ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২৯ মাঘ ১৪৩২
good-food
৩৫

নির্বাচনি প্রতীক যেভাবে রাজনৈতিক পরিচয় হলো

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:৫৭ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে নির্বাচনের হাওয়া বইলেই গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র পোস্টার আর ব্যানার ছেয়ে যায়। এই পোস্টারগুলোতে প্রার্থীর নামের চেয়েও বড় করে ফুটে ওঠে দলীয় প্রতীক। সাধারণ মানুষ যখন ভোট দিতে যান, তখন ব্যালট পেপারে চেনা প্রতীকের খোঁজ করেন। ধানের শীষ, লাঙ্গল বা দাঁড়িপাল্লার মতো প্রতীকগুলো বছরের পর বছর ধরে ভোটারদের কাছে এক একটি রাজনৈতিক দলের সমার্থক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রতীকগুলো কীভাবে এলো? এগুলোর শুরুর মালিকানা কাদের ছিল? ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বর্তমানের অনেক জনপ্রিয় প্রতীকই শুরুতে সেই দলের ছিল না। নানা হাত বদল আর রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে এগুলো আজকের রূপ পেয়েছে।

ধানের শীষ যেভাবে বিএনপির হলো

১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে এক ছাতার নিচে এনে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। তবে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পরপরই ধানের শীষ তাদের প্রতীক ছিল না। এই প্রতীকটির ইতিহাস আরও পুরনো। স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে লড়াই করেছিল। এমনকি যুক্তফ্রন্ট থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময়ও ভাসানী এই প্রতীকটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপের একটি বড় অংশ বিএনপিতে যোগ দেয়। যাদু মিয়ার সেই অংশটিই মূলত তাদের পুরনো প্রতীক ধানের শীষ সাথে করে বিএনপিতে নিয়ে আসে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রথমবারের মতো ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জয়লাভ করে। এরপর থেকে গত কয়েক দশক ধরে ধানের শীষ বিএনপির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হলে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতীকটি বিএনপিকে বরাদ্দ দেয়।

লাঙ্গলের মালিকানায় বারবার রদবদল

বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে আরেকটি প্রভাবশালী প্রতীক হলো লাঙ্গল। বর্তমানে এটি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে এই প্রতীকের যাত্রা শুরু হয়েছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির হাত ধরে। সেখান থেকে লাঙ্গলের মালিকানা চলে যায় আতাউর রহমান খানের জাতীয় লীগের কাছে। পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনেও আতাউর রহমান খান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে লড়েছিলেন।

১৯৮৪ সালে আতাউর রহমান খান এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং তার দল জাতীয় লীগ বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখনই এই লাঙ্গল প্রতীকটি এরশাদের হাতে আসে। নব্বই পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীক নিয়েই অংশ নিয়েছে। যদিও দলটি অনেকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে, কিন্তু লাঙ্গল প্রতীকটি সবসময়ই এরশাদের অংশের কাছেই থেকেছে। সম্প্রতি জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে আবারও এই প্রতীকের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের খাতায় জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশই লাঙ্গল প্রতীকের অধিকারী।

দাঁড়িপাল্লার আসা যাওয়ার গল্প

জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত দাঁড়িপাল্লার ইতিহাসও বেশ পুরনো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেই তারা প্রথম এই প্রতীকটি ব্যবহার করেছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ বিরতি শেষে ১৯৮৬ সালে জামায়াত যখন আবার নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকটি চেয়ে আবেদন করে এবং তা পেয়ে যায়। এরপর টানা পাঁচটি নির্বাচনে তারা এই প্রতীক নিয়ে অংশ নেয়।
তবে ২০১৩ সালে হাইকোর্টের এক আদেশে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হলে তাদের দলীয় প্রতীক নিয়েও সংকট তৈরি হয়। 

২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে নির্বাচন কমিশনকে একটি চিঠি দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয় দাঁড়িপাল্লা যেহেতু ন্যায়বিচারের প্রতীক, তাই এটি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হওয়া উচিত নয়। এরপর ২০১৭ সালে নির্বাচন কমিশন বিধিমালা সংশোধন করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকটি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। এর ফলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে হয়েছিল। তবে চলতি বছরের জুনে আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকটিও ফেরত পেয়েছে জামায়াত।

নতুন প্রতীক ও নির্বাচন কমিশনের টানাপড়েন

বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৯ টি। সম্প্রতি জুলাই অগাষ্টের ছাত্র জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আসা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নিবন্ধন পেয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ প্রতীক দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের নতুন প্রতীকের তালিকায় শাপলা রাখেনি। এর আগে নাগরিক ঐক্যও একই প্রতীক চেয়েছিল। অবশেষে তাদের শাপলা কলি প্রতীক দেওয়া হয়েছে।

অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতীক নিয়ে এমন বিতর্ক আগেও হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষে কাদের সিদ্দিকী যখন নতুন দল গঠন করেন, তখন তিনি ‘গামছা’ প্রতীক চেয়েছিলেন। তখন ইসির তালিকায় গামছা ছিল না, কিন্তু বিশেষ বিবেচনায় তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আবার বিএনএফ নামে একটি দল যখন ‘গমের শীষ’ প্রতীক চেয়েছিল, তখন বিএনপি তাতে আপত্তি জানায়। কারণ সাদাকালো ব্যালটে ধানের শীষ আর গমের শীষের মধ্যে ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন। পরে সেই দাবি মেনে নিয়ে বিএনএফকে দেওয়া হয় টেলিভিশন প্রতীক।

সাদাকালো ব্যালট ও প্রতীকের সাদৃশ্য

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যালট পেপার হয় সাদাকালো। এই সাদাকালো ব্যালটে অনেক সময় কাছাকাছি দেখতে প্রতীকের কারণে ভোটাররা ধন্দে পড়ে যান। যেমন একবার একটি দল ‘জাহাজ’ প্রতীক চেয়েছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগ তাতে আপত্তি জানায় কারণ তা দেখতে নৌকার মতো মনে হতে পারে। একইভাবে কম্পিউটার আর টেলিভিশন যদি একই ব্যালটে থাকে, তবে অনেক ভোটারের পক্ষে তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। শাপলা, গোলাপ বা অন্য যেকোনো ফুল এবং সবজি হিসেবে থাকা ফুলকপিও সাদাকালো প্রিন্টে প্রায় একই রকম দেখায়।

বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রতীক কেবল একটি চিহ্ন নয়, এটি একটি দলের আবেগ ও শক্তির প্রকাশ। ধানের শীষ, নৌকা বা লাঙ্গল এখন কেবল ছবি নয়, এগুলো সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক আদর্শের নাম। দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতীকগুলো হারিয়ে গেলে বা পরিবর্তিত হলে ভোটারদের ওপর তার বড় প্রভাব পড়ে। তাই নতুন দল হোক বা পুরনো, সবাই চায় এমন একটি প্রতীক যা সাধারণ মানুষ এক পলকেই চিনতে পারে। কারণ দিনশেষে ব্যালট পেপারে প্রতীকের ওপর দেওয়া একটি সীলই ঠিক করে দেয় পরবর্তী পাঁচ বছর দেশের হাল ধরবে কে।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর