ঢাকা, ২৫ অক্টোবর রোববার, ২০২০ || ১০ কার্তিক ১৪২৭
good-food
১৭৯

করোনা খুললো তৃতীয় চক্ষু

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৮:০৪ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০  

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ আশংকা, আতংক ও চরম বিপর্যয়ের নাম কোভিড-১৯। গোটা দুনিয়ার মানুষ এখন মৃত্যুতাড়িত হয়ে বেঁচে আছে। থমকে গেছে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতির চাকা। যেন আলো নিভে আসা প্রদীপ কিংবা অস্তগামী ক্লান্ত সূর্যের মতো বিপন্নতা ও অসহায়ত্বের রেখায় বিলীন হতে চলেছে সমগ্র মানবজাতি। 

 

প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। মারণঘাতী এ ভাইরাস যেন বিশ্ব সভ্যতা ও বিশ্ব মানবের জন্য চরম অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে। ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্তসহ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কেউই মুক্তি পাচ্ছেন না এ মৃত্যুর সমাবেশ থেকে। করোনাভাইরাসের ভয়ে আমরা এতটাই ভীত ও অসহায় হয়ে গেছি যে আমাদের আবেগ, বিবেক ও মানবতা সবই আজ বিপন্ন হয়ে গেছে।

 

হয়তো একটা ঘরে আক্রান্ত বাবা-মা, অন্য ঘরে তাদের শিশু সন্তান একা চিৎকার করে কাঁদছে। স্বামী আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন স্ত্রী তাকে স্পর্শ করেও দেখতে পারছেন না। বাবা-মা, ভাই-বোন অথবা অতি আপনজনের মৃত্যু হলেও তার সৎকার করতে আমরা ভয় পাচ্ছি। আমাদের আবেগ ও মানবতাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে এ ভাইরাস? 
দীর্ঘদিন লকডাউন থাকায় আমাদের অর্থনীতির চাকা একেবারে থমকে গেছে। স্থবির হয়ে আছে হাজারো জীবন ও জীবিকা। বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বব্যপী আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া। শিল্প কারখানাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন। অনেক দেশে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্প মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। 

 

রাজস্ব খাত ও অভিবাসন খাতে ব্যপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এমতাবস্থা চলতে থাকলে বৈদেশিক লেনদেনসহ অভ্যন্তরীণ বাজার, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নসহ অর্থনীতির সার্বিক অবকাঠামো অচল ও স্থবির হয়ে যাবে। তৈরি পোশাক এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোটেল ও পর্যটন, ক্যাপিটাল গুডস, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাউজিং ফিন্যান্স সংস্থা, রাসায়নিক (ক্যামিক্যাল), সোলার পাওয়ার, তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিসরে ব্যপক ক্ষতির সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।

 

এত অশনিসংকেত আর প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও গোটা মানবজাতি স্বপ্ন দেখে চলছে অবিরাম। হয়তো আবারো সুদিন আসবে পৃথিবীর একদিন! হয়তো আবারো জয় হবে মানবতার! মনুষ্য শক্তির কাছে পরাজয় হবে বৈরী প্রকৃতি। গোটা বিশ্ব আবারো একত্রিত হয়ে গাইবে স্রষ্টা ও সৃষ্টির জয়গান। কেননা, এত মৃত্যুর মিছিল বিপন্ন মানবতা আর হারানোর মর্মরে জর্জরিত এবং আহত হৃদয়ের বুক চিরে জন্ম নিয়েছে গভীর জীবনবোধ। গোটা মানবজাতি অনুধাবন করতে পেরেছে তৃতীয় চক্ষুর অস্তিত্ব। আবিষ্কার করতে পেরেছে প্রকৃতি ও মানবের মহা সত্য। মানুষ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছে। 

 

