ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি রোববার, ২০২০ || ১১ ফাল্গুন ১৪২৬
good-food
৯৮

আকবর দ্য গ্রেট হয়ে ওঠার গল্প

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:৪২ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

অনন্য নেতৃত্বে ও দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে বাংলাদেশকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শিরোপা জিতিয়েছেন আকবর আলি। বিশ্ব দরবারে লাল-সবুজ পতাকার মর্যাদা আরেক সিঁড়ি উঁচুতে তুলেছেন তিনি। স্বভাবতই তাকে নিয়ে গর্বিত কোটি বাঙালি।এরই মধ্যে ক্রিকেট বিশ্বে আকবর দ্য গ্রেট নামে পরিচিতি পেয়ে গেছেন এ টিনএজার। তবে এ সাফল্য এমনি এমনি ধরা দেয়নি। এতদূর আসতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। করতে হয়েছে অসাধ্য সাধন। 
সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি আকবর। প্রতিনিয়ত দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। তবে দমে যাননি তিনি। ২০০২ সালে রংপুর মহানগরীর পশ্চিম জুম্মাপাড়া হনুমানতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আকবর। বাবা ফার্নিচার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মোস্তফা এবং সাহিদা বেগম দম্পতির চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়সে পাড়ার গলিতে টেপ টেনিস বল আর ভাঙা ব্যাটে খেলা শুরু করেন এ ক্রিকেটার। খেলতে খেলতে বড় ভাইয়ের পরামর্শে একাডেমিতে অনুশীলন শুরু করেন।
ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আসক্ত ‘আকবর দ্য গ্রেট’। ক্রিকেটে ছেলের আসক্তি দেখে বাবা তাকে রংপুর জেলা স্কুল মাঠে অসীম মেমোরিয়াল ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করে দেন। একাডেমির কোচ অঞ্জন সরকারের হাত ধরে ক্রিকেটে তার সত্যিকারের হাতেখড়ি। সেখানে তিনি তিন বছরের অধিক প্রশিক্ষণ নেন।
২০১২ সালে দেশের সেরা ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ভর্তি হন আকবর। এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। শুধুই এগিয়ে গেছেন। প্রথমে খেলেন বিকেএসপির বয়সভিত্তিক দলে। সেখানে দারুণ পারফরম্যান্সের বদৌলতে সুযোগ পেয়ে যান জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে। সঙ্গে নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে তার।
শুধু ক্রিকেট নিয়েই পড়ে থাকেননি আকবর। পড়াশোনাটাও দুর্দান্তভাবে সামলেছেন তিনি। রংপুর বেগম রোকেয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিশু নিকেতন থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন তিনি। পরে ভর্তি হন লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিকেএসপিতে সুযোগ পান।
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া ও খেলাধুলা একসঙ্গে চালান আকবর। ