ঢাকা, ১১ জুলাই শনিবার, ২০২০ || ২৭ আষাঢ় ১৪২৭
good-food
১৪৬

সতর্ক থাকুন-যাচাই করুন

করোনা: ভুয়া পরামর্শে সয়লাব সোশ্যাল মিডিয়া

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:৪৪ ১৯ জুন ২০২০  

করোনাভাইরাসের এ অসময়ে স্বাস্থ্য পরামর্শের যেন অভাব পড়ছে না। তবে দুর্ভাগ্যবশত সত্যটা হল - এগুলোর ভেতরে সিংহভাগই ভুয়া। কারণ এখন পর্যন্ত এর কোনও প্রতিষেধক বের হয়নি।

 

করোনার শুরু থেকেই এটা ঠেকাতে নানা ধরণের স্বাস্থ্য পরামর্শ দেখা যাচ্ছে - যেগুলো প্রায়ই হয় অপ্রয়োজনীয় নয়তো বিপজ্জনক। বিশেষ করে সাাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এগুলো ছড়ানো হচ্ছে বেশি।

 

জেনে নিন, কী ধরনের ভুয়া স্বাস্থ্য পরামর্শ এড়িয়ে চলবেন -

 

রসুন : 

ফেসবুকে এমন অসংখ্য পোস্ট দেখা গেছে যেখানে লেখা - যদি রসুন খাওয়া যায় তাহলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে “যদিও রসুন একটা স্বাস্থ্যকর খাবার এবং এটাতে এন্টিমাইক্রোবিয়াল আছে” কিন্তু এমন কোনও তথ্য প্রমাণ নেই যে রসুন নতুন করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

 

অলৌকিক সমাধান :

জরডান সাথের হলেন একজন ইউটিউবার, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তার রয়েছে হাজার হাজার অনুসারী। তিনি দাবি করছেন যে “একটা অলৌকিক খনিজ পদার্থ” যাকে এমএমএস নামে ডাকা হয়, সেটা দিয়ে এই করোনাভাইরাস একেবারে দূর করা সম্ভব। এটাতে রয়েছে ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড যেটা একটা ব্লিচিং এজেন্ট। কিন্তু গত বছরে মার্কিন ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রিশন সতর্ক করে বলে যে, এমএমএস পান করা স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর। অন্যান্য দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।


ঘরে তৈরি জীবাণুনাশক :

করোনাভাইরাস ঠেকানোর একটা কার্যকর উপায় হচ্ছে বারবার করে হাত ধোয়া। হাত ধোয়ার জেল, যেটা দিয়ে তাৎক্ষণিক জীবাণু ধ্বংস করা যায়, সেটা ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঘরে তৈরি সব জীবাণুনাশক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়।

 

রূপার পানি :

কলোইডিয়াল সিলভার মূলত এমন পানি যেখানে রুপার ক্ষুদ্র কণিকা মেশানো থাকে। মার্কিন টেলি-ইভানজেলিস্ট ধর্মপ্রচারক জিম বেকার এই জল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। তার অনুষ্ঠানে এক অতিথি দাবি করেন যে এই পানি কয়েক ধরণের করোনাভাইরাস মেরে ফেলতে সক্ষম। অবশ্য তিনি স্বীকার করেন যে কোভিড-১৯ এর ওপর এটা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

 

১৫ মিনিট অন্তর পানিপান :

ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টে একজন ‘জাপানি ডাক্তার’কে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের জীবাণু মুখের মধ্যে ঢুকে পড়লেও প্রতি ১৫ মিনিট পর পর পানি খেলে তা দেহ থেকে বের হয়ে যায়। এই পোস্টের একটি আরবি ভার্সন ২৫০,০০০ বার শেয়ার হয়েছে। কিন্তু লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক স্যালি ব্লুমফিল্ড বলেছেন, এই দাবির পক্ষে সত্যিই কোনও প্রমাণ নেই।

 

তাপমাত্রা ও আইসক্রিম পরিহার :

