ঢাকা, ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০১৯ || ২৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
২৬৭

দুর্দিনের কাণ্ডারি, ক্লিন ইমেজ রাজনীতিকের চিরপ্রস্থান

প্রকাশিত: ২৩:২৯ ৩ জানুয়ারি ২০১৯  


খুব ছোটবেলায় এক আদর্শবাদী পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দেখে তিনি বড় হয়েছেন। শিখেছেনও হাতে-কলমে। সময় ১৯৫২। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাইআন্দোলনে উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান। বছরখানেক আগে সরকারি চাকরি ছেড়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম যোগ দিয়েছেন অধ্যাপনা পেশায়। শুরু করেছেন ওকালতিও। সর্বদলীয় অ্যাকশন কমিটির সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একই বছর তার ঘর আলোকিত হয় এক পুত্র সন্তানের আগমনে। নাম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ছোট বেলাতেই সৈয়দ আশরাফ দেখেছেন রাজনীতিবিদ পিতার ব্যস্ততা।

আর তাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের রাজনীতিতে আসা কোনো বিস্ময়কর ঘটনা ছিল না।

ছোট বেলা থেকেই সৈয়দ আশরাফ দেখেছেন রাজনীতির জন্য কিভাবে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। পিতাকে দেখে তিনি বুঝেছিলেন সততা আর বিশ্বাস কখনও পরাজিত হয় না। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই রাজনীতিতে অভিষেক হয় সৈয়দ আশরাফের। ছাত্রলীগেই তার রাজনীতির হাতেখড়ি। স্বাধীনতার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। এরআগে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ইতিহাস সরল পথে চলেনি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও তার সহযোদ্ধারা। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা বসে ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আঘাত হানে তারা। সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতা হাত মেলান খুনিদের সঙ্গে। বারবার চাপ দেয়া হয় জাতীয় চার নেতাকে। কিন্তু তারা আপোষ করেননি। পরিণতিতে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় তাদের।

আর কারাগারেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা - সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে। সে সময়কার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই কয়েক মাস আগে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগে সবাই মোশ্‌তাক হয় নাই। সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অনেকেই নিজের জীবন দিয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বাস রক্ষা করেছিলেন।

১৯৭৫ সালে পিতাকে হারানোর পর বিলাতে চলে যান সৈয়দ আশরাফ। সেখানে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে সক্রিয় হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। অংশ নেন ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে। সপ্তম সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারে তিনি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাজনৈতিক জীবনে সৈয়দ আশরাফ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জরুরি জমানায়। শেখ হাসিনার জন্য তখন বৈরী সময়। এক পর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তারও হন।

নেতাদের একটি অংশ রাজনীতি থেকে তাকে মাইনাসে তৎপর। পর্দার অন্তরালে সক্রিয় কুশীলবরা। এ পর্যায়ে জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মিলে দলীয় সভানেত্রীর পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন আশরাফ। আবদুল জলিল গ্রেপ্তার হলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। দেন-দরবার চালাতে থাকেন সভানেত্রীর পক্ষে। এক পর্যায়ে পিছু হটে কুশীলবরা। মুক্তি পান শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়েও সক্রিয় ভূমিকা ছিল সৈয়দ আশরাফের। দায়িত্ব পান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর।

২০০৯ সালে কাউন্সিলে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পরপর বিডিআর বিদ্রোহের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় সরকারকে। সৈয়দ আশরাফের তখনকার ভূমিকাও প্রশংসনীয়। এরপর প্রতিটি ক্রাইসিস মুহূর্তেই তিনি রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। হেফাজতের ঢাকা অবস্থান ঘিরে চারদিকে যখন অস্থিরতা সৈয়দ আশরাফ উচ্চারণ করেন কঠোর হুঁশিয়ারি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাখেন অগ্রণী ভূমিকা।

‘একতরফা’ নির্বাচন প্রশ্নে বিদেশিদের চাপ মোকাবিলায়ও তিনি ছিলেন সক্রিয়। পশ্চিমা প্রভাবশালী কূটনীতিকদের সমালোচনায় প্রায়শ মুখর হন তিনি। সৈয়দ আশরাফ সাধারণত মিডিয়া বিমুখ। কথা বলেন কম। তবে যখন যা বলেন তা গুরুত্ব পায়। প্রায়শ দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন তিনি। খাই খাই স্বভাব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান বারবার। ১৫ আগস্টের ঘটনার যেন কোনো পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য কর্মীদের সজাগ থাকতে বলেন তিনি।

দু’য়েকটি সমালোচনা উতরে সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল চরিত্র। তার ক্লিন ইমেজে কখনও তিনি কালিমা পড়তে দেননি।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্য তিন জাতীয় নেতার সাথে আশরাফুলের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছিল। পিতার মৃত্যুর পর সৈয়দ আশরাফুল যুক্তরাজ্যে চলে যান। তারপর ১৯৯৬ সালে আশরাফুল দেশে ফিরে আসেন এবং জুন ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ২০০১ সালে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রীসভা গঠিত হলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনরায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৫ সালের ৯ জুলাই তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করেন। এক মাস এক সপ্তাহ দপ্তরবিহীন মন্ত্রী থাকার পর ১৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজের অধীনে রাখা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন।

ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ আশরাফুল ব্রিটিশ ভারতীয় শীলা ঠাকুরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শীলা লন্ডনে শিক্ষকতা করতেন এবং ২৩ অক্টোবর ২০১৭ সালে তিনি মৃত্যুবরন করেছেন। তাদের একটি মেয়ে রয়েছে (রীমা ঠাকুর), যে লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন।

২৪ অক্টোবর ২০১৭ সালে সৈয়দ আশরাফুলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি প্রায়ই অসুস্থ হন। তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। অবশেষে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ব্যাংককের হাসপাতালে কয়েক মাস ধরে চিকিৎসাধীন সৈয়দ আশরাফ বৃহস্পতিবার রাতে মারা গেছেন।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ জনপ্রশাসন মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগে সভাপতিমণ্ডলীতেও ছিলেন।

৬৮ বছর বয়সী সৈয়দ আশরাফ ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে থেকেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৩ নৌকার প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার সকালে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। পরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী জানান, শপথের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন এই সংসদ সদস্য।

তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।

অত্যন্ত সাদামাটা জীবনের অধিকারী সৎ রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

 

 

 

 

 

দুর্দিনের কাণ্ডারি, ক্লিন ইমেজ রাজনীতিকের চিরপ্রস্থান

খুব ছোটবেলায় এক আদর্শবাদী পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দেখে তিনি বড় হয়েছেন। শিখেছেনও হাতে-কলমে। সময় ১৯৫২। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাইআন্দোলনে উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান। বছরখানেক আগে সরকারি চাকরি ছেড়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম যোগ দিয়েছেন অধ্যাপনা পেশায়। শুরু করেছেন ওকালতিও। সর্বদলীয় অ্যাকশন কমিটির সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একই বছর তার ঘর আলোকিত হয় এক পুত্র সন্তানের আগমনে। নাম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ছোট বেলাতেই সৈয়দ আশরাফ দেখেছেন রাজনীতিবিদ পিতার ব্যস্ততা।

আর তাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের রাজনীতিতে আসা কোনো বিস্ময়কর ঘটনা ছিল না।

ছোট বেলা থেকেই সৈয়দ আশরাফ দেখেছেন রাজনীতির জন্য কিভাবে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। পিতাকে দেখে তিনি বুঝেছিলেন সততা আর বিশ্বাস কখনও পরাজিত হয় না। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই রাজনীতিতে অভিষেক হয় সৈয়দ আশরাফের। ছাত্রলীগেই তার রাজনীতির হাতেখড়ি। স্বাধীনতার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। এরআগে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ইতিহাস সরল পথে চলেনি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও তার সহযোদ্ধারা। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা বসে ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আঘাত হানে তারা। সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতা হাত মেলান খুনিদের সঙ্গে। বারবার চাপ দেয়া হয় জাতীয় চার নেতাকে। কিন্তু তারা আপোষ করেননি। পরিণতিতে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় তাদের।

আর কারাগারেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা - সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে। সে সময়কার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই কয়েক মাস আগে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগে সবাই মোশ্‌তাক হয় নাই। সবাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অনেকেই নিজের জীবন দিয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বাস রক্ষা করেছিলেন।

