ঢাকা, ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
good-food

বিশ্বজুড়ে কমছে জন্মহার, কতটা দায়ী স্মার্টফোন ও লাইফস্টাইল?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:৫০ ১৫ জুলাই ২০২৬  

বিশ্বের স্বাভাবিক প্রজননের হার হলো ২.১ (Replacement-level fertility rate)। অর্থাৎ, একজন মহিলার তাঁর জীবদ্দশায় গড়ে ২.১টি সন্তান জন্ম দেওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্বের ৫৫ শতাংশেরও বেশি দেশে এই জন্মহার ২.১-এর নীচে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন থেকে শুরু করে ইতালি, স্পেন, জার্মানি, গ্রিস ও পর্তুগাল, কানাডা ও আমেরিকার মতো দেশে জন্মহার কমেছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এই জন্মহার কমে যাওয়ার পিছনে ঠিক কোন কারণ দায়ী, জানেন?

আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ বলছে, অনেক বছর ধরে সেখানকার জন্মহার ঠিক ছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে হঠাৎই কমতে শুরু করে জন্মের হার। ঘটনাচক্রে, ওই বছরই প্রথম iPhone লঞ্চ করেছিল Apple। গবেষকরা মনে করছেন, স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তারের জেরেই কমছে বিভিন্ন দেশে জন্মহার।

২০০৭-২০২৫ সালের মধ্যে আমেরিকায় জন্মহার কমেছে ৩৩% থেকে ৫২%-এ। সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা গিয়েছে ১৫-২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে। অর্থাৎ, সেখানকার টিনএজ প্রেগন্যান্সির সংখ্যা কমেছে। ওই গবেষণার দুই গবেষক Caitlin K. Myers ও Ezekiel Hooper জানিয়েছেন, এই জন্মহার কমার পিছনে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে স্মার্টফোন, বিশেষত আইফোনের।

আইফোন যখন বাজারে এসেছিল, তখন তা সহজলভ্য ছিল না। আমেরিকার যে সব জায়গায় এটিঅ্যান্ডটি (AT&T) নেটওয়ার্ক ছিল, সেখানেই শুধু ব্যবহার করা যেত আইফোন। সুতরাং, আইফোন আমেরিকার সব জায়গায় ব্যবহার করা যেত না। গবেষণা বলছে, যে সব জায়গার মানুষ আইফোন ব্যবহার করতে পারতেন, সেই সেই জায়গার জন্মহার তুলনামূলক ভাবে দ্রুত কমেছে। সেখানেই গবেষকদের ধারণা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বাজারে আইফোন আসার পরে মানুষের লাইফস্টাইলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক আচরণেও বদল এসেছে। সেই বদল প্রভাব ফেলছে জন্মহারের উপর।

আইভিএফ এক্সপার্ট এবং গাইনোকোলজিস্ট সুজয় দাশগুপ্ত ‘এই সময় অনলাইন’কে বলেন, ‘স্মার্টফোন ব্যবহারের জেরে মানুষ সোশ্যাল আইসোলেশনে ভুগছে। দু’জন মানুষ পাশাপাশি বসে থাকলেও হাত মোবাইল থাকছে।’ যতই ডেটিং অ্যাপে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হোক, সশরীরে আড্ডা দেওয়ার প্রবণতা কমে গিয়েছে। তা ছাড়া স্মার্টফোনের ব্যবহার অত্যধিক মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। এর জেরে বহু মানুষের মধ্যে শারীরিক মিলনে অনীহা তৈরি হয় বলে দাবি ডাঃ দাশগুপ্তর।

স্মার্টফোনের ব্যবহার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুখোমুখি বসে আড্ডা দেওয়া বা সামাজিক মেলামেশাতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। গবেষকদের ধারণা, নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হওয়া, সম্পর্ক গড়ে তোলা, বিয়ে-পরিবার শুরুর সিদ্ধান্ত— সব ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন ধরা পড়ছে। গবেষকদের সঙ্গে সহমত পোষণ করে ডাঃ দাশগুপ্ত বলেন, ‘আজকাল বেশিরভাগ মানুষ মোবাইলে পর্নগ্রাফি দেখতে পছন্দ করেন। অথচ বাস্তবে মিলনের ইচ্ছে প্রকাশ করেন না।’

স্মার্টফোনের ব্যবহার মানুষের প্রজনন ক্ষমতা সরাসরি কমিয়ে দেয় না। কিন্তু পরোক্ষ ভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করে। তবে, আরও একটি বিষয় রয়েছে, যা হাইলাইট করেছেন আইভিএফ এক্সপার্ট। চিকিৎসকের কথায়, ‘স্মার্টফোন কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কমিয়ে দেয়। যদি কেউ প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখে, তখন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের জেরে পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়। এটা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা থাকলেও কোনও জোরালো প্রমাণ নেই।’

একই ভাবে, মোবাইল পরোক্ষ ভাবে বার্থ কন্ট্রোলের কাজ করে, তারও জোরালো প্রমাণ নেই। তবে সামাজিক বিষয়গুলো একেবারেই হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে টিনএজ প্রেগন্যান্সির সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করেছে। আসলে জন্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সেফ সেক্স নিয়ে প্রচুর তথ্য এখন ইন্টারনেটে উপলব্ধ। তা ছাড়া উন্নত দেশগুলোয় মানুষের জীবনযাপন যে গতিতে বদলাচ্ছে, তাতে সন্তান জন্ম দেওয়ার ধারণাতেও বেশ বদল এসেছে।

নতুন প্রজন্মের একাংশ ‘DINK’ (Double income no kids) মানসিকতা নিয়ে চলছে। জেন জ়িদের চাকরি নিয়ে নিশ্চয়তা নেই। ভবিষ্যতের প্ল্যান পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায়। সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। উপরন্ত জীবনযাপনের খরচও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার এবং তাকে মানুষ করার চিন্তাভাবনা রাখছেন না অনেকে। আজকাল বেশিরভাগ তরুণ-তরুণ ৩০-এর শেষে গিয়ে বিয়ে করেন। তা ছাড়া তাঁদের ফোকাস থাকে কেরিয়ারের উপর।

ইতিমধ্যে যে পরিমাণ মানসিক চাপ রয়েছে, তার পাশাপাশি আর সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা মাথায় আনতে চান না তাঁরা। আর ঠিক এই কারণেই দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার কমে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ভারতেও কমেছে জন্মহার।

বর্তমানে আমাদের দেশের জন্মহার ১.৯। প্রতি ১ হাজার জনসংখ্যায় ১৬-১৭টি শিশু জন্ম নেয়। দেশের শহরাঞ্চলেই জন্মহার সবচেয়ে কম। এর পিছনেও কিছুটা দায়ী স্মার্টফোন। একটি গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে যে, ২০১৬ সালে 4G এবং স্মার্টফোনের দ্রুত বিস্তারের পরে জন্মহার কমেছে। তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর