ঢাকা, ০৫ আগস্ট বুধবার, ২০২০ || ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
good-food
৫২

করোনা: কোরবানি না দিলেও কী চলবে?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০১:৫৪ ২৮ জুলাই ২০২০  

সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব। দিনে দেয়ার মতো অর্থ বা সম্পদ থাকলে তা অবশ্যই দিতে হবে। তো করোনাকালে কোরবানি কেমন হবে? অধিকন্তু কেমন হওয়া উচিত?

ইসলামের বিধান বলছে, কোরবানি না দিলে মুসলমানদের গুনাহ হবে। তবে কেউ যদি মনে করেন, এসময়ে তা দিলে শারীরিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনো ক্ষতি হতে পারে, তাহলে না- দিতে পারেন। কিন্তু পরে তাকে স্বাভাবিক সময়ে কাফফারা দিতে হবে। বাংলাদেশের ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতিরা এমনই মত দিয়েছেন।

তাদের মতে, করোনাকালে দেশের সব মুসলমানের কোরবানি বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, মানুষ এসময়েও অফিসে যাচ্ছেন, বাজারে যাচ্ছেন। তবে যেহেতু বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে মহামারি চলছে, তাই পশু জবাইসহ সবক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

কোরবানি কারা দেবেন

আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানরা কোরবানি দেবেন৷ সামর্থ্য বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে কিছুটা দ্বিমত আছে ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে। শোলাকিয়ার ইমাম মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদ বলেন, ঈদুল আযহার দিনে কোনো মুসলামানের যদি যাকাত দেয়ারনিসাব' পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত থাকে, তাহলে তাকে কোরবানি দিতে হবে।

তিনি বলেন, যাকাত ফরজ হতে সারাবছর ধরে ওই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ সম্পদ থাকতে হয়। এটাই হলো এর সঙ্গে কোরবানির পার্থক্য। আর হজ কোরবানি একই সময়ে হলেও দুইয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। যারা হজে যাবেন, তারা কোরবানি দেবেন। কিন্তু হজ তার জন্যই যার যাওয়া-আসার মতো টাকা আছে। কিন্তু কোরবানি ওয়াজিব হতে হজে যাওয়ার সক্ষমতার প্রয়োজন নেই।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক . সাইফুর রহমান বলেন, যার কাছে ঈদুল আযহার সময় পশু কেনার মতো টাকা থাকবে, তাকেই কোরবানি দিতে হবে। যাকাতের নিসাব পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা ওই সময় থাকতে হবে তা নয়।

ইসলামের বিধান মতে, সারাবছর যে মুসলিমের কাছে সাড়ে তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে তোলা রূপা থাকবে, তাকেই যাকাত দিতে হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের পরিচালক মুফতি মাওলা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, নিয়ম হলো, যেটার আর্থিক মূল্য কম সেটা ধরেই সামর্থ্য বিবেচনা করতে হবে। তাই সাড়ে ৫২ তোলা রূপার সমপরিমাণ অর্থ সম্পদ থাকলেই যাকাত দিতে হবে।

কোরবানি কি বন্ধ রাখা যায়?

মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদের মতে, সামর্থ্যবানরা করোনার সময়েও কোরবানি বাদ দিতে পারবেন না। ওয়াজিব বাদ দিলে গুনাহ হবে।

যদি কোনো মুসলামান তা না করে সেই টাকা দান করে দেন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না! তা- করা যাবে না। নামাজ বাদ দিয়ে শুধু রোজা রাখলে তাতে নামাজের ফরজ আদায় হয় না। নামাজও পড়তে হবে।

তার মতে-অফিস, হাটবাজার সবই চলছে।তাহলে কোরবানি কেন হবে না। ইসলামের ইতিহাসে কোরবানি বাদ দেয়ার কোনো নজির নাই। তবে ৩টি পরিস্থিতিতে ব্যাক্তিগতভাবে কোনো মুসলমান এসময় কোরবানি না- দিতে পারেন। কিন্তু পরে তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে।

সুবিধামতো সময়ে কোরবানির টাকা দিয়ে একটি পশু কিনে গরিবের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে বলে জানান মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

ওই ৩টি পরিস্থিতি হলো: সাধারণ শঙ্কা, প্রবল আশঙ্কা নিশ্চিত ক্ষতি। করোনার সময় কোরবানি দিলে শারীরিক ক্ষতি অথবা ক্ষতি হবে এমন তথ্যগত প্রমাণ পেলে কিংবা নিশ্চিতভাবে জীবনহানির আশঙ্কা হতে পারে- এমন ক্ষেত্রে এসময় কোরবানি না- দিতে পারেন।

অধ্যাপক . সাইফুর রহমান বলেন, আরো অনেক কারণে কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোরবানির সময় তা করতে না- পারেন। যেমন- কোনো পশু পাওয়া না গেলে বা দুর্যোগের শিকার হলে। এরকম হলে পরে কোরবানির পশু কেনার টাকা দান করে দিলেই হবে।

তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সব মুসলমান মিলে কোরবানি বাদ দেয়ার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

তারা তিনজনই বলেন, মসজিদ তালা মেরে রাখা যাবে না। কিন্তু  যেকোনো পরিস্থিতিতে সেখানেই নামাজ পড়তে হবে, এমন নয়। ঘরে নামাজ পড়লে ফরজ আদায় হয়। এবারের হজ মসজিদে সীমিত নামাজের সঙ্গে কোরবানির তুলনা করা সঠিক মনে করেন না তারা।

ফরিদউদ্দিন মাসউদ বলেন, তবে এবার কোরবানিতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। হাট থেকে শুরু করে পশু জবাই সবক্ষেত্রে। এটার ব্যাবস্থা যেমন সরকার করবে, তেমনি নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার।

কোরবানির অর্থনীতি

ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও বাংলাদেশে কোরবানির একটি  বড় অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশেষ করে ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধের পর এটার গুরুত্ব আরো বেড়েছে। দেশে ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে গরু পালন এবং তা বিক্রির বিশাল একটি গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে আছে চামড়া শিল্প। কোরবানির সময়ই দেশের ৮০ ভাগ পশুর চামড়া পাওয়া যায়। তাই অনলাইনে হোক বা কঠোর স্বাস্থ্য নিরপত্তা নিশ্চিত করে হোক, পশুর হাট এবং কোরবানি সচল রাখতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

সিপিডির অর্থনীতিবিদ . খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এর বাইরে কোরবানির সময়ই দেশে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে। ইদুল ফিতরের চেয়েও বেশি। তবুও কোভিডের কারণে এবার বরাবরের চেয়ে পশু কম কোরবানি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এখন চামড়া রপ্তানি বন্ধ আছে। চামড়াজাত পণ্যের চাহিদাও কমে গেছে। তাই এবার কোরবানির চামড়া নিয়ে সংকট হতে পারে। গতবার সংগ্রহ করা চামড়ার মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার তা অব্যবহৃত রয়ে গেছে এখনো। সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে চামড়ার স্টক জমে যেতে পারে।

তাই এবারওয়েট ব্লু' চামড়া রপ্তানির অনুমতি বাজার খোঁজা দরকার বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ৷ এবার চামড়া সংগ্রহ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ, চামড়ার বড় একটি অংশ সংগ্রহ করেন মৌসুমী ব্যাবসায়ীরা।

কিন্তু করোনার কারণে তারা মাঠে খুব একটা নামবেন বলে মনে করেন না বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, এবার পশু কোরবানিও ৩০-৩৫ ভাগ কম হবে।