ঢাকা, ০৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার, ২০২৬ || ২৬ মাঘ ১৪৩২
good-food
৩৮

‘আত্মঘাতী’ বইমেলায় অংশ নেবে না ৩২১ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:৫৯ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

আগামী ২০ ফেব্রুয়ারির বইমেলায় অংশ নেবে না ৩২১টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অমর একুশে বইমেল ‘ আয়োজনের সিদ্ধান্ত ‘বাস্তবর্তাবিবর্জিত’ ও ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে রবিবার বিবৃতি দিয়েছেন ৩২১ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা। 

প্রকাশকরা বলছেন, পবিত্র রমজান ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারিতে মেলা অনুষ্ঠিত হলে তারা তাতে অংশ নেবেন না। বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্তকে তারা প্রকাশনা শিল্পকে প্রবল অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল বলেও মনে করছেন। 

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বইমেলা কোনও সরকারি রুটিন ওয়ার্ক বা কেবল আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মিলনমেলা। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরপরই রোজার মধ্যে মেলা আয়োজনের যে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে মেলার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। 

বিবৃতিতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, অনন্যা, অন্যপ্রকাশ, আগামী প্রকাশনী, মাওলা ব্রাদার্স, কাকলী প্রকাশনী, কথাপ্রকাশ, আফসার ব্রাদার্স, সময় প্রকাশন, অবসর, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস লিমিটেড, পুথিনিলয়, পাঠক সমাবেশ, আদর্শ, শোভা প্রকাশ, নালন্দা, বাতিঘর, ভাষাচিত্র, প্রথমা প্রকাশন, অন্যধারা, অ্যাডর্ন, মল্লিক ব্রাদার্স, বাংলানামা, বাংলালিপি, কলি প্রকাশনী, অক্ষর, গতিধারা, শব্দশৈলী প্রভৃতি।

বিবৃতিতে প্রকাশকরা তিনটি প্রধান সংকট তুলে ধরেছেন— 

পাঠকশূন্যতার আশঙ্কা: ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হলে মাত্র কয়েকদিন পরেই পবিত্র মাহে রমজান শুরু হবে। রোজার দিনে তীব্র গরম ও যানজট ঠেলে পাঠকরা মেলায় আসবেন না। পাঠকহীন মেলা প্রকাশক ও আয়োজক উভয়ের জন্যই বিব্রতকর। 

মানবিক বিপর্যয়: মেলার স্টলগুলোতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করে। সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও তারাবিহ নামাজের পর এই শিক্ষার্থীদের দিয়ে কাজ করানো অমানবিক। আমরা আমাদের কর্মীদের এই কষ্টের মধ্যে ফেলতে চাই না। 

অর্থনৈতিক ঝুঁকি: গত দেড় বছরে প্রকাশনা শিল্প চরম মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আরও একটি অসফল মেলায় অংশ নিয়ে অবশিষ্ট পুঁজি হারানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। 

প্রকাশকদের দাবি, তারা সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টারও শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু নীতিনির্ধারক মহল তাদের অস্তিত্বের সংকট অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। 

বিবৃতিতে বলা হয়, “শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নেওয়া আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে একটি সৃজনশীল শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়লে তার দায়ভার সরকার এড়াতে পারে না। প্রকাশকদের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো প্রমাণ করে যে, এই খাত সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।” 

বাংলা একাডেমি এপ্রিলের ঝড়-বৃষ্টির অজুহাত দেখালেও প্রকাশকরা বলছেন, ঈদের পর মেলা হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিতে তারা প্রস্তুত, কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে ‘নিশ্চিত ব্যবসায়িক মৃত্যু’র ঝুঁকি নেবেন না। 

বিবৃতিতে ৩২১ জন প্রকাশক বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে মেলা আয়োজিত হলে মানবিক ও ব্যবসায়িক কারণে আমাদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর মেলা আয়োজিত হলে আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করব এবং মেলা সফল করতে কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।” 

‘জেদ পরিহার করে’ উৎসবের আমেজে বই কেনাবেচার পরিবেশ তৈরি করতে ঈদের পর মেলা আয়োজনের জন্য তারা বাংলা একাডেমি ও সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলা একাডেমি ৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে জানায় আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা। রমজান মাসকে সামনে রেখে এবার মেলার সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মেলা চলবে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমি।

বাংলা একাডেমির সচিব ও গ্রন্থমেলা কমিটির সদস্যসচিব মো. সেলিম রেজা জানান, প্রকাশকদের পক্ষ থেকে ঈদের পর বইমেলা আয়োজনের প্রস্তাব এলেও এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড গরম, ধুলোবালি, কালবৈশাখী ও বৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় সে সময় মেলা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দেয় বাংলা একাডেমি। তবে প্রকাশকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার স্টল ভাড়া ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, সরকারের কাছ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং স্টল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমান বাংলা লিমিটেডকে নির্বাচন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য আলোচক ও প্রবন্ধকারদের এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মেলা কমিটির সচিব জানান, গত বছর বইমেলায় ৫২৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। এবার ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ৫৩টি নতুন প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। যাচাই-বাছাই শেষে পুরোনো প্রতিষ্ঠানসহ ২৪টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।

বইমেলায় ছুটির দিনে থাকবে শিশু প্রহর। এছাড়া প্রতিদিন বিকেলে মেলামঞ্চে আলোচনা সভা, সন্ধ্যার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অমর একুশে উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ মেলা সংশ্লিষ্ট সব কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।