১৯৭৫ সালে পিতাকে হারানোর পর বিলাতে চলে যান সৈয়দ আশরাফ। সেখানে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে সক্রিয় হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। অংশ নেন ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে। সপ্তম সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারে তিনি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাজনৈতিক জীবনে সৈয়দ আশরাফ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জরুরি জমানায়। শেখ হাসিনার জন্য তখন বৈরী সময়। এক পর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তারও হন।

নেতাদের একটি অংশ রাজনীতি থেকে তাকে মাইনাসে তৎপর। পর্দার অন্তরালে সক্রিয় কুশীলবরা। এ পর্যায়ে জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মিলে দলীয় সভানেত্রীর পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন আশরাফ। আবদুল জলিল গ্রেপ্তার হলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। দেন-দরবার চালাতে থাকেন সভানেত্রীর পক্ষে। এক পর্যায়ে পিছু হটে কুশীলবরা। মুক্তি পান শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়েও সক্রিয় ভূমিকা ছিল সৈয়দ আশরাফের। দায়িত্ব পান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর।

২০০৯ সালে কাউন্সিলে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পরপর বিডিআর বিদ্রোহের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় সরকারকে। সৈয়দ আশরাফের তখনকার ভূমিকাও প্রশংসনীয়। এরপর প্রতিটি ক্রাইসিস মুহূর্তেই তিনি রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। হেফাজতের ঢাকা অবস্থান ঘিরে চারদিকে যখন অস্থিরতা সৈয়দ আশরাফ উচ্চারণ করেন কঠোর হুঁশিয়ারি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাখেন অগ্রণী ভূমিকা।

‘একতরফা’ নির্বাচন প্রশ্নে বিদেশিদের চাপ মোকাবিলায়ও তিনি ছিলেন সক্রিয়। পশ্চিমা প্রভাবশালী কূটনীতিকদের সমালোচনায় প্রায়শ মুখর হন তিনি। সৈয়দ আশরাফ সাধারণত মিডিয়া বিমুখ। কথা বলেন কম। তবে যখন যা বলেন তা গুরুত্ব পায়। প্রায়শ দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন তিনি। খাই খাই স্বভাব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান বারবার। ১৫ আগস্টের ঘটনার যেন কোনো পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য কর্মীদের সজাগ থাকতে বলেন তিনি।

দু’য়েকটি সমালোচনা উতরে সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল চরিত্র। তার ক্লিন ইমেজে কখনও তিনি কালিমা পড়তে দেননি।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্য তিন জাতীয় নেতার সাথে আশরাফুলের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছিল। পিতার মৃত্যুর পর সৈয়দ আশরাফুল যুক্তরাজ্যে চলে যান। তারপর ১৯৯৬ সালে আশরাফুল দেশে ফিরে আসেন এবং জুন ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ২০০১ সালে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রীসভা গঠিত হলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনরায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৫ সালের ৯ জুলাই তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করেন। এক মাস এক সপ্তাহ দপ্তরবিহীন মন্ত্রী থাকার পর ১৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজের অধীনে রাখা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন।

ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ আশরাফুল ব্রিটিশ ভারতীয় শীলা ঠাকুরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শীলা লন্ডনে শিক্ষকতা করতেন এবং ২৩ অক্টোবর ২০১৭ সালে তিনি মৃত্যুবরন করেছেন। তাদের একটি মেয়ে রয়েছে (রীমা ঠাকুর), যে লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন।

২৪ অক্টোবর ২০১৭ সালে সৈয়দ আশরাফুলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি প্রায়ই অসুস্থ হন। তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। অবশেষে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ব্যাংককের হাসপাতালে কয়েক মাস ধরে চিকিৎসাধীন সৈয়দ আশরাফ বৃহস্পতিবার রাতে মারা গেছেন।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ জনপ্রশাসন মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগে সভাপতিমণ্ডলীতেও ছিলেন।

৬৮ বছর বয়সী সৈয়দ আশরাফ ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে থেকেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৩ নৌকার প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার সকালে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। পরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী জানান, শপথের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন এই সংসদ সদস্য।

তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।

অত্যন্ত সাদামাটা জীবনের অধিকারী সৎ রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


এই বিভাগের আরো খবর