ঢাকা, ২৬ জানুয়ারি সোমবার, ২০২৬ || ১২ মাঘ ১৪৩২
good-food

বাংলাদেশসহ দেশে দেশে যেভাবে ভোটাধিকার পান নারী

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:২১ ২৫ জানুয়ারি ২০২৬  

প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় নারীর তেমন ভূমিকা ছিল না। সেসময় সমাজ ব্যবস্থা ছিল পুরুষতান্ত্রিক। সেখানে ভোট দেওয়া-নেওয়ার ক্ষমতা ছিল পুরুষের। নারীকে গৃহস্থালি কাজে বাধ্য করা হতো। দাবি করা হতো, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে হস্তক্ষেপের যোগ্যতা তাদের নেই। এই লিঙ্গবৈষম্যের ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

আঠারো ও উনিশ শতকে শিক্ষা ও শিল্পের প্রসারে নারীর চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসে। তারা বুঝতে পারেন, শুধু গৃহিণী নন বরং রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য নাগরিক। কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ায় অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন নারীরা। এসময়েই ধারণা জন্মায় যে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজ পূর্ণতা পেতে পারে না। গৃহকোণ ছেড়ে নাগরিক পরিচিতি পাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাধিকার আদায়ে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। নারীরা সভা, মিছিল, পিটিশন এবং এমনকি অনশনের মতো কঠোর পথ বেছে নেন। বহু জায়গায় এই আন্দোলন দমনের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ প্রচণ্ড নিপীড়ন চালায়। কিন্তু ‘একজন নাগরিক, এক ভোট’ এই জোরালো দাবির কাছে শেষ পর্যন্ত প্রাচীন প্রথা হার মানে। বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধগুলোর সময় নারীরা যখন কলকারখানা ও সেবার কাজে পুরুষের সমান ভূমিকা রাখলেন, তখন তাদের রাজনৈতিক অধিকারের দাবি আরও জোরালো হয়।

১৮৯৩ সালে নারীর ভোটাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড প্রথম পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরপর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে ধাপে ধাপে নারীরা তাদের অধিকার ফিরে পান। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও এই জোয়ার ছড়িয়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো তাদের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান ভোটাধিকারের স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠার পথে বিশাল মাইলফলক।

দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ভোটাধিকারের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে সীমিত আকারে নারীদের ভোটের সুযোগ থাকলেও ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে এর পরিধি আরও বাড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এই অধিকারকে পূর্ণতা দেয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে কোনো বৈষম্য ছাড়াই নারী ও পুরুষের সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশের নারীরা কেবল ভোটার নন, বরং তারা সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ পদেও আসীন হচ্ছেন।

আইনগতভাবে সমান অধিকার পেলেও সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা আজও পুরোপুরি দূর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজের চাপে নারীরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এছাড়া ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, ভয়ভীতি এবং সহিংসতার ভয়ে অনেক নারী ভোটকেন্দ্রে যেতে দ্বিধাবোধ করেন। আধুনিক যুগে ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে নারী ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশলও দেখা যাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, নারী ভোটারদের উপস্থিতি ক্রমাগত বাড়ছে, যদিও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি অংশগ্রহণ এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

নারীর ভোটাধিকার কোনো দয়াদাক্ষিণ্য নয়, বরং এটি শত বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল। ভোট কেবল ব্যালট পেপারে একটি সিল দেওয়া নয়, বরং এটি নিজের মর্যাদা ও কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যম। ইতিহাস শিখিয়েছে যে, সমাজে নারীর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন কখনও টেকসই হয় না।