ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
good-food
১০

বিরোধী দলের আপত্তিতেও এসআরবি বিল পাস, র‍্যাব বিলুপ্ত

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:০৮ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে। এর ফলে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠনের পথ তৈরি হলো। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মধ্যেই বিলটি পাস হয়।

এই বিলে ২০০৩ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ থেকে র‌্যাব সংক্রান্ত বিধানগুলো বাদ দিয়ে এসআরবি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই র‌্যাব গঠনের আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। সংশোধিত অধ্যাদেশের অধীনে ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠিত হয়। তারপর থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের অভিযোগসহ বিভিন্ন সমালোচনার মুখে পড়ে বাহিনীটি।

এখন সরকার ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে এসআরবির জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে এসআরবি বিল উত্থাপন করা হয়। ওই সময় সেটার বিরোধিতা করেন বিরোধীদলের এমপিরা। তারা বলেন, “নতুন নামে কার্যত র‌্যাবকেই পুনর্গঠন করা হচ্ছে।” সংসদীয় কমিটিতে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ও আটটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি দ্রুত বিবেচনার জন্য সংসদে তোলেন। কিন্তু এই বিল সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর পাশাপাশি পাসের আগে জনমত নেওয়ার দাবি জানান বিরোধীদলীয় এমপিরা। আলোচনায় অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, দলটির সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন, মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, নুরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এস কে মুজিবুর রহমান ইকবাল।

বিলে পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা, সশস্ত্র সদস্য বা কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগ কিংবা পদায়নের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠন করা হবে।

এসআরবির সদস্যদের পদমর্যাদার কাঠামো, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও চাকরির শর্তাবলি বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ইউনিটটির নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও নির্ধারিত পোশাক থাকবে। এছাড়া এসআরবির মহাপরিচালক হবেন কর্মরত কোনো পুলিশ কর্মকর্তা, যার পদমর্যাদা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নিচে হবে না।

বিল অনুযায়ী, র‌্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ, ব্যাংক স্থিতি, দায়-দায়িত্ব, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, নথিপত্র ও অন্যান্য দলিল এসআরবির কাছে হস্তান্তর করা হবে।

নতুন আইনের অধীনে বিধি প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত ২০০৫ সালের বিধির আওতায় র‌্যাব-সংক্রান্ত বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম ও আদালতের কার্যক্রম বহাল থাকবে। এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও সম্পত্তি জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হবে। ইউনিটটির অধীনে হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখারও বিধান রয়েছে। এছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ ও ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি নিষ্পত্তি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিটটির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, “মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও গুমের ঘটনায় কথিত সম্পৃক্ততার কারণে মানুষ এখনও র‌্যাবকে ভয় পায়।” যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই মাত্র চার কার্যদিবসের মধ্যে বিলটি পাসের সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানান।

বিরোধীদলীয় এই সংসদ সদস্য প্রশ্ন করেন, প্রস্তাবিত অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটির কাছে অভিযোগগুলোর যথাযথ প্রতিকার দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকবে কি না। তিনি কমিটির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতিকে রাখার প্রস্তাবও দেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, “আটক ব্যক্তিদের কোথায় রাখা হবে, বিলটিতে তা স্পষ্ট করা হয়নি।” এসআরবির সব স্থাপনা ও কার্যালয় গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করারও দাবি জানান তিনি।

নাজিবুর রহমান ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, “ওই ঘটনার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র‌্যাব বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরে খালেদা জিয়া র‌্যাবকে ‘ক্যানসার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং ২০২৪ সালে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে র‌্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক ব্যবস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র‌্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল।”

তার মতে, র‌্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি ও দায়-দায়িত্ব এসআরবির কাছে হস্তান্তরের অর্থ হলো ‘শুধু সাইনবোর্ড পরিবর্তন করা হচ্ছে’।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি ছিল। তবে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি কেউ করেনি। প্রস্তাবিত আইনে র‌্যাবের সদস্য, সুযোগ-সুবিধা, লজিস্টিকস ও জনবল বহাল রেখে শুধু নাম পরিবর্তনের বিষয়টি দেখা যাচ্ছে।” সরকারকে বিলটি প্রত্যাহার করে প্রথমে এ ধরনের একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা কেন রয়েছে, তা নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি।

বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “র‌্যাব বিলুপ্ত করা বিএনপির অঙ্গীকার ছিল। বিলটি বিলম্বিত করার অর্থ হবে র‌্যাবের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। সংসদীয় কমিটিতে বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জনমত দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও এটি রাখা হয়েছে। ইউনিটের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগের বিষয়গুলো অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি দেখবে। আইনটি পাস হওয়ার পর র‌্যাব বিলুপ্ত হবে। এরপর এসআরবি নামে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে র‌্যাবের কাছে থাকা সম্পদ ও সরঞ্জাম কোথাও না কোথাও হস্তান্তর করতেই হবে। কারণ এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। নতুন সংস্থার কাছে এসব হস্তান্তর করা হলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন করে কেনাকাটা করতে হবে না।”

বাংলাদেশ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর