ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার, ২০২০ || ৭ আশ্বিন ১৪২৭
good-food
৮৩

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১০:০২ ১৫ আগস্ট ২০২০  

ড. মসিউর রহমান : ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত আমি বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর এত কাছে আসা যেকোনো বাঙালির জন্য বিশেষ সৌভাগ্যের। আমার চাকরির বয়স তখন প্রায় সাত বছর, যার অর্ধেক বা তার বেশি সময় কেটেছে শিক্ষানবিশ এবং আন্তঃপ্রদেশ বদলি কর্মসূচিতে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কোনো সুনাম অর্জন করিনি; সুনাম অর্জনের জন্য এটা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়। আর আমি চাকরি করেছি এমন সব জায়গায়, যেখানে কেউ যেতে চায় না। সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ নেই, যারা আমার হয়ে কথা বলবেন।

আমাকে একান্ত সচিব হিসেবে বাছাই করার পেছনে কোনো স্কষ্ট রাজনৈতিক বিবেচনা খুঁজে পাই না। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্কর্ক থাকলেও তা ছিল নীরব সমর্থন। সলিমুল্লাহ হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনয়নের সময় আপত্তি করি ও সরে দাঁড়াই। আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে দু-একজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। আমি স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় থেকে বাগেরহাটের শেখ আব্দুল আজিজ সাহেবের সঙ্গে পরিচয় ছিল। শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে পরিচয় ছিল—ঘনিষ্ঠতাও ছিল। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, শেখ মণি আমাকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য পরামর্শ দেয়, আমি নিষ্ক্রিয় থাকি।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পরিচয় সবারই জানা, তার ব্যক্তিগত আচরণ এবং পরিবারের আচরণ সম্কর্কে আমার জানার যতটা সুযোগ হয়েছিল, খুব কম সরকারি কর্মচারীর সে সুযোগ হয়। মূলত ব্যক্তি মুজিব ও তার পরিবার সম্কর্কে আমি কিছু বলব। অবশ্য বঙ্গবন্ধু সম্কর্কে কিছু বলতে গেলে আবশ্যিকভাবে রাজনীতির কথা চলে আসে।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর আমার সহকর্মী মাহে আলম আমাকে জানায় যে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে অন্যদের সঙ্গে আমাকেও বিবেচনা করা হচ্ছে। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয় এবং তার পরামর্শে প্রধানমন্ত্রীর সচিব ও আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী রফিকুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করি। তার সঙ্গে কাজ করার সময় দেখেছি, তিনি সব সময় বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করতেন অথবা জ্যেষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে পরামর্শ দিতেন; কখনো নির্দেশ-আদেশের সুর তার কণ্ঠে ছিল না। তার সঙ্গে যখন দেখা করি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়দায়িত্ব, কার্যপ্রণালি এবং একান্ত সচিবের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্কর্কে তিনি আমাকে সাধারণভাবে অবহিত করেন। সে যাত্রা এখানেই শেষ।

একদিন জানলাম আমাকে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলির সিদ্ধান্ত হয়েছে, দুই-একদিনের মধ্যে সরকারি আদেশও পেলাম। পটুয়াখালীর আওয়ামী লীগ নেতারা আমার নাম সুপারিশ করেছেন। মুজিবুর রহমান তালুকদার তখন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা। আমার যোগ্যতার জন্য আমাকে সুপারিশ করেছেন মনে হয় না, একমাত্র আমার নামই হয়তো তারা জানতেন। সবেধন নীলমণি!

বাবার চাকরির সুবাদে পটুয়াখালীতে আমার শৈশব কেটেছে। সেখানে আমার আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব অসংখ্য। সংস্থাপন বিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দ হোসেনকে আমি আমার অসুবিধার কথা জানাই (একসময় আমরা খাদ্য বিভাগে সহকর্মী ছিলাম)। জনাব হোসেন প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি আমাকে বঙ্গবন্ধুর সামনে হাজির করবেন, কিন্তু আমার কথা আমাকেই বলতে হবে। কিছুটা সংশয় ও ভীতি নিয়ে সৈয়দ হোসেনের সঙ্গে পুরনো গণভবনে (এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ একাডেমি) হাজির হই। বঙ্গবন্ধুকে আমি আমার ‘বিব্রতকর অবস্থা’ জানালাম। বঙ্গবন্ধুর উত্তর সহজ-সরল: ‘তুমি আইন মেনে কাজ করবে, আত্মীয়-অনাত্মীয়তে কিছু আসে যায় না।’ সেখানেই কথা শেষ।

পরে আমার বদলি আদেশটি বাতিল হয়। খুব সম্ভব বাণিজ্যমন্ত্রী কামরুজ্জামানের এতে হাত ছিল। তখন আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে নিযুক্ত। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্কর্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্কর্ক আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ডব্লিউটিও তখন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গ্যাট-এর নিয়মকানুন মেনে বিশ্ব বাণিজ্য চলছিল। কেনেডি রাউন্ডের কথা চলছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের (তখন রাজশাহী জেলার মহকুমা) মহকুমা প্রশাসক থাকার সময় হেনা সাহেব (এই নামেই তিনি অধিক পরিচিত) আমাকে ছিটেফোঁটা জানতেন। তার নিরপেক্ষ বিবেচনার কারণেই হয়তো আমার পক্ষে কিছু বলে থাকবেন।

বেশ কয়েক মাস পর দ্বিতীয় দফায় আবার প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ডাক পড়ল। প্রধানমন্ত্রীর সচিব রফিকুল্লাহ চৌধুরী জানান, বঙ্গবন্ধু আমার সঙ্গে কথা বলবেন। সচিবালয়ে দিনে সময় হয়নি, তিনি সন্ধ্যায় আবার গণভবনে যেতে বললেন। বর্তমান ফরেন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট তখন গণভবনে। সন্ধ্যায় বেশি সময় দেরি করতে হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সামনে আমাকে হাজির করে দিয়ে অন্যরা চলে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর কথা স্কষ্ট: ‘তোমাকে আমি আমার সাথে কাজ করবার জন্য নিতে চাই, তোমার তাতে মত আছে? এখানে কাজের চাপ বেশি, আর সহ্যক্ষমতা লাগবে—গণ্ডারের চামড়া হতে হবে।’ আঞ্চলিক বা সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহারে বঙ্গবন্ধুর দ্বিধা ছিল না।

‘তোমার দ্বিমত আছে’—তার এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। বাংলাদেশে এমন কেউ ছিল না যে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসার এবং তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করত না। আমি কোনো রকম থতমতভাবে বললাম: ‘আপনার সঙ্গে কাজ করা আমার সৌভাগ্য, আমার ওপর আপনার আস্থা থাকলে আমি অবশ্যই আপনার সঙ্গে থাকব।’ বঙ্গবন্ধুর উত্তর স্নেহসিক্ত: ‘না জেনেশুনে কি আমি তোমাকে পছন্দ করেছি?’ এই হলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার কাজের শুরু।

তার সঙ্গে যে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি, কখনো মনে হয়নি আমি একজন কনিষ্ঠ কর্মচারী এবং তিনি সরকারপ্রধান ও দেশের অবিসংবাদী নেতা। সম্কর্ক অনেকটা পিতা-পুত্রের মতো শ্রদ্ধা ও স্নেহভরা।

সকাল থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত, কখনো আরো বেশি সময় বঙ্গবন্ধু অফিসে ব্যস্ত থাকতেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং অনেক সময় করপোরেশন প্রধানগণ তার কাছে আসতেন। রাজনৈতিক নেতারাও আসতেন। বিকালবেলা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেখা করার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। আমাদের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল নথি থাকলে তাত্ক্ষণিকভাবে দেখানোর সুযোগ পেতাম না। খুব বেশি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ হলে দুপুরে খাবার বা বিশ্রামের সময় তার কাছে আবার যেতাম।

খাবার সময় গেলে মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রশ্ন: ‘তুমি খেয়েছ?’ আমরা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। সফলতার ভাগ কম। তিনি কিছু সময় মুখের দিক তাকিয়ে বলতেন, ‘তোমার মুখ শুকনো দেখা যাচ্ছে, খাও, পরে কাজ।’ নিজ হাতে প্লেট এগিয়ে দিয়ে ভাত-মাছ উঠিয়ে দিতেন। কই মাছ ও মাছের মাথা নিত্যদিনের মেনু। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সামনে কই মাছ খাওয়া দুষ্কর। পরিবেশ সহজ করার জন্য তিনি হয়তো বলতেন: ‘তোমরা মাছ খাওয়া শেখোনি, দেখো এভাবে খেতে হয়।’ কই মাছের কাঁটা সরিয়ে বা মাছের মাথা হাত দিয়ে ভেঙে কীভাবে মুখে পুরতে হয় দেখিয়ে দিতেন। খাওয়া শেষ হলে নথির বিষয়বস্তু পড়ে শোনাতাম, তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে লিখে নিয়ে যেতে বলতেন। জটিল বিষয় হলে প্রাসঙ্গিক অংশ পড়ে দেখতেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্রুত তার নজরে আসত। প্রয়োজন হলে মন্ত্রী বা সচিবের সঙ্গে তখনই আলাপ করে নিতেন বা পরে তাদের আসতে অনুরোধ জানানো হতো।

যারা বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বয়সে বড় এবং যাদের সঙ্গে তার আগে পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্কর্ক ছিল, তাদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধা ও সৌজন্যবোধ ছিল স্বভাবজাত। জহুরুল হকের কথা মনে পড়ে। তিনি পাকিস্তানে তথ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরি করতেন, যুদ্ধের সময় হাজতবাসে ছিলেন। কিছু জার্মান কবিতা বা ছোটগল্প অনুবাদ করেছিলেন। জহুরুল হক স্বাধীন বাংলাদেশে তথ্য মন্ত্রণালয়ে যোগদান করলে (খুব সম্ভব সচিব পদে) পত্রপত্রিকায় সমালোচনা হয়। বঙ্গবন্ধু তাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব হিসেবে কাছে নিয়ে আসেন। জহুরুল হক সবার কাছে পরিচিত ছিলেন না, পারিবারিক সম্কর্কের জন্য আমি তাকে জানতাম। কিছুটা উদাসীন ও বৈষয়িক বিষয়ে আকর্ষণহীন বলে মনে হতো।

বঙ্গবন্ধু তাকে ‘জহুর ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। আমার যতদূর মনে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কামরায় জহুরুল হক সাহেব গেলে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা করতেন ও বসতে বলতেন। জনাব হকের প্রতি তার এই সশ্রদ্ধ আচরণ আমাদের মনে কিছু বিস্ময় সৃষ্টি করে। আমার ধারণা, বঙ্গবন্ধু আমার সহকর্মী সামাদ ও আমার কৌতূহল বুঝতে পারেন। (ড. এসএ সামাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব এবং পরে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান ছিলেন)। একদিন তিনি বললেন, ‘তোমরা জানো জহুর ভাই কে?’ বয়স্ক সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া তার অন্য পরিচয় আমাদের জানা ছিল না। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘জহুর ভাই বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর (১৯৪৭ সালের আগে) ইংরেজি বক্তৃতা লিখতেন। শহীদ সাহেব খুব কম লোকের ইংরেজি লেখা কাটাছেঁড়া না করে গ্রহণ করতেন না। জহুর ভাইয়ের লেখায় তিনি হাত ছোঁয়াতেন না।’
ড. মসিউর রহমান: প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা