ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ১ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food

ভোটের সেই অমোচনীয় কালির রহস্য

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৩৯ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়ে আমরা সবাই প্রথম যে কাজটি করি তা হলো নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকানো। সেখানে লেগে থাকে ছোট্ট একটি গাঢ় নীল বা কালো রঙের দাগ। বাইরে থেকে দেখলে এটি খুব সাধারণ একটি রেখা মনে হতে পারে। কিন্তু এই রেখাটি আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রমাণ। এটিই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব পালনের এক বিশেষ চিহ্ন। 

যারা ভোট দিয়েছেন তারা সবাই জানেন যে এই দাগটি একবার লেগে গেলে তা সহজে উঠতে চায় না। অনেক সময় সাবান দিয়ে ঘষে কিংবা ডিটারজেন্ট ব্যবহার করেও এই কালি তোলা সম্ভব হয় না।  অনেকেরই কৌতূহল থাকে, কী এমন থাকে এতে, আর কেনই বা নির্বাচনে এই বিশেষ কালি ব্যবহার করা হয়? এই ছোট্ট কালির দাগের পেছনে আসলে বিজ্ঞান আর কৌশলের এক দারুণ মিশ্রণ লুকিয়ে আছে।

কেন এই কালির প্রয়োজন?

গণতান্ত্রিক একটি দেশে স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সুন্দর নির্বাচন মানেই হলো প্রতিটি মানুষের একটিই ভোট থাকবে। কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে ভিড়ের মাঝে কে একবার ভোট দিয়েছেন আর কে দেননি তা চট করে বোঝা সহজ নয়। কেউ যেন নিজের ভোট দেওয়ার পর আবারও লাইনে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বার ভোট দিতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য একটি দৃশ্যমান চিহ্নের প্রয়োজন হয়। এই কাজটির জন্য অমোচনীয় কালি বা ইনডেলিবল ইঙ্ক হলো সবচেয়ে সাশ্রয়ী দ্রুত এবং কার্যকর পদ্ধতি। ভোটার তালিকায় নাম মিলিয়ে ভোট দেওয়ার পর আঙুলে এই কালি লাগিয়ে দেওয়া হয় যাতে ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তারা সহজেই বুঝতে পারেন যে এই ব্যক্তিটি ইতিমধ্যেই তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

এই কালির ভেতরে আসলে কী থাকে?

ভোটের কালির এই স্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ যার নাম সিলভার নাইট্রেট। এই পদার্থটিই হলো অমোচনীয় কালির আসল প্রাণ। যখন এই কালি আমাদের আঙুলে লাগানো হয় তখন এটি কেবল চামড়ার ওপরে বসে থাকে না বরং এটি আমাদের চামড়ার ওপরের স্তরে থাকা কেরাটিন নামক প্রোটিনের সাথে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। এই বিক্রিয়ার ফলে কালিটি চামড়ার একদম গভীরে মিশে যায়। আরও মজার বিষয় হলো এই কালি লাগানোর পর যখন এটি বাতাসের অক্সিজেন এবং সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসে তখন এর রঙ আরও গাঢ় হয়ে যায়। আলোর উপস্থিতিতে সিলভার নাইট্রেট দ্রুত রূপালী থেকে কালচে বা গাঢ় বাদামী রঙ ধারণ করে যা কোনোভাবেই পানি বা তরল দিয়ে ধুয়ে ফেলা সম্ভব নয়।

সাবান দিয়েও কেন ওঠে না?

অনেকেই ভোট দিয়ে এসে বাড়িতে ফিরে সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে হাত ধুয়ে কালি পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার লেবুর রস বা নানা ধরণের তেল ব্যবহার করে দেখেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো সাধারণ কোনো সাবান বা ক্লিনার এই কালির ওপর কাজ করে না। এর কারণ হলো সাধারণ কালি বা রঙ কেবল ত্বকের ওপরের স্তরে বসে থাকে কিন্তু ভোটের কালি ত্বকের মৃত কোষগুলোর স্তরে গভীরে প্রবেশ করে যায়।

যেহেতু এটি ত্বকের কোষের সাথে রাসায়নিকভাবে আটকে থাকে, তাই পানি বা সাবান ঘষলে কেবল উপরের আলগা কালিটুকু ধুয়ে যায় কিন্তু আসল দাগটি থেকে যায়। যতক্ষণ না আপনার ত্বকের সেই নির্দিষ্ট কোষগুলো প্রাকৃতিক নিয়মে ঝরে যাচ্ছে, ততক্ষণ এই দাগ পুরোপুরি মোছা সম্ভব নয়। আমাদের শরীরের চামড়া নিয়মিতভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করে এবং পুরনো কোষগুলো ঝরে গিয়ে নতুন কোষ তৈরি হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কালির সেই রেখাটি বিদায় নেয় না।

এই দাগ কতদিন স্থায়ী হয়?

ভোটের কালির দাগ সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত বেশ স্পষ্ট থাকে। তবে ব্যক্তির চামড়ার ধরন এবং তার শারীরিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে এই সময় কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে এই দাগ দুই সপ্তাহ পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে। এখন প্রশ্ন হতে পারে তবে কি এই দাগ সারাজীবন থেকে যায়? না মোটেও তেমনটি নয়। আমাদের শরীরের চামড়া নিয়মিতভাবে পুরনো কোষ ঝরিয়ে নতুন কোষ তৈরি করে। একে বলা হয় প্রাকৃতিক কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া। যখন আমাদের আঙুলের সেই কালিময় পুরনো কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবে ঝরে পড়ে তখনই কেবল এই দাগটি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে মিলিয়ে যায়। অর্থাৎ এই কালিটি মোছার জন্য কোনো কৃত্রিম উপায়ের প্রয়োজন নেই বরং সময়ের সাথে সাথে আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক নিয়মেই এটি পরিষ্কার হয়ে যায়।

সতর্কতা

অনেকেই ভোটের পর এই দাগ দ্রুত তোলার জন্য নেলপলিশ রিমুভার বা শক্তিশালী এসিড ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এমনটি করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ তীব্র রাসায়নিকের প্রভাবে আপনার আঙুলের চামড়া পুড়ে যেতে পারে কিংবা চামড়ায় অ্যালার্জি বা ইনফেকশন হতে পারে। যেহেতু এটি কোনো ক্ষতিকর পদার্থ নয় তাই স্বাভাবিকভাবে দাগটি মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। এটি শরীরের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে না তাই অযথা দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।