ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ৩০ মাঘ ১৪৩২
good-food
১০

কখন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৩:১৩ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

নির্বাচন মানেই শুধু পোস্টার, মাইক, শোভাযাত্রা আর প্রতিশ্রুতির বন্যা নয়। নির্বাচন মানে এক অদৃশ্য হিসাবও—সংখ্যার হিসাব, সমর্থনের হিসাব, বিশ্বাসের হিসাব। আজ চলছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। জয়ের জন্য লড়ছেন অনেক প্রার্থী। আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রার্থীর পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি কঠোর নিয়ম, জামানতের নিয়ম।

বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রত্যেক প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা নিরাপত্তা জামানত জমা দিতে হয়। এই টাকাটা কোনো ফি নয়, আবার দানও নয়। এটি এক ধরনের প্রতিশ্রুতি—আমি লড়াইয়ে আছি, আমি ভোট চাই, এবং আমার পেছনে ন্যূনতম জনসমর্থন আছে—এই ঘোষণার প্রতীক।

ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে নারী ভোটাররা। ছবি: দেশকাল দেশকাল নিউজ ডটকম

কিন্তু ভোটের দিন শেষ হলে আসল পরীক্ষা শুরু হয়। ধরুন একটি আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে দুই লাখ। সেখানে একজন প্রার্থী যদি অন্তত ১২.৫ শতাংশ ভোট অর্থাৎ ২৫ হাজার ভোট না পান, তাহলে তার সেই ৫০ হাজার টাকা আর ফেরত আসবে না। আইন বলছে, মোট বৈধ ভোটের আট ভাগের এক ভাগের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। সহজ ভাষায়, ৮ ভাগের ১ ভাগ—এই সীমা পার হতে না পারলে টাকা যাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।

এই নিয়মটা কেন? অনেকেই ভাবেন, এটা কি শুধু টাকার প্রশ্ন? আসলে না। এটি জনপ্রিয়তার ন্যূনতম মানদণ্ড। নির্বাচন কমিশন এবং প্রচলিত Representation of the People Order (RPO) এই শর্ত রেখেছে যাতে কেউ কেবল নামমাত্র প্রার্থী হয়ে 
ব্যালটপেপার ভরিয়ে না ফেলতে পারে। গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পেছনে বাস্তব সমর্থনও থাকতে হবে—এই দর্শন থেকেই এই বিধান।

ভোট দিয়েছেন শেরপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা। ছবি: দেশকাল নিউজ ডটকম

একটা উদাহরণ ভাবা যাক। কোনো এলাকায় পাঁচজন প্রার্থী লড়ছেন। চারজন বড় দল বা শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী, আর একজন কেবল পরিচিতি বাড়ানোর জন্য দাঁড়ালেন। ভোট শেষে দেখা গেল তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ভোট, যেখানে মোট ভোট পড়েছে ১ লাখ। শতাংশের হিসাবে সেটা ৩ শতাংশ। এই অবস্থায় আইন তাকে বলে—আপনি লড়েছেন, কিন্তু জনগণের ন্যূনতম সমর্থন পাননি। ফলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।

আবার এমনও হয়, একজন জেতেননি, কিন্তু ১৫ বা ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তিনি পরাজিত, কিন্তু তার জামানত ফেরত পাবেন। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন, এই এলাকার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তাকে চায়।

গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক প্রার্থী এই ১২.৫ শতাংশের সীমা পার হতে পারেননি। বিশেষ করে স্বতন্ত্র বা ছোট দলের প্রার্থীদের বড় একটি অংশ তাদের জামানত হারিয়েছেন। ফলে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তাও—আপনার অবস্থান কতটা দৃঢ়, ভোটাররা আপনাকে কতটা গ্রহণ করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই একই নিয়ম কার্যকর থাকবে। ব্যালট বাক্স বন্ধ হওয়ার পর শুধু কে জিতলেন, কে হারলেন, সেই হিসাবই নয়; আরেকটি নীরব তালিকা তৈরি হবে—কারা জামানত রক্ষা করলেন, আর কারা হারালেন।

গণতন্ত্রে ভোটই শেষ কথা। কিন্তু সেই ভোটের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আরেকটি বিচার, আপনি কেবল প্রার্থী ছিলেন, নাকি সত্যিই মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার মতো সমর্থন অর্জন করেছিলেন। ৮ ভাগের ১ ভাগ—সংখ্যাটা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু অনেকের জন্য সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় দেয়াল।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর