ঢাকা, ২১ এপ্রিল রোববার, ২০১৯ || ৮ বৈশাখ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৮২

সড়ক সন্ত্রাস

ফের রাস্তায় শিক্ষার্থী নিহত, দায় কার?

রফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১৭:২২ ১৯ মার্চ ২০১৯  


আমি মনে করি মৃত্যুর দায় আমারই। কেন আমি রাস্তায় বের হলাম? সরকার কি আমাকে রাস্তায় বের হতে বলেছে? বলে নি, তবে কেন বের হলাম!

সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালাতে চালকের লাইসেন্স আছে। কোনো মন্ত্রী কিংবা এমপি' ব্যাক-আপ নিয়ে রাস্তায় মাস্তানী করে তারা। পুলিশকে নিয়মিত মাসোয়ারা দেয়। কিন্তু আমি ! কিছুই দেই না !

এমন এক অনিশ্চিত জীবন নিয়ে সড়কে নিয়মিত চলাচল আমাদের। বাসা থেকে বের হলে সুস্থভাবে ফিরবো কিনা, নিশ্চয়তা নেই। কে দেবে এই নিশ্চয়তা?

প্রতিদিনের মতো সকালের ক্লাস ধরতে ভার্সিটি যেতে চেয়েছিলো আবরার। কিন্তু রাস্তা পার হওয়ার সময় ঘাতক সু-প্রভাত বাসটি দেহের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়া হলো।

আবারো সেই অসাধু প্রতিযোগিতা, কে কার আগে যাবে! পিচ ঢালা সড়ক মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে গেলো। চার দিক থেকে মানুষ ছুটে এলো। কিন্তু ফল দাঁড়ালো - আবরার এই অনিশ্চিত জীবন থেকে বিদায় নিলো। জানিয়ে দিলো এই সড়ক নিরাপদ নয়আজ আমি, কাল আপনি পরদিন আরো একজন ! প্রতিদিনই ঝরছে তাজা প্রাণ।

একটি আবাসিক এলাকা, বড় শপিং মল, দুই-তিনটা ভার্সিটি থাকায় নর্দ্দা বসুন্ধরা এলাকা খুবই জনবহুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু রাস্তা পারাপারে দরকারি ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই। মানুষ নিজ দায়িত্বেই চলমান গাড়ির মধ্য দিয়ে রাস্তা পার হন। নর্দ্দা থেকে কুড়িল পথে যেতে একজন ট্রাফিক পুলিশ কেবল মামলা দিতে ওৎ পেঁতে বসে থাকেন। সুযোগ পেলেই মামলা ধরিয়ে দেন। কিন্তু রাস্তায় অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন না। রাস্তার দু-পাশে বসানো হয় ছোট ছোট দোকান। দোকানদাররা জানান, টাকা দিলে বসতে দেয়া হয়, আর না দিলে বসার সুযোগ হয় না।

আবরার যেখানে লাশ হলো সেই রাস্তা দিয়েই অফিস থেকে বাসায় ফিরি প্রতিদিন। আজও সকালে সেখানে গিয়েছিলাম শিক্ষার্থীদের আন্দালোন চলছে শুনে। বসুন্ধরা গেটের ঠিক উল্টোপাশেই রাস্তা পার হতে গিয়ে লাশ হলো আবরার। রাস্তাটি রক্তে লাল হয়ে গেছে। তার বন্ধু, সহপাঠী বা বড় ভাইয়েরা জয়গাটি ঘিরে বসে স্লোগান দিচ্ছে ‌'উই ওয়ান্ট জাস্টিস' কিন্তু জাস্টিস কিভাবে হবে? আবরাব ফিরবে? হয়তো কিছু টাকা দিয়ে সামাধান হবে! লাশের বদলে টাকা দিয়ে সান্তনা এর চেয়ে অমানবিক কাজ হয়তো নেই।

একটি সন্তান, সে ছিলো, বড় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, কত স্বপ্ন বাবা-মায়ের! কিন্তু নিমেষেই শেষ হলো সেটা। আর আমরা কিনা টাকা দিয়ে সান্তনা দিব!  ছি! ছি!

অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম এই রাস্তাজুড়ে। কেউ দেখার নেই।

গতকালের কথাই বলি, রাত সাড়ে নয়টা। নর্দ্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে তীব্র যানজট। একটি গাড়িও নড়ছে না। কিন্তু বসুন্ধরা গেট পার হলেই রাস্তা ফাঁকা। আধা কিলোমিটারে কম দুরত্বের রাস্তা পার হতে সময় লাগলো অন্তত আধা-ঘন্টা। সামনের রাস্তা ফাঁকা দেখার পরও এত্ত জানযটের কারণ অনুসন্ধান করলাম।

এক. পুলিশের পোশাক পরা এক ভদ্রলোক মাথায় ক্যাপ পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হয়তো গাড়ি গণনা করছিলেন! ফ্যাল ফ্যাল চোখে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি। হাতে একটা মেশিন। দাঁড়িয়ে আছেন। মোটর সাইকেল কিংবা বাসের কাগজ যাচাই করছিলেন রাস্তার ওপরই। রাস্তার ওপরই গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখায় অন্য গাড়ি যেতেও পারছিলো না।

দুই. যাত্রী তুলতে নামাতে বাস স্টপেজ নিদিষ্ট করা আছে। বাস স্টপেজ শুরু শেষ নির্দেশনাও দেয়া আছে। কিন্তু বাস চালকরা হয়তো এসব বুঝে না, অথবা পাত্তাই দেয় না। মাঝ রাস্তা থেকে গাড়ি এমনভাবে বাঁকা করে রাখে, যেন অন্য কোনো গাড়ি যেতে না পারে। বেশি যাত্রী পাবার আশায় অন্য বাসটিকে আটকিয়ে রাখে। আর পেছনে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।

তিন. স্টপেজ নির্দেশিত সীমানার বাইরে পড়েছে যমুনা ফিউচার পার্কের পথচারী পারাপারের পথ। ফিউচার পার্ক থেকে বেরিয়ে স্টপেজ নির্দেশিত সীমানায় যায় না মানুষ। তড়িঘড়ি রাস্তা পার হয়েই গাড়ির জন্য অপেক্ষা। আর বাস চালকরাও সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যদিও ট্রাফিক পুলিশ পাশেই দাঁড়ানো, কিন্তু কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি।

চার. যানজট কমাতে বসুন্ধরা গেটের সামনের খোলা অংশ বন্ধ করা হয়েছে। গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে কুড়িলের দিকে যেতে কোকাকোলা পর্যন্ত ঘুরতে হয়। কিন্তু জনগণের রাস্তা পার হতে কোনো ট্রাফিক নেই। জনগণই নিজ দায়িত্বে দ্রুত চলমান গাড়ির সামনে দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হয়। ছাড়া জনগণের কিছু করার আছে কী? জেব্রা ক্রসিং আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই। ব্যবহারের সুযোগও নেই। রাস্তায় গাড়ি চলছে যথেচ্ছতাই, আর অসাধু পুলিশের স্বেচ্ছাচারিতা আছেই।