গরমে এই ভাইরাস মরে যায় বলে সোশাল মিডিয়াতে অনেক ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গরম পানি পান করা, গরম পানিতে গোসল করা, এমনকি হেয়ারড্রায়ার ব্যবহারেরও সুপারিশ করা হচ্ছে। কিন্তু ইউনিসেফ বলছে, এটা স্রেফ ভুয়া খবর। ফ্লু ভাইরাস মানবদেহের বাইরে বেঁচে থাকতে পারে না।

 

ইউনিসেফ’র সতর্কতা :

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বিবৃতি দিয়েছে।


সংস্থার উপ-নির্বাহী পরিচালক শার্লোট পেট্রি গর্নিৎজকাকে উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়, ‘জনসাধারণের কাছে আমাদের অনুরোধ, আপনারা কীভাবে নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন, সে সম্পর্কে যাচাইকৃত উৎস থেকে সঠিক তথ্য সন্ধান করুন।’

 

তিনি বলেন, ইউনিসেফ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও), সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানার সঠিক ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

ইউনিসেফের কর্মকর্তা একই সাথে অবিশ্বস্ত বা অযাচাইকৃত উৎস থেকে পাওয়া তথ্য শেয়ার বা প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে করে আতঙ্ক, ভয়ভীতি ছড়াতে পারে বা কারো নামে কলঙ্ক রটে যেতে পারে। এর ফলে লোকজন এ ভাইরাস থেকে অরক্ষিত বা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে পারে।

 

ইউনিসেফের নিউইয়র্ক অফিস থেকে প্রচারিত এ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিশ্বজুড়ে লোকজন করোনভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বনের প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে প্রয়োজন হলো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ প্রস্তুতি।

 

তবে, করোনা ভাইরাস এবং এ থেকে সুরক্ষার উপায় সম্পর্কে যেসব তথ্য জানছেন ও অপরকে জানাচ্ছেন সেগুলোর মধ্যে কেবল অল্প কিছু তথ্য দরকারি বা নির্ভরযোগ্য।’ বিবৃতিতে বলা হয়, বিশেষ করে ইউনিসেফ মনে করে যে, সারা বিশ্বে কয়েকটি ভাষায় প্রচারিত একটি ‘ভ্রান্ত অনলাইন বার্তা’র উল্লেখ করা হয়।

 

ইউনিসেফের বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সামাজিক এবং কিছু মূলধারার মিডিয়ায় প্রচারিত এ ভুল বার্তায় বলা হয়েছে, আইসক্রিম এবং অন্যান্য ঠান্ডা খাবার এড়ানো এ ভাইরাস সংক্রমনের সূত্রপাত রোধে সহায়ক হতে পারে। যা অবশ্যই ‘সম্পূর্ণ অসত্য’।

 

বিবৃতিতে এই ধরনের মিথ্যাচারের হোতাদের উদ্দেশ্যে একটি সাধারণ বার্তা দিয়ে বলা হয়, ‘এটি বন্ধ করুন। ভুল তথ্য প্রচার করা এর সঙ্গে আস্থার অবস্থানে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে চালিয়ে দিয়ে তাতে নির্ভরযোগ্যতার রং দেয়ার অপচেষ্টা বিপজ্জনক এবং ভুল।’

 

ইউনিসেফ অবশ্য স্বীকার করেছে যে, আজকের সমাজের তথ্য সমৃদ্ধির এ দিনে নিজেকে এবং প্রিয়জনদের সুরক্ষিত রাখার উপায় সম্পর্কে জানতে ঠিক কোথায় যেতে হবে তা জানা কঠিন হতে পারে।

 

এতে বলা হয়, কিন্তু আমরা আমাদের নিজেদের এবং আমাদের প্রিয়জনদের সুরক্ষিত রাখতে পূর্ব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহনের ব্যাপারে যেমনটি সতর্ক থাকবো ঠিক তেমনটি এ সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও এর সঠিকতার ব্যাপারেও আমাদের কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এতে আরো বলা হয়, ইউনিসেফ এ ভাইরাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরবরাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইন এবং টিকটক-এর মতো অনলাইন অংশীদারদের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

 

বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনিসেফ সঠিক তথ্য ও পরামর্শ সুলভ এবং পাশাপাশি ভুল তথ্য উদ্ভূত হলে তা জনসাধারণকে অবহিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়।