ঢাকা, ২৪ অক্টোবর শনিবার, ২০২৬ || ৮ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
১৩

হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব বন্ধ হলে মজুত তেলে কত দিন চলবে বিশ্ব?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০০:৪০ ২৪ অক্টোবর ২০২৬  

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নতুন করে পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে স্মরণকালের ভয়াবহ সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কারণে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অবরুদ্ধ হলে বিশ্ববাজারে দৈনিক ৯৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি দেখা দেবে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বের হাতে থাকা জরুরি তেলের মজুত দিয়ে বড়জোর এক থেকে দুই মাস বা ৩০ থেকে ৬০ দিন চলা সম্ভব হতে পারে।

সাম্প্রতিক অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি বেড়ে ১১০ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে যা বিগত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অচলাবস্থায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

কমেছে জরুরি তেলের বৈশ্বিক মজুত

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সংকট সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সদস্যদেশগুলো তাদের জরুরি কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ে। গত মার্চে আইইএর ৩২টি সদস্যদেশ একযোগে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় যা ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি। এর ফলে বিশ্বের তেলের মজুত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

জরুরি তেলের মজুতের ক্ষেত্রে দেশভেদে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার ফলে বর্তমানে তাদের মজুত কমে ২৮ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে, যা ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। 

অন্যদিকে চীনের স্থলভাগে বর্তমানে ১১৩ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে, যা দিয়ে দেশটির শোধনাগারগুলোর প্রায় ৮০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। আবার বাজারে ব্যবহারযোগ্য জরুরি তেলের প্রায় অর্ধেক রয়েছে জাপানের হাতে এবং ইউরোপের কাছে অব্যবহৃত মজুত রয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল। তবে আমদানিনির্ভর ভারতের মজুত পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক যা দিয়ে তাদের মাত্র ৮ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

বিপর্যয়কর হিসাব

যুদ্ধের পূর্বে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সৌদি আরব হরমুজ এড়াতে তাদের লোহিত সাগরীয় ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে তেলের বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা করলেও সেটির ওপরও আক্রমণ হয়েছে। পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের অবরোধের কারণে লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, দুটি জলপথই যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি দৈনিক ১ কোটি ৬৮ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মাত্র ৭৫ লাখ ব্যারেলে নামবে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে দৈনিক ৯৩ লাখ ব্যারেল তেলের বিশাল যোগান ঘাটতি তৈরি হবে।

বিনিয়োগ সংস্থা আইজি গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক মজুত থেকে সব তেল রাতারাতি বা দ্রুততম সময়ে বাজারে আনা বাস্তবসম্মত নয়। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন মজুত থেকে সম্পূর্ণ তেল বাজারে আনতে প্রায় তিন মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার স্পর্শ করতে পারে। আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ ভোক্তা ও কারখানাগুলো তেলের ব্যবহার কমাতে বাধ্য হবে যার অর্থনৈতিক রূপকে বলা হয় 'ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন' বা চাহিদা ধস।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে এশিয়া

উপসাগরীয় তেলের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হওয়ায় এবং নিজস্ব কৌশলগত মজুত কম থাকায় এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ে পড়বে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি পেতে ভারতের যেখানে মাত্র ২ দিন লাগে, মধ্যপ্রাচ্যের পথ বন্ধ হলে বিকল্প হিসেবে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে তেল আনতে তাদের ২৫ থেকে ২৮ দিন সময় লেগে যাবে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের এমন সরবরাহ সংকটে লাভবান হতে পারে লাতিন আমেরিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম আফ্রিকা ও রাশিয়ার মতো উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের তেল উৎপাদকরা। দাম বৃদ্ধির সুবাদে ইতোমধ্যে এক্সনমোবিল, শেভরন ও শেলের মতো বৈশ্বিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দুটি মূল প্রণালিতে একই সাথে জাহাজ চলাচল থমকে গেলে শুধু তেলের দামই বাড়বে না; বরং বৈশ্বিক পরিবহন খাত, শিল্প উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতে চরম নেতিবাচক ধাক্কা সামলাতে হবে বিশ্বের অর্থনীতিকে।

অর্থনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর