ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ১৬ মাঘ ১৪৩২
good-food
৬২

নরসিংদীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদ, আল্টিমেটাম

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:১৭ ২৯ জানুয়ারি ২০২৬  

নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে সাংবাদিকদের পর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় জড়িত সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করার জন্য ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। এই আল্টিমেটামের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে এজাহার নামীয় আসামিদের ছবি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করার দাবিও উঠেছে।

 

অন্যথায় নরসিংদী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এবং মাধবদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর অপসারণের দাবিতে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ক্র্যাব নেতারা।

 

বৃহস্পতিবার দুপুরে সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) চত্বরে ক্র্যাবের মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে এসব দাবি উত্থাপিত হয়।

 

সমাবেশে সাংবাদিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করেন এবং ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।

 

ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল জানান, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)-এর কাছে স্মারকলিপি দেয়া হবে।

 

এই প্রতিবাদী কর্মসূচিতে জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম, বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ), ডিফেন্স জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (ডিজাব), রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশন (র‍্যাক), পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম (পিআরএফ), ঢাকা মেডিকেল রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ট্রান্সপোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ঢাকা জার্নালিস্টস কাউন্সিলসহ অনেক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

 

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা হামলার ঘটনাকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

ডিইউজে সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, “নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে ক্র্যাবের পিকনিকের বাসে চাঁদার দাবিতে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় সাংবাদিক সমাজ ফুঁসে উঠেছে। ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বা আইজিপি কেউই ক্র্যাব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বা আহতদের দেখতে যাননি যা অত্যন্ত দুঃখজনক। হামলাকারীরা চিহ্নিত চাঁদাবাজ এবং তাদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ রয়েছে। পুলিশও এসব চাঁদাবাজদের কাছ থেকে ভাগ পায়।” তিনি নরসিংদী এসপি এবং থানার ওসির অপসারণের দাবি জানান।

 

ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম যোগ করেন, “ক্রাইম রিপোর্টাররা যখন আঘাতপ্রাপ্ত, তখন দেশের অবস্থা কী তা স্পষ্ট। হামলাকারীদের পরিচয় স্পষ্ট, তাই অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করা হোক।”

 

ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ঘটনাকে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। আসামি গ্রেপ্তার না হলে ঢাকা অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছি। সরকারের সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করছি, এদের দিয়ে কিছু হবে না।”

 

ক্র্যাব সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ বলেন, “ভিডিও এবং সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার না করা প্রশাসনিক গাফিলতি। ঘটনার পরপরই অভিযান না করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে পুলিশ আসামিদের পালাতে সাহায্য করেছে।”

 

ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান কামাল, মধুসূদন মন্ডল এবং কামরুজ্জামান খান পুলিশের বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেন। মন্ডল বলেন, “১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করা হয়েছে, কিন্তু মাত্র চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে এত সময় লাগার কথা নয়।” খান যোগ করেন, “ট্রিপল নাইনে কল করলে ১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ পৌঁছানোর কথা, কিন্তু এখানে আধা ঘণ্টা পরে গেছে। পুলিশ আরও আগে গেলে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যেত।”

 

ক্র্যাবের সাবেক সহ-সভাপতি শাহীন আব্দুল বারী বলেন, “এই নির্মম হামলার দায় ড্রিম হলিডে পার্ক কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হোক।”

 

ঢাকা জার্নালিস্টস কাউন্সিলের সভাপতি ইকরামুল কবীর টিপু ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “সাংবাদিকদের পিকনিকের গাড়িতে হামলা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।” জাতীয় প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য মো. মোমিন হোসেন পুলিশের ব্যর্থতা তুলে ধরে বলেন, “এসপি কোনো দৃশ্যমান পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি, এই দায় তাকেই নিতে হবে।”

 

ক্র্যাবের সহ-সভাপতি জিয়া খান ২৬ জানুয়ারিকে ‘ব্ল্যাক ডে’ ঘোষণার দাবি জানান। বিএসআরএফ সভাপতি মাসুদুল হক বলেন, “আসামি ধরতে কেন মানববন্ধন করতে হয়? সরকার কি নেই? গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু প্রতিটি স্তরে বাধা দেওয়া হচ্ছে।”

 

বিএসআরএফ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ বাদল ক্র্যাবের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, “জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।” ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি হাসান জাবেদ বলেন, “সাংবাদিকরা কর্মস্থলে, এসাইনমেন্টে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে কোথাও নিরাপদ নয়। রাষ্ট্র কোথায় নিরাপত্তা দেবে?”

 

ডিজাব সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “সাংবাদিকরা কারো বন্ধু নয়, তাই ঘটনায় কেউ এগিয়ে আসে না। ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই এবং মূল হোতাকে চিহ্নিত করার দাবি করি।” র‍্যাক সভাপতি সাফিউদ্দিন আহমেদ প্রশাসনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা এত নাজুক যে, পরিবারসহ পিকনিকে গিয়েও নিরাপত্তা নেই।” র‍্যাক সাধারণ সম্পাদক তাবারুল হক যোগ করেন, “সাংবাদিক সমাজ ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।” পিআরএফ সভাপতি খোন্দকার কাওছার হোসেন বলেন, “আবেদন নিবেদনের পরও কেন হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? প্রশাসন কেন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না?” পিআরএফ সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী বলেন, “সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না।”

 

প্রতিবাদ সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা মেডিকেল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বাবু এবং ট্রান্সপোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি আজিজুল হাকিম। উপস্থিত ছিলেন ক্র্যাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, ডিআরইউ কার্যনির্বাহী সদস্য আলী আজম, ডিআরইউ সাবেক সহ-সভাপতি ওসমান গনি বাবুল, ক্র্যাবের যুগ্ম সম্পাদক শহিদুল ইসলাম রাজী, অর্থ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক নেহাল হাসনাইন, দফতর সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ইমু, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মাহমুদুল হাসান (মাহমুদ সোহেল), আইন ও কল্যাণ সম্পাদক কালিমউল্লাহ নয়ন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুল্লাহ মিজান, কার্যনির্বাহী সদস্য আবু হেনা রাসেল এবং মাহবুব আলমসহ অনেকে।

 

গত ২৬ জানুয়ারি নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে ক্র্যাবের পিকনিকের বাসে চাঁদার দাবিতে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে অন্তত ১০ জন ক্র্যাব সদস্য আহত হন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর ছিল। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং নরসিংদী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন নিজ নিজ বাসায় চিকিৎসাধীন। ঘটনায় মাধবদী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে।