ঢাকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ৬ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food
৩১

ভাষার জন্য লড়াই করেছিল যেসব দেশ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৩৭ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারি এলে বাঙালির হৃদয়ে ফিরে আসে এক অমলিন স্মৃতি। ফিরে আসে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। যেদিন ঢাকার রাজপথে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের রক্তে লেখা হয়েছিল বাংলা ভাষার দাবি। সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। কিন্তু ভাষার জন্য সংগ্রামের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশের নয়; পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে রক্ত দিয়েছে, জেল খেটেছে, আন্দোলনে নেমেছে।

ভারতের দক্ষিণে হিন্দিবিরোধী আন্দোলন

১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি স্কুলে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। অনশন, পদযাত্রা, গ্রেফতারের মাঝেও তিন বছর ধরে চলে আন্দোলন। আন্দোলনের তীব্রতায় ১৯৪০ সালে এই আইন প্রত্যাহার করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা করার উদ্যোগে দক্ষিণ ভারত, বিশেষ করে তামিলনাড়ু উত্তাল হয়ে ওঠে। সহিংসতায় শতাধিক প্রাণহানি ঘটে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজিকেও ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

মাদ্রাজে ভাষার জন্য আন্দোলন। 

বরাক উপত্যকার রক্তাক্ত ১৯ মে

১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে গুলিবিদ্ধ হন ১১ জন আন্দোলনকারী। শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান কিশোরী কমলা ভট্টাচার্যসহ অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই বরাকের তিন জেলায় বাংলা সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়। প্রতিবছর এই দিনটি সেখানে ‘ভাষা শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

আসামে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ভাস্কর্য।  

সোয়েটোর শিশুদের প্রতিবাদ

১৯৭৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো-তে স্কুলশিক্ষার্থীরা আফ্রিকানার (দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত শ্বেতাঙ্গ ডাচদের জার্মান-ডাচ ভাষার মিশ্রণ) ভাষায় বাধ্যতামূলক শিক্ষার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। বর্ণবাদী সরকারের গুলিতে নিহত হয় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী। এই ঘটনা ইতিহাসে ‘সোয়েটো অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত। দিনটি এখন দক্ষিণ আফ্রিকায় শিশু দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়। ভাষা সেখানে হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতীক।

আফ্রিকার সোয়েটো-তে স্কুলশিক্ষার্থীরা আফ্রিকানা ভাষায় বাধ্যতামূলক শিক্ষার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে।

নেটিভ ভাষার স্বীকৃতি

যুক্তরাষ্ট্রে বহু আদিবাসী ভাষা ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে বিলুপ্তির মুখে পড়ে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালের ৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র সরকার আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণে আইন পাস করে। একইভাবে কানাডা-র কুইবেকে ফরাসি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ নেয়।

অন্যদিকে লাটভিয়া-তে ২০১২ সালের গণভোটে রুশ ভাষাকে দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। লাটভিয়ার জনগণের কাছে, জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে ভাষাই ছিল মূল ইস্যু।

ভাষা মানেই পরিচয়

শ্রীলঙ্কায় ‘সিনহালা অনলি’ আইনের পর তামিলদের দীর্ঘ সংগ্রাম, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ভাষাগত অধিকার আন্দোলন—সব জায়গাতেই ভাষা হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। ইউরোপের বেলজিয়াম, স্পেনের কাতালোনিয়া, ফ্রান্স কিংবা বলকান অঞ্চলেও ভাষা ও সংস্কৃতির টানাপোড়েন বহু রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে। 

আজকের বিশ্বায়নের যুগে ভাষার সংকট আরও জটিল। প্রযুক্তি ও বাজারের চাপে ছোট ভাষাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। তাই মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়, চর্চা ও সংরক্ষণও জরুরি। জরুরি নিজ ভাষায় পড়া, লেখা, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মকে ভাষার ইতিহাস শেখানো।

ফেব্রুয়ারির এই ভাষার মাস তাই শুধু স্মরণ নয়, প্রতিজ্ঞারও সময়। তাই নিজ ভাষাকে ভালোবাসার পাশাপাশি পৃথিবীর সব মাতৃভাষার বৈচিত্র্য ও মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার করতে হবে। ভাষা বাঁচলে বাঁচবে মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়।