ঢাকা, ১৭ নভেম্বর রোববার, ২০১৯ || ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৫০

স্বপ্নবাজ তারুণ্যের স্রোতে বিকশিত হোক জরাগ্রস্ত সমাজ-সভ্যতা 

নবনীতা চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ১৮:২৬ ২৬ অক্টোবর ২০১৯  


`ওরে  নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।‘
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, নবীনদের আঘাত করেই সমাজ সভ্যতার সমস্ত জঞ্জাল সরাতে হবে। দূরন্ত তারুণ্যের আছে সেই দুর্বার শক্তি। 
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম "যৌবনের গান" প্রবন্ধে বলেছেন "যে চাঁদ সাগরে জোয়ার জাগায় সে তার শক্তি সম্পর্কে আজও না ওয়াকিফ "।  
তাই বুঝি সে শক্তি মাঝে মাঝে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে,  অপশক্তি, অপযুক্তির খপ্পরে পড়ে যায়।  ইদানীং যখন এই তরুন সমাজের কর্মকান্ড ব্যাপকভাবে আলোচিত, সমালোচিত, নিন্দিত আর আপামর জনতা তাদের নিয়ে চিন্তিত, তখন এসবের বাইরেও অন্যরকম একটি চিত্র আছে। সেটিও এক ভিন্ন বাস্তবতা। 
তারুণ্যের শক্তি মানেই ছাত্ররাজনীতির নামে বুদ্ধিনাশী, ক্ষমতালিপ্সু কতিপয় বিপথগামী তরুণ নয়। নয় ধর্মের নামে নৃশংসভাবে মানুষ হত্যাকারী। নয় গুজব-সন্ত্রাস সৃষ্টি করার ফন্দি ফিকিরবাজ। এসমস্ত কিছুর পরেও একটি তরুণ শ্রেণী আছে যাদের বুকে আছে পৃথিবীর সুর। আছে সেই সুর দিয়ে বিশ্ব জয় করার অদ্যম উদ্যম। যারা দায়িত্ব নিয়েছে এই উত্তুঙ্গ সময়ের দক্ষ নাবিক হওয়ার। একদিন পৃথিবীটাকেও নেবে হাতের মুঠোয়। যারা প্রতিনিয়ত জ্বলে উঠছে আপন শক্তিতে। সভ্যতা ও মানুষের বাঁচা মরা এখনও যাদের ভাবিয়ে তোলে। ওদের তারুণ্য জীবনের প্রত্যেক প্রবাহে চায় অমৃতের স্পর্শ। তাদের জ্বালাময় আত্মা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে নিজেদের দগ্ধ করে প্রচন্ড বিস্ময়ে। যখন কালের হিংস্রতা কন্ঠরোধ করতে আসে তখন তারা সচকিত হয় বিবেকের তাড়নায়। উদ্যমী হয়ে ওঠে দৃপ্ত প্রত্যয়ে। তারা কারো মুখাপেক্ষী না হয়েই এগিয়ে যায় অসীম সাহসে। 
এমনই সব অপরাজেয় তরুণদের দেখা মিললো সিআরআই-ইয়াং বাংলা ‘উইথ সজীব ওয়াজেদ’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানে। সেখানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তরুণদের স্বপ্নদ্রষ্টা  প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা, ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার সজীব ওয়াজেদ জয়।
এ এক ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা। তাবত অঘটনের মধ্যে স্বস্তির নিশ্বাস। আমরা যারা হা হুতাশ করছি সেই হা হুতাশের হুতাশনে অনেক বড় ধাক্কা এই টগবগে তরুণরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা তরুণদের মুখে তাদেরই বিজয় গাঁথা অনেকটা রুপকথার মতোই শোনাচ্ছিল।  তবে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই, সমস্তটাই নিরেট বাস্তব। স্বপ্নদ্রষ্টাকে কাছে পেয়ে তরুণদেরও যেন মুখে তুবড়ি ছুটেছে। এসব তরুণের কেউ কাজ করছেন মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে, কেউ কাজ করছেন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে। কেউ আবার সারা বাংলাদেশের স্কুল গুলোতে ছুটে বেড়াচ্ছেন নারী সুরক্ষা নিশ্চিতকরনে নারীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। কেউ কাজ করছেন প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে, কেউ থিয়েটার তথা নাটককে নিয়েছে সামাজিক সচেতনতার ভিত্তি হিসেবে। কেউ কেউ আবার প্রগতিশীল, চেতনাবান, আর্দশিক প্রজন্ম গড়তে এবং দেশের সঠিক ইতিহাস শিশু কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে ছুটে চলেছে জেলায় জেলায়।  
একঝাঁক তরুণী তো তাদের গ্রামের চিত্র পাল্টে ফেলেছেন, কাজ করছেন মেয়ে ফুটবলারদের নিয়ে। প্রথম প্রথম তাদের গ্রামে কেউ মেয়েদের ফুটবল খেলা পছন্দ করত না। পরে তারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে মেয়ে ফুটবলার তৈরী করে একটি ফুটবল টিম গঠন করেছেন যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ হয়েছে পুরস্কারে। এখন তাদের গ্রামে কেউ আর মেয়েদের ফুটবল খেলতে বাধা দেয় না। 
অন্যদিকে একদল তরুণ সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করছেন। তারা যেকোন  সাইবার সন্ত্রাস বা দুর্ঘটনায় ২৪ ঘন্টার মধ্যেই সাইবার নিরাপত্তাজনিত সমাধান দিতে পারেন। শুধু তাই নয় স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায়  এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তারা সাইবার সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। এভাবেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান,  সামাজিক ও সাংস্কৃতিক খাতে পরিবর্তনমুখী কাজ করে চলেছেন এই তরুণরা। 
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন "সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ দরকার " । 
কোন সন্দেহ ছাড়াই বলা যেতে পারে জাতির পিতার "সোনার মানুষ "এই তরুণরাই  যারা কোন কিছু পাবার আশা না করে, একলা চলার শক্তিকে সম্বল করে শুধু দেশকে ভালোবেসে এক সুন্দর বাংলাদেশ বির্নিমানে প্রতিনিয়ত নীরবে নিভৃতে কাজ করে চলছে। তাদের মধ্যেই সুপ্ত আছে প্রকৃত স্বাধীনতা বীজপ্রবাহ। এই নিরলস, অমিত সম্ভাবনাময়, স্বপ্নবাজ তরুণদের স্বপ্নদ্রষ্টা, তাদের প্রতিনিধি সজীব ওয়াজেদ জয় উচ্ছ্বসিত হলেন, মুগ্ধ হলেন তরুণদের এই পথ পরিক্রমায়। তারুণ্যের শুভ শক্তির প্রতি তাঁর আস্থাজ্ঞাপন তরুণদের কর্মস্পৃহাকে বেগবান করলো। স্পর্শ করলো তরুণ হৃদয়কে।  তিনি তরুণদের প্রশংসা করে তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার  আহ্বান জানালেন। শুধু চাকরির পেছনে ছোটা নয়, বরং নিজেই অন্যকে চাকরি দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করা এবং করতে চাওয়া। ভুল করা এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া।  সেই সাথে প্রথাগত মন মানসিকতা বদলানোর কথাই উচ্চারিত হল তার কন্ঠে। এ যেন সময়ের অনিবার্য কন্ঠস্বর, অমোঘ দাবি। নিদারুণ বাস্তবতা হলো বেশিরভাগ মানুষের বিশেষ করে অভিভাবকদের সন্তুষ্টি এখনও বাধা পড়ে আছে তথাকথিত চাকরিতে। ঔপনিবেশিক চিন্তা ধারার ভূত আমাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে রয়েছে। তাই আমরা নিজেদের মালিক হওয়ার চেয়ে কেরানি হওয়াকে জীবনের চরম সাথর্কতা হিসেবে বিবেচনা করি। ঐটির পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনকে এতটাই অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিতে থাকি, যা একসময় খেই হারিয়ে ফেলে। তাই জীবিকা নির্ধারনে চাহিদা ও উপযোগিতা বিবেচিত হওয়া উচিত সময়ের মানদণ্ডে। 
সময় বদলেছে, তাই সময়ের সাথে বিবর্তন ঘটাতে হবে প্রচলিত ধ্যান ধারনার। নইলে কাঙ্খিত সাফল্য অধরাই থেকে যাবে। 
কথায় কথা উঠেছে তরুণদের রাজনীতি নিয়ে। সেই প্রসঙ্গেও সাফ কথা, এই তরুণ প্রতিনিধির তরুণদের রাজনীতি হতে হবে সুস্থধারার, মনে করিয়ে দিয়েছেন ছাত্র রাজনীতির গৌরবজ্বল ইতিহাস। বার বার উচ্চারিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আর্দশিক বাংলাদেশ নির্মাণের  কথা, আলোচিত হয়েছে ভবিষ্যৎ ডিজিটালাইজেশন, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিয়ে। সেই সাথে প্রাধান্য পেয়েছে তরুণদের উন্নয়ন। যে উন্নয়ন হবে টেকসই উন্নয়ন।    

বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। বহির্বিশ্বের কাছে  বাংলাদেশ আজ আর তলাবিহীন কোন ঝুড়ি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের রোল মডেল। খুব বেশিদিন দেরি নেই যেদিন বাংলাদেশ উন্নত দেশে উপনীত হবে। যার নেতৃত্ব দেবে এই স্বপ্নবাজ, স্বনির্ভর অরুন প্রাতের তরুণ দল এবং  তাদের স্বপ্নদ্রষ্টা।  যার হাত ধরেই উন্মোচিত হবে নতুনের বিজয় কেতন। সমাজে মানুষদের নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, সন্ত্রাস, উগ্রবাদ যখন বেশি করে চর্চিত এবং আলোচিত তখন এই তরুণদের মতো হাজারো তরুণ কাজ করে চলছেন কারো প্রতি কোন আশা না রেখেই তাদের সীমিত সক্ষমতাকে সাথে নিয়েই। 
মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ আছে, যেমন থাকে প্রদীপের নিচে অন্ধকার।  কিন্তু অন্ধকারের কথা বার বার বলতে গিয়ে আমরা যেন আলোর কথা ভুলে না যাই। আমরা  যেমন আবরার, নুসরাতের প্রতি নৃশংসতা দেখে বির্মষ হই, আতংকিত হই, দুঃখ পাই, তেমনি সমানভাবেই এসব তরুনণের কর্মকান্ড আমাদের মনে নিভু নিভু আশার আলো জ্বালিয়ে তোলে। আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি। আস্থা হারানো মন আবার উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। 
মানসিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে "ভায়া নেগেটিভা" বলে একটি টার্ম আছে, যেটির মূল বিষয় হল সবসময় ইতিবাচক চিন্তা ভাবনাকে উৎসাহ দেয়া। বলা হয়, ইতিবাচক চিন্তা ও কল্পনার মাধ্যমে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও কর্মকান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। তাই শুধু নেতিবাচক চিন্তা নয়, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারাটাও জরুরি। চারপাশের প্রতিবেশে এমনটা করতে পারা খুব একটা সহজ নয়। তবুও চর্চা শুরু করা উচিত। 
সকলের সামগ্রিক চেষ্টাতেই বাংলাদেশে পৌঁছে যাবে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে। যার মূল কান্ডারী হবে আজকের এই তরুণরা। যারা জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে পারে কিন্তু কোন দুর্নিবীতের কাছে মাথা নোয়াতে পারে না। কোন ঝড় বিক্ষুব্ধে তারা থামতে জানে না। এমন স্বপ্নবাজ, বীরকর্মী ও তাদের স্বপ্নদ্রষ্টার হাতে ধংস হোক, লুপ্ত হোক, ক্ষুদিত পৃথিবী আর সর্পিল সভ্যতা। তারুণ্যের স্রোতে জরাগ্রস্ত সমাজ ও সভ্যতা বিকশিত হয়ে উঠুক। তারুণ্যের নীলরক্ত সহস্র সূর্যের স্রোতে স্পর্শ করুক নবদিগন্ত, সূচনা হোক নতুন দিনের। 

# নবনীতা চক্রবর্তী, এডুকেশন সেক্রেটারি,  স্টেজ ফর ইয়ুথ, বাংলাদেশ।