ঢাকা, ১৭ আগস্ট সোমবার, ২০২৬ || ১ ভাদ্র ১৪৩৩
good-food
১১

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৮:৫৯ ১৬ আগস্ট ২০২৬  

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভারতের আদালতে উপস্থাপন করতে হবে এবং এ বিষয়ে দেশটির আদলতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। হাসিনাকে ফেরত দিতে তারেক রহমানের সরকার আবারও অনুরোধ জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা এ কথা বলেছেন। তবে বাংলাদেশ যাতে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে, সেজন্য ঢাকার সঙ্গে এ বিষয়ে নয়াদিল্লির নিবিড় আলোচনা চলছে বলেও উল্লেখ করেছেন তারা। 

রবিবার (১৬ আগস্ট) প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, “প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আমাদের আদালতই নেবে। এটি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। আদালতের প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করতে হবে যে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।”

আরেক কর্মকর্তা বলেন, “হাসিনা নিজেই জানিয়েছেন চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি পরিষ্কার করেন তিনি।”

ঢাকায় ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে তীব্র আন্দোলনের মুখে ভারতে পালিয়ে আসেন হাসিনা। এরপর দুই বছর ধরে নয়াদিল্লির একটি অজ্ঞাত স্থানে আশ্রয় ও নিরাপত্তায় রয়েছেন। গত ৫ আগস্ট ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে ভারতীয় এই কর্মকর্তা বলেন, “হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগ থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।”

এর আগে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুরোধ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) এক মুখপাত্র বলেছিলেন, “আমরা আমাদের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখছি এবং যখনই জানানোর মতো কোনো অগ্রগতি থাকবে, আমি আপনাদের জানাব।”

এমইএ’র কর্মকর্তারা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় সব আইনি নথি সংযুক্ত করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যরা বলেন, “অনানুষ্ঠানিক আশ্রয়ে থাকা হাসিনা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলছেন তিনি।” ৭৮ বছর বয়সী এই নেতা বছরের শেষ দিকে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলেও জানান তারা।

স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এই রায়ের ওপর ভিত্তি করেই তার প্রত্যর্পণের জন্য দিল্লিকে চাপ দিচ্ছে ঢাকা।

আওয়ামী লীগের সদস্যরা বলছেন, ভারতে কোনো আদালতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওই রায়কে বিভিন্ন ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করা হবে। এর মধ্যে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- রায়টি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দেওয়া হয়েছে। ওই সময় মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরে হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে প্রত্যর্পণের প্রশ্ন আর উঠবে না। কিন্তু তা না হলে তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের বিচার বিভাগ। একই সঙ্গে দিল্লি বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করবে। ঢাকাকে এই সর্বোচ্চ বা কঠোর অবস্থান না নেওয়ার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবে।

২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে যা যা আছে

২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তিতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, যারা কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন অথবা ‘আদালতের ঘোষিত দণ্ড’ কার্যকর করার জন্য যাদের খোঁজা হচ্ছে—এমন ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি ‘বাধ্যবাধকতা’র কথা রয়েছে। 

চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধ প্রত্যর্পণযোগ্য হলে সেটি ‘দুই চুক্তিবদ্ধ দেশের অন্য পক্ষের বিচারিক কর্তৃপক্ষ’ বিবেচনা করবে।

চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ অপরাধ প্রত্যর্পণের আওতায় বিবেচনা করা হবে না। তবে একই অনুচ্ছেদে হত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, হত্যায় প্ররোচনা এবং এ ধরনের আরও ১২টি অপরাধকে রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এই আইনে ভারত থেকে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয় পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নোডাল দপ্তর হলো কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা (সিপিভি) বিভাগ। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট প্রত্যর্পণ চুক্তি বা ব্যবস্থা বিবেচনা করে উপযুক্ত মনে করলে মামলাটি তদন্তের জন্য একজন তদন্ত ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে।

আইনে বলা হয়েছে, ইনকোয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন; বিদেশি রাষ্ট্রের অনুরোধ অনুযায়ী পলাতক অপরাধীকে হস্তান্তর করা উপযুক্ত, তাহলে তিনি তার প্রতিবেদনে প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন।

অন্যদিকে, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত তদন্ত শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন; বিদেশি রাষ্ট্রের অনুরোধের পক্ষে প্রাথমিকভাবে প্রমাণযোগ্য কোনো মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাহলে তিনি পলাতক অপরাধীকে অব্যাহতি দেবেন।

বিশ্ব বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর