ঢাকা, ০৮ জুন সোমবার, ২০২৬ || ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
good-food

মন খারাপে দুঃখের গান শুনলে চোখে ভিজে যায় কেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৮:৪৫ ৮ জুন ২০২৬  

বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, জানালার পাশে বসে কানে হেডফোন দিয়ে শুনছেন বিরহের কোনো গান। মনের ভেতর জমে থাকা বিষণ্ণতা যেন সুরের ছোঁয়ায় হঠাৎ বৃষ্টির মতো চোখের জল হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করল। আমরা অনেকেই লক্ষ্য করেছি, মন খারাপের সময় দুঃখের গান শুনলে কান্না আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু কেন এমন হয়? বিষণ্ণ সুর কি আমাদের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে শরীরের কোনো জটিল বিজ্ঞান?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মন খারাপের সময় দুঃখের গান শুনে চোখে জল আসা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও নিরাময়মূলক প্রতিক্রিয়া। এর পেছনে প্রধানত কাজ করে শরীরের কিছু হরমোন এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।

প্রোল্যাকটিন হরমোনের জাদুকরী ভূমিকা

ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড হুরন এই বিষয়ে একটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার গবেষণা অনুসারে, যখন আমরা দুঃখের গান শুনি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক মনে করে আমরা হয়তো বাস্তবে কোনো বড় বিপদে পড়েছি বা ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছি। এই ‘মিথ্যা’ শোকের মোকাবিলা করতে মস্তিষ্ক তখন শরীরকে শান্ত করার জন্য ‘প্রোল্যাকটিন’ নামক এক ধরনের হরমোন নিঃসরণ করে।

প্রোল্যাকটিন সাধারণত মায়েদের সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সময় বা মানুষ যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তখন নির্গত হয়। এটি আমাদের মনে এক ধরনের সান্ত্বনা বা স্বস্তি দেয়। কিন্তু যেহেতু দুঃখের গানের ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনো ট্র্যাজেডি ঘটে না, তাই এই অতিরিক্ত প্রোল্যাকটিন আমাদের মনের ওপর এক ধরনের প্রশান্তিদায়ক প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। ফলে চোখের জল ঝরলেও গান শেষ হওয়ার পর আমরা এক অদ্ভুত হালকা বোধ করি।

ডোপামিন ও মস্তিষ্কের পুরস্কার

দুঃখের গান শুনলে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টার থেকে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। ডোপামিন আমাদের ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। যদিও গানটি বিষণ্ণ, কিন্তু এর শৈল্পিক সৌন্দর্য ও সুর আমাদের মস্তিষ্ককে আনন্দ দেয়। এই আনন্দ ও বিষণ্ণতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমাদের আবেগপ্রবণ করে তোলে, যা চোখের জল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ক্যাথারসিস বা আবেগীয় মুক্তি

মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্যাথারসিস’। আমাদের অবচেতন মনে অনেক অব্যক্ত কষ্ট জমে থাকে যা আমরা সহজে প্রকাশ করতে পারি না। দুঃখের গান সেই অবদমিত আবেগগুলোকে বাইরে বেরিয়ে আসার পথ করে দেয়। গান শোনার সময় আমরা গায়ক বা গায়িকার ব্যথার সঙ্গে নিজের কষ্টকে মিলিয়ে ফেলি। এই সহমর্মিতা বা এমপ্যাথি আমাদের ভেতরের গুমোট ভাবটাকে হালকা করে দেয়। চোখের জল তখন সেই মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কাজ করে।

মিরর নিউরনের প্রভাব

আমাদের মস্তিষ্কে ‘মিরর নিউরন’ নামক কিছু কোষ থাকে। এর কাজ হলো অন্যের অনুভূতিকে নিজের মধ্যে অনুভব করা। দুঃখের গানের করুণ সুর যখন আমাদের কানে পৌঁছায়, তখন এই মিরর নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে শিল্পী যে আবেগ দিয়ে গানটি গেয়েছেন, তা আমাদের হৃদয়ে হুবহু প্রতিফলিত হয়। এই পরোক্ষ অনুভূতিই আমাদের অশ্রুগ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে।

মন খারাপের সময় দুঃখের গান শুনে কান্না আসা আসলে শরীরের একটি ‘সেলফ-হিলিং’ বা নিজেকে সারিয়ে তোলার প্রক্রিয়া। এটি মনের ভার লাঘব করে এবং আমাদের মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। তাই পরবর্তী সময়ে বিষণ্ণ সুরে চোখের জল এলে বুঝবেন, আপনার মস্তিষ্ক আসলে আপনার মনকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চোখের জল এখানে শোকের নয়, বরং মনের গুমোট মেঘ কেটে যাওয়ার বৃষ্টির মতো।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর