ঢাকা, ১২ আগস্ট বুধবার, ২০২৬ || ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food

চীনের শক্তিশালী অর্থনীতির রূপকার ঝু রংজি আর নেই

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:৫৯ ১২ আগস্ট ২০২৬  

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির অভাবনীয় অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম রূপকার ঝু রংজি মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগে বেইজিংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বুধবার সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, বুধবার বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ৯৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঝু রংজি। চীনের অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামো থেকে আরও বাজারমুখী ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, আর্থিক ও করব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের মত বড় সংস্কারের সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে আছে।

বিশেষ করে ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক। দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওতে প্রবেশের মাধ্যমে চীনা অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের আমলে চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক পদ 'প্রিমিয়ার' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কঠোর ও স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত এই নেতা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে লাভজনক ও দক্ষ করে তুলতে কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল অংশ এবং শিল্প মালিকদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন তিনি।

তার সংস্কার নীতির কারণে লাখ লাখ কর্মী চাকরি হারালেও, এই কঠোর পদক্ষেপই ২০১০ সালে চীনকে জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করতে মূল ভূমিকা রাখে।

মরহুম নেতা ডেং জিয়াওপিংয়ের ১৯৭৯ সালের সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে চীনকে ডব্লিউটিও-র সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন জু। পরবর্তিতে তার এই পদক্ষেপ চীনকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রফতানিকারক দেশে রূপান্তর করে। ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বার্ষিক ৮ শতাংশের ওপরে ধরে রাখতে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য, যা ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ ১৪.২ শতাংশে পৌঁছেছিল।

দাপ্তরিক গাফিলতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জুর অনমনীয় অবস্থান তাকে জনমানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয় করে তোলে। সরকারি প্রেস নিবন্ধে তার একটি বিখ্যাত উক্তি উঠে এসেছিল "আমি এখানে ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছি। ৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য আর একটি আমার নিজের জন্য।" তার কঠোর ও আপসহীন কার্যশৈলীর জন্য সহকর্মীরা তাকে 'বস' এবং অনুরাগীরা তাকে পাগল জু (ম্যাডম্যান জু) নামে ডাকতেন।

১৯৯০-এর দশকে উপ-প্রিমিয়ার হিসেবে চীনের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং লোকসানি রাষ্ট্রীয় সংস্থায় ঋণ দেওয়া বন্ধ করে তিনি নিজের সক্ষমতার জানান দেন। ১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অ্যাপার্টমেন্টগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে দেশে আবাসন খাতের বিপ্লব ঘটান তিনি, যার ফলে এক দশকের মধ্যে শহরাঞ্চলের অধিকাংশ ঘরবাড়ি ব্যক্তিমালিকানাধীন হয়ে ওঠে।

ঝড়ঝাপটা ও উত্থান-পতন

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের জন্মভূমি হুনান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন জু রোংজি। অন্য কমিউনিস্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশংসা করায় ১৯৫৭ সালে তাকে 'ডানপন্থী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং টানা ২২ বছর রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে দূরে রাখা হয়। ১৯৬৬-৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে কায়িক শ্রমে বাধ্য করা হয়েছিল।

১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পর দ্রুত তার উত্থান ঘটে। ১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র হন। ১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের আন্দোলনকালীন তিনি সামরিক বাহিনী ব্যবহার না করে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন করেন। এর পরপরই তিনি ১৯৯১ সালে ডেপুটি প্রিমিয়ার এবং ১৯৯৮ সালে প্রিমিয়ার নিযুক্ত হন।

অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতাদের মতো তিনি কখনো সরকারের ভুল ঢাকতে যাননি। ২০০১ সালে একটি স্কুলে বিস্ফোরণে ৪২ জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় মন্ত্রীসভার ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি জাতীয় টেলিভিশনে প্রকাশ্য ক্ষমা চান। এছাড়া তার পাবলিক সংবাদ সম্মেলনে রসাত্মক মন্তব্য ও কৌতুক করার শৈলী কমিউনিস্ট পার্টির গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাবমূর্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

২০০৩ সালে প্রিমিয়ারের পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি একপ্রকার জনসমক্ষ থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী লাও আন, পুত্র ইউনলাই (লেভিন জু) এবং কন্যা ইয়ানলাইকে রেখে গেছেন।

বিশ্ব বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর