ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর রোববার, ২০১৯ || ৭ আশ্বিন ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
২৭৪

উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করে দেব—জাতির কাছে শেখ হাসিনার ওয়াদা

প্রকাশিত: ১৩:৪৫ ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত


আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় তিনি বলেন, আমি নিজে এবং দলের পক্ষ থেকে আমাদের যদি কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে, সেগুলো ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য দেশবাসী আপনাদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি কথা দিচ্ছি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আরও সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব।দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নৌকায় ভোট দিন, আমরা আপনাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করে দেব—এটা আমাদের জাতির কাছে ওয়াদা।’


ইশহেতার ঘোষণার পর শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কথায় নয়, সবসময় কাজে বিশ্বাস করি। আমাদের এবারের অঙ্গীকার, আমরা টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করব। এটা সবার কাছে স্পষ্ট যে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে জনগণ কিছু পায়, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও সমৃদ্ধির সকল সুযোগ এবং সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাঙ্ক্ষিত ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব ইনশা আল্লাহ।


শেখ হাসিনা বলেন, আমি একটি কথা এখানে বলতে চাই যে, আমার কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। পরিবার-পরিজনকে হারিয়ে আমি রাজনীতি করছি শুধু জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, এ দেশের মানুষের উন্নয়নের জন্য। এ দেশের সাধারণ মানুষ যাতে ভালোভাবে বাঁচতে পারে, উন্নত জীবন পায়, তাদের জীবনটাকে আরও উন্নত করার জন্য এটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য, একমাত্র কামনা। যে আদর্শ নিয়ে জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই আদর্শ আমি বাস্তবায়ন করতে চাই। আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী আমরা সাড়ম্বরে পালন করব। 

 

আরও পড়ুনঃ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না খালেদা জিয়া

 

 


দেশবাসীর কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী কোনো শক্তি এ সময় ক্ষমতায় থাকলে, তা হবে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গ্লানিকর। তাই আগামী ৩০ তারিখে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আবার আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করুন।


ইশতেহার ঘোষণার শুরুতে শেখ হাসিনা বলেন, আজকের বাংলাদেশ আর্থিক দিক থেকে যেমন শক্তিশালী, তেমনি মানসিকতার দিক থেকে অনেক বলীয়ান। ছোটখাটো অভিঘাত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কখনো থামিয়ে রাখতে পারবে না। দারিদ্র্যের হার যেখানে ২০০৬ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেখানে আজকে ২১ দশমিক ৮ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। আমাদের দেশে মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালে যেখানে ৫৪৩ মার্কিন ডলার ছিল, সেখানে ১৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক রিজার্ভ তিন বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওপর। ২০১৫ সালে বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছে। 

 

আওয়ামী লীগের ইশতেহার
 
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উন্নয়নের সঙ্গে নিজ সরকারের উন্নয়নের তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের মধ্যে ৩১ তম। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১০ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

 


আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে যা কিছু মহৎ অর্জন ও প্রাপ্তি, সবকিছু অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার আগে তিনি আগে মাত্র সাড়ে তিন বছর পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপরিচালনা করার। শূন্য কোষাগার, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্ধ কল-কারখানা নিয়ে জাতির পিতা পথচলা শুরু করেছিলেন। এক কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল এক দুরূহ কাজ। তার ওপর শুরু হয় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দেশি ও বিদেশি চক্রান্ত। তাঁর হত্যার পর ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশি শাসকেরা বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল, ভিক্ষুকের দেশে পরিণত করেছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৯ সাল এ সময় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে। বাংলাদেশ মানেই ছিল, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, কঙ্কালসার মানুষের দেশ।

 

আরও পড়ুনঃ  ২১ ‘বিশেষ’ ২১ অঙ্গীকার নিয়ে আসছে আওয়ামী লীগের ইশতেহার


আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বলেন, ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২১ বছর পর আবার বাংলাদেশের মানুষ মুক্তির স্বাদ পায়। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল, এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মানুষের জন্য স্বর্ণ যুগ। আর্থসামাজিক খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে।


২০০১ সালের আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালের ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে অশুভ শক্তি। ২০০১ পরবর্তী পাঁচ বছর ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এ দেশের সাধারণ মানুষের এক বিভীষিকাময় সময়। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস—জনজীবন ছিল অতিষ্ঠ। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, খুলনার অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, নাটোরের মমতাজ উদ্দিনসহ ২১ হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে হত্যা করে হাওয়া ভবন তৈরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও পাচার করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাই, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদসহ নানা ধরনের জঙ্গিগোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়। রমনা বটমূলে নববর্ষের অনুষ্ঠান, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমাবেশ ও পল্টনে সিপিবির সমাবেশ বোমা হামলা। সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান ও সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে বোমা হামলা করে হত্যাচেষ্টা এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৫০০ স্থানে একযোগে বোমা হামলা, একই বছর গাজীপুরে বোমা মেরে ১০ জনকে হত্যা, শরীয়তপুরে দুই বিচারকসহ সারা দেশে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে এসব জঙ্গিগোষ্ঠী।

 


গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী লীগের র্যাললিতে নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রাণে রক্ষা পেলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয় এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়, আহতদের অনেকেই এখনো অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় দিন যাপন করে যাচ্ছে। নিজ দলের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সাতটি বছর অতিক্রম করে ২০০৯ সাল থেকে আমরা আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছি। একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আবারও সমৃদ্ধির, অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ, স্লোগান সংবলিত নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আমরা আমাদের ইশতেহার এমনভাবে তৈরি করেছিল যাতে আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারি। একই সঙ্গে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো ধারাবাহিকতা ২০১৮-এর নির্বাচনে ইশতেহারেও সংরক্ষিত রয়েছে।

 

 

আরও পড়ুনঃ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ‘বৈপ্লবিক’: ফখরুল


ইশতেহারে ২১টি অঙ্গীকার উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো-


১. আমার গ্রাম, আমার শহর- প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ
২. তারুণ্যের শক্তি-বাংলাদেশের সমৃদ্ধি: তরুণ যুব সমাজকে দক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তরিত করা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা।
৩. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ
৪. নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা ও শিশুকল্যাণ
৫. পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা,
৬. সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল
৭. মেগা প্রজেক্টগুলোর দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন
৮. গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা
৯.  দারিদ্র্য নির্মূল
১০ সকল স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি
১১. সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা
১২. সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার
১৩.  বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা
১৪. আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা- লক্ষ্য যান্ত্রিকিকরণ
১৫. দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন
১৬. জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা
১৭ ব্লু ইকোনোমি- সমুদ্র সম্পদ উন্নয়ন
১৮.  নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা
১৯ . প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও অটিজম কল্যাণ
২০. টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ
২১. সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি

 

আরও পড়ুনঃ১৪টি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ঘোষণা


এই বিভাগের আরো খবর