ঢাকা, ০৫ আগস্ট বুধবার, ২০২০ || ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
good-food
৮৩

বাচ্চারা কিছু গিলে ফেললে কী করবেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২৩:৫২ ২৭ জুলাই ২০২০  

করোনা মহামারিতে উভয়সঙ্কটে আছেন শিশুর বাবা-মায়েরা। টানা ৪-৫ মাস বাড়িতে বন্দি থেকে অস্থির হয়ে উঠছে তারা। অথচ অতীতে ব্যস্ত সময় কাটতো তাদের। অনলাইন ক্লাস এবং হোমওয়ার্ক বাদে দিনের বাকি সময় দুষ্টুমি করছে শিশুরা। 
ছোটদের নানা দুষ্টুমি অনেক সময় ভয়ানক বিপদ ডেকে আনছে। নতুন কোনও জিনিস দেখলেই দেড়-দুই বছরের শিশুদের চেখে দেখতে ইচ্ছে করে। লুডোর গুটি, কলমের ক্যাপ, পয়সা বা খেলনার ভাঙা অংশ মুখে ঢুকিয়ে দিতে পারে। 
এসব শ্বাসনালীতে আটকে তাদের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সমস্যা দেখা দিতে পারে তাড়াহুড়ো করে খেতে গেলে কিংবা শুকনো খাবার গলায় আটকে গিয়ে। 
এসব সমস্যার সমাধান দিয়েছেন ভারতীয় শিশু বিশেষজ্ঞ সৌমিত্র দত্ত। তার মতে, এরকম হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তবে কোভিড-১৯ আবহে চিকিৎসাকেন্দ্রের এমার্জেন্সি সার্ভিস পেতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে। 
কয়েক বছর আগে ঠিক এরকম ঘটনার শিকার হয় ভারতের নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র আরিয়ান দত্ত (১১)। বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দ্রুত স্যান্ডউইচ খেতে গিয়ে গলায় আটকে দম বন্ধ হয়ে মারা যায় সে।
সৌমিত্র জানান, গলায় কিছু আটকে শ্বাস নেয়ার সমস্যা হলে কীভাবে চিকিৎসা করা হবে তা নির্ভর করে শিশুর বয়সের ওপর। খুব ছোট শিশু দুধ বা তরল খাবার খেতে গিয়ে দম আটকে যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাকে মাথা কিছুটা নিচু করে উপুড় করে শুইয়ে পিঠে চাপড় মারলে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হবে। অনেক সময় শ্বাসনালীতে খাবার আটকে গেলে শিশু কাঁদতে বা কথা বলতে পারে না। এ অবস্থায় ওকে কাশতে বলতে হবে। 
তিনি বলেন, কাশলে অনেক সময় গলায় আটকে থাকা খাবার বেরিয়ে যায়। শ্বাসনালীতে খাবার আটকে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে হেইমলিচ ম্যানিউভার পদ্ধতিতে পাঁজরের নীচে ধাক্কা দিলে খাবার বেরিয়ে আসে। তবে জানা না থাকলে সেই চেষ্টা করে সময় নষ্ট না করে দ্রুত শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।

দেশটির আরেক শিশু বিশেষজ্ঞ মৌপিয়া চক্রবর্তী জানান, গলায় লুডোর গুটি, পেনের ঢাকনা বা এরকম শক্ত কিছু আটকে গেলে শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ব্রঙ্কোস্কোপি করে শ্বাসনালি থেকেতা বের করতে হবে। তদুপরি, খেতে বসে কথা বলতে নেই। ঠাকুমা-দিদিমাদের এ কথাকে আধুনিক মানুষ আমলই দেন না।
ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতিটি নিয়মের পিছনেই অকাট্য বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি আছে। খেতে বসে কথা বলা উচিতই নয়, পাউরুটি বা বিস্কুটের মতো শুকনো খাবার খেলে সঙ্গে দুধ, সুপ বা জল রাখা উচিত বলে মনে করেন মৌপিয়া।
চিকিৎসক সৌমিত্র দত্ত জানান, খেতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করলে শুধু শিশুরাই বিপদে পড়ে তা নয়, বড়দের জন্যও তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আমরা অনেকেই ফুটবলপ্রেমী সুব্রত মুখোপাধ্যায় নামাঙ্কিত সুব্রত কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সঙ্গে পরিচিত। অথচ এ ফুটবলপ্রেমী মানুষটি মাত্র ৪৯ বছর বয়সে আকস্মিক গলায় খাবার আটকে মারা যান।
খাবারের টুকরো গিলতে গিয়ে বিষম খেয়ে কিংবা ফরেন বডি গলা দিয়ে শ্বাসনালীতে আটকে গিয়ে প্রাণঘাতী সমস্যা হয়। শ্বাসনালীতে কিছু আটকে গেলে ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। ফলে নিঃশ্বাসের কষ্ট বাড়ে, সেই সঙ্গে কাশি শুরু হয়। 
শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ার ডাক্তারি নাম অ্যাস্পিক্সিয়া। শ্বাসনালী একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে অক্সিজেন সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে অক্সিজেনের অভাবে কাজ করতে পারে না হার্ট ও ব্রেন। শরীরের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে অবিলম্বে কৃত্রিম উপায়ে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ শুরু করা দরকার। তা নাহলে রোগীকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে পড়ে।
অনেক সময় শিশুরা খেলার ছলে ছোটখাটো কিছু নাকে বা মুখে ঢুকিয়ে ফেললে একই সমস্যা হয়। ঠিক ৪ বছরের ছোট্ট মেয়ে পাপড়ির হয়েছিল। খেলতে খেলতে পেনের ক্যাপ গিলে ফেলে। তবে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে শিশুটাকে বাঁচানো যায়নি। 
অনেক সময় ছোটখাটো জিনিস নাকে ঢুকিয়ে দিলে চট করে বোঝা যায় না। শিশুরাও বলতে ভয় পায় বা বলতে পারে না। তারা হোক বা বয়স্ক মানুষ, গলায় কিছু আটকে গেলে কয়েকটা লক্ষণ দেখা দেয়। ফলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার জন্যে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। 
মনে রাখবেন, এক্ষেত্রে সময়ের দাম অনেক বেশি। সময় নষ্ট করলে জীবন দিয়ে দাম দিতে হবে। শ্বাসনালীতে কিছু আটকে গেলে প্রথমেই মানুষটির নিঃশ্বাসের কষ্ট হবে। এজন্য কাশি হবে, বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ, বমি বা বমি বমি ভাব, কথা বলতে না পারা, অক্সিজেন ইনটেক একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে রোগীর ঠোঁট নীল হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। 
এরকম লক্ষণ দেখলে দেরি না করে শিগগির হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন সৌমিত্র।
করোনার সময়ে শিশুদের দিকে একটু বাড়তি নজর রাখতে হবে। দেড়-দু’বছরের বাচ্চা বাড়িতে থাকলে তার হাতের কাছে ছোটখাটো জিনিস না রাখাই ভালো। খাওয়ানোর সময় বেশি তাড়াহুড়ো করবেন না, জোর করে শিশুর মুখে খাবার গুঁজে দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করার চেষ্টা করবেন না।