ঢাকা, ২৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০২০ || ১২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭
good-food
১১৫

রাসেলের আর্তি টলাতে পারেনি খুনি পাষাণদের মন

কানাই চক্রবর্তী

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৪:৪৬ ১৮ অক্টোবর ২০২০  

আল্লাহর দোহাই দিয়ে না মারার জন্য খুনিদের কাছে আর্তি জানিয়েছিলেন শেখ রাসেল। চিৎকার করে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর দোহাই আমাকে জানে মেরে ফেলবেন না। বড় হয়ে আমি আপনাদের বাসায় কাজের ছেলে হিসেবে থাকব। আমার হাসু আপা দুলাভাইয়ের সঙ্গে জার্মানিতে আছেন। আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, দয়া করে আপনারা আমাকে জার্মানিতে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিন।

 

সেদিন রাসেলের এ আর্তচিৎকারে স্রষ্টার আরশ কেঁপে উঠলেও টলাতে পারেনি পাষাণ হৃদয়ের খুনিদের মন। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো এ নিষ্পাপ শিশুকেও ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে তারা।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই রাসেল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। বেঁচে থাকলে তিনি আজ (রোববার) ৫৭ বছরে পা দিতেন। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে রাসেলকে এভাবেই নৃশংস হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। 

 

তিনি উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য খুন হওয়ার পর রাসেল দৌড়ে নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো বাড়ির কাজের লোকজনের কাছে আশ্রয় নেয়। পরিবারটির দীর্ঘকাল দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আবদুর রহমান রমা তখন তার হাত ধরে রেখেছিলেন। রমা ’৬৯ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর পরিবারে কাজ করতেন, ’৭১-এ ওই পরিবারের সঙ্গে ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী তিনি। 

 

ওয়াজেদ মিয়া লেখেন, একটু পরেই একজন সৈন্য রাসেলকে বাড়ির বাইরে পাঠানোর কথা বলে রমার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। তিনি তখন ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে তাকে না মারার জন্য আল্লাহর দোহাই দেয়। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠপুত্রের এ মমর্শস্পর্শী আর্তিতে একজন সৈন্যের মন গলে। তাই সে তাকে বাড়ির গেটে সেন্ট্রিবক্সে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এর প্রায় আধ ঘণ্টা পর একজন মেজর সেখানে রাসেলকে দেখতে পায়। ওকে দোতলায় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় রিভলবারের গুলিতে হত্যা করে।

 

আর আব্দুর রহমান রমা সাক্ষ্যাৎকারে এভাবে বর্ণনা দিয়েছেন রাসেল হত্যার-ভোররাতে ধানমন্ডির বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার দিনে যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন, সেটার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিলেন তিনি। দোতলায় হত্যাযজ্ঞ শেষে রাসেল এবং তাকে যখন নিচে নিয়ে আসা হয়। তখন বঙ্গবন্ধুর আদরের ছেলেটি বলেছিলেন: ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো? এরকম শিশুকে নিশ্চয়ই খুনিরা মারবে না আশায় মুহিতুল ইসলাম তাকে জড়িয়ে ধরে বলছিলেন: না, ভাইয়া, তোমাকে মারবে না। পরে রাসেল বলেন, আমি মায়ের কাছে যাব।

 

পরে এক হাবিলদার রাসেলকে হাত ধরে দোতলায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দোতলায় গুলি এবং সেখান থেকে কান্নাকাটির আওয়াজ পাওয়া যায়। আর ওই হাবিলদার নিচে গেটের কাছে এসে মেজর আজিজ পাশাকে বলে: স্যার, সব শেষ।

 

এর আগে আজিজ এবং রিসালদার মোসলেম উদ্দিন বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী এবং কামালের স্ত্রীকে হত্যা করে। রাসেলকে হত্যার আগে ঘাতকরা একে একে পরিবারের অন্য সদস্য বড় ভাই কামাল, জামাল, মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে।

 

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র দুরন্ত প্রাণ রাসেল এমন সময়ে মৃত্যু আলিঙ্গন করেন, যখন তার পিতার রাজনৈতিক জীবন দেখতে শুরু করেছিলেন মাত্র।

 

লেখক: কানাই চক্রবর্তী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)