পার্থিব জীবনের সব লোভ-লালসা দূরে রেখে সবারই এখন একটাই প্রার্থনা ‘বেঁচে থাকা’। প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী, রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে কুলি ও দিনমজুরসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। জীবন বাঁচাতে কেউ এখন আর ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। ফলে, পাল্টে গেছে সারাদেশের দৃশ্যপট।  শিল্প কারখানা বন্ধ থাকায় কমে গেছে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা, কমে গেছে শব্দ দূষণ ও বাতাসে ক্ষতিকর সীসার পরিমাণ। প্রকৃতি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সকাল হলে এখন পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখোরিত হয় চারপাশ। দূষণমুক্ত নীল আকাশে দেখা যাচ্ছে নানা রঙের ঘুড়ির সমারোহ। এমন পরিবেশে রাজধানী ঢাকাকে আগে কখনো কেউ দেখেনি।

 

অধিকন্তু বর্জ্য নিঃসরণ কম থাকায় নদী ও সমুদ্রের পানি ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে। দর্শনার্থী শূন্য হয়ে পড়ায় আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ করে সমুদ্র সৈকতে জলজ প্রাণিরা তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। সাগরলতা ও গুল্মসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জে ভরে গেছে সাগরের তলদেশ।  বনভূমি উজাড় কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় বন্য প্রাণিগুলো খুঁজে পেয়েছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। এককথায় প্রকৃতি ঠিক তেমন অবস্থানই ফিরে পেয়েছে, যেমনটা তার কাম্য। 

 

সভ্যতার বিশীর্ণ কঙ্কালে ঝুলছিল যে মানবজাতি, সেও আজ চরম শিক্ষার মুখোমুখি। সভ্যতার বিধ্বংসী স্রোতে ভেসে শৃঙ্খলাহীন ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ যেন ছিটকে গিয়েছিল পারিবারিক বন্ধন থেকে। অর্থ ও আভিজাত্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে যে মানুষটি তার প্রিয়জনগুলোর কাছ থেকে দূরে চলে গিয়েছিল, সে-ও পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় পার করছে।  স্বামী-স্ত্রী-সন্তানাদিসহ সবাই মিলে পরিবারের সব কাজ একসঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। এতে করে পারিবারিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় হচ্ছে। এছাড়া মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় মুল্যবোধেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই এক মনে স্রষ্টার রহমত প্রার্থনা করছেন। 

 

মানুষ অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন পাপকর্ম থেকে বিরত থাকছেন। নিয়ন্ত্রিত ও মিতব্যয়ী জীবনযাপন করছেন। চুরি, ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়মূলক কাজ থেকে বিরত থাকছেন। পাশাপাশি নৈতিক চরিত্রেরও ব্যপক উন্নতি হয়েছে। সামাজিক ভেদাভেদ ও অর্থের অহমিকা ভুলে মানুষ একে অপরের কাছে বিনয়ী হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। মানুষের এ মানবিক বোধের জন্ম দিল কোভিড-১৯। উন্মোচন করে দিল সুপ্ত বিবেকের দ্বার। আর ক্ষয়িষ্ণু অন্তর্দৃষ্টির বুকে সংযোজন করে গেল এক তৃতীয় চক্ষুর আলো। এ পৃথিবী আমাদের বাসযোগ্য রাখতে হলে গোটা মানবজাতিকে এমনই নির্মল, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক হতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধচারণ করে নয় বরং সহায়ক শক্তি হয়ে কাজ করতে হবে। 

 

সম্পদের সীমিত ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানবসম্পদের লং লাস্টিং নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় মুল্যবোধে বিবেক সদা জাগ্রত রাখতে হবে। দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বন্য ও জলজ প্রাণির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।  এক কথায়, প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার ‘আপন আলয়’। আর তবেই না আমরা একটা সুস্থ, সুন্দর ও নির্মল পৃথিবীর জন্ম দিতে পারব। হাজারো দুঃখ, ব্যাথা আর হারানোর মর্মরে কোভিড-১৯ যেন খুলে দিয়ে গেলো মানুষের সুপ্ত বিবেকের দ্বার তথা- বিশ্ব মানবের এ ‘তৃতীয় চক্ষু’।

 

লেখক: আজমেরিনা শাহানি
সাবেক প্রথম রানার আপ, খুলনা বিভাগ, লাক্স আনন্দধারা মিস বাংলাদেশ ফটোজেনিক।