ঢাকা, ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
good-food

মিথ্যা বললে শরীরের যত ক্ষতি হয়

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৪৬ ২০ আগস্ট ২০২৬  

দৈনন্দিন জীবনে শান্তি বজায় রাখা বা কাউকে খুশি করার জন্য ছোটখাটো মিথ্যা বলা অনেকের কাছেই এক সাধারণ প্রবৃত্তি। সাইকোলজিটুডে ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার তথ্যানুসারে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১০ মিনিটের একটি সাধারণ কথোপকথনে গড়ে দুই থেকে তিনটি ছোটখাটো মিথ্যা বলে থাকেন। তবে প্রথম দেখায় এই অসততাকে ক্ষতিকর মনে না হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।

প্রতিটি মিথ্যার সঙ্গে মগজ ও স্নায়ুতন্ত্র তীব্র মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়। হরমোন ও স্নায়ুবিশেষজ্ঞদের মতে, অবচেতনে নিয়মিত মিথ্যা বলার অভ্যাস শরীরে দীর্ঘমেয়াদী ও মারাত্মক রোগ ব্যাধির সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অসততা বা ধূর্ততা কেবল নৈতিক স্খলন নয়, এটি মানুষের আয়ু কমিয়ে দেওয়ার মতো এক নীরব শারীরিক সংকট।

উৎকণ্ঠিত মগজ

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ও আচরণগত বিজ্ঞানী বিল সালিভান বলেন, “মানুষের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই সততা এবং সত্য প্রকাশের সময় বেশি শিথিল বা ‘রিল্যাক্সড’ থাকে। তবে যখনই কেউ কোনো মিথ্যা বা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন, তখন মস্তিস্কের ‘অ্যামিগডালা’ এবং ‘লিম্বিক সিস্টেম’ নামক অংশটি তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই লিম্বিক সিস্টেমটি মূলত শরীরের অদৃশ্য ভয় বা কোনো বড় হুমকি শনাক্ত করার কাজ করে।”

তিনি আরও বলেন, “মস্তিস্কের ‘ইমেজ স্ক্যান’ পরীক্ষায় দেখা গেছে, সত্য বলার সময় মগজের এই অংশ একদম শান্ত থাকলেও, একটি মিথ্যা বলার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মগজ আতশবাজির মতো তীব্র সংকেতে কেঁপে ওঠে। এই তীব্র স্নায়বিক উত্তেজনা মানুষের সাধারণ বিচারবুদ্ধি ধসিয়ে দেয়।”

‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ মোড ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি

মিথ্যা বলাকে মস্তিস্ক এক ধরনের বড় বিপদ বা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে, কারণ সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ সবসময় নিজের সততার ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে চায়। ফলে মিথ্যা বলার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে এক অদৃশ্য ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ বা ‘হয় বাঁচ নয় মরো’ অবস্থা চালু হয়ে যায়।

ডা. বিল সালিভান বলেন, “চিকিৎসা গবেষণার এক বিশদ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে অসৎ বা ‘ডাবল লাইফ’ বা দ্বৈত জীবন যাপন করলে রক্তে প্রতিনিয়ত ক্ষতিকর স্ট্রেস বা চাপের হরমোন নিঃসরণ হতে থাকে। এর ফলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং হৃদস্পন্দনের গতি বাড়ার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গ্যাস্ট্রিকের গোলযোগ ও ‘অন্ত্র-মস্তিষ্ক’ সংকট

অনেকের ক্ষেত্রে তীব্র দুশ্চিন্তা বা মিথ্যা বলার ঠিক পরপরই পেট মোচড়ানো, বমি বমি ভাব বা তীব্র অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. কারা গ্রস মারগোলিস ব্যাখ্যা করেন, “মানুষের পরিপাকতন্ত্রের সঙ্গে মস্তিস্কের একটি সরাসরি দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘গাট-ব্রেন এক্সিস’ বলা হয়। মিথ্যার কারণে তৈরি হওয়া তীব্র ভয় ও আতঙ্ক এই স্নায়বিক অক্ষের মাধ্যমে সরাসরি পাকস্থলীতে গিয়ে আঘাত করে। ফলে পরিপাক ক্রিয়া ব্যাহত হয়ে, তীব্র পেটের গোলযোগ দেখা দেয়।”

মিথ্যার প্রতি মস্তিষ্কের ক্ষতিকর সহনশীলতা

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের স্নায়ুবিজ্ঞানী তালি শারোট এক গবেষণায় দেখিয়েছেন- মানুষ যত বেশি মিথ্যা বলে, মস্তিস্কের লিম্বিক সিস্টেমের তীব্র প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে তত কমতে শুরু করে। অর্থাৎ, মগজ আস্তে আস্তে এই ধূর্ত আচরণের প্রতি এক ধরনের ক্ষতিকর সহনশীলতা বা অভ্যাসে রূপান্তর করে নেয়। ফলে ছোট ছোট মিথ্যা এক সময় মানুষের অবচেতনে অনেক বড় বড় অপরাধ বা প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার পথকে সহজ করে তোলে।

পরামর্শ

মিথ্যা বলার পর মুখের ভেতর শুকিয়ে যাওয়া, কণ্ঠস্বর কাঁপা বা হাত ঘামার মতো বাহ্যিক লক্ষণগুলো এড়ানো গেলেও, হরমোনের অভ্যন্তরীণ ক্ষতিগুলো এড়ানো যায় না। তাই একটি সুস্থ পরিপাকতন্ত্র, কর্মক্ষম হৃদযন্ত্র ও তরুণ মস্তিস্ক ধরে রাখার কৌশল হল, প্রতিদিনের জীবনে সততা বজায় রাখা এবং মানসিক চাপের নিম্নমুখীতা থেকে শরীরকে রক্ষা করা। পাশাপাশি শরীরের অভ্যন্তরীণ দূষণ ও মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর