-বাড়ি থেকে রাসায়নিকদ্রব্যের গুদাম ও কারখানাগুলো নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য হাইকোর্টও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিছুই কাজ হয়নি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রী এবং হাইকোর্টের নির্দেশকেও অমান্য করার ক্ষমতা রাখেন কিভাবে?

স্পষ্টত বোঝা যায়, পুরনো ঢাকার এই দুর্ভোগের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের লোভ, জনসচেতনতাই প্রধান দায়ী।

প্রশ্ন হচ্ছে- শুধু রাসায়নিকদ্রব্য ব্যবসা কিংবা কুটির শিল্প পর্যায়ের কারখানাগুলো সরিয়ে নিলেই কি পুরনো ঢাকা নিরাপদ হবে?

পৃথিবীর দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে এই ঢাকার পুরনো এলাকায়- এমন জায়গাও আছে যেখানে ফায়ারব্রিগেডের গাড়ি কিংবা অ্যাম্বুলেন্স কেন- লাশের খাটিয়া বহন করে নিয়ে যাওয়ার মতো পথও নেই। আর চিলতে কয়েক ফুটের সেই পথের দুইপাশে আছে বহুতল ভবনের ছড়াছড়ি। রাসায়নিকদ্রব্যের দোকান কিংবা গুদাম সরিয়ে নেওয়ার পরও ওইসব এলাকার মানুষের নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য নতুন করে ভাবতে হবে। সময় এসেছে- পুরনো ঢাকার রাস্তাগুলো প্রসস্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের। ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সততা ও আন্তরিকতার বিষয়টির পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও দরকার। এই মুহূর্তে স্থানীয় মানুষের মধ্যে চকবাজার ট্র্যাজিডির আবেগ কাজ করছে। এই আবেগকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে সরকার। পুরনো ঢাকাকে ঘিঞ্জিমুক্ত করতে ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই। তা না হলে আমাদের আরও বড় কোনও দুর্ঘটনার খবর পেতে হবে। যে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারি আমি কিংবা আপনি। আর একটি মানুষকেও দুর্ঘটনায় হারাতে চাই না। সরকার ও আদালতের চেয়েও শক্তিশালী কোনও দুর্বৃত্তকেও আমরা চাই না। সেইজন্য সরকারকেই অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। সেই প্রত্যাশাতেই থাকছি।
--মোস্তফা হোসেইন :

(লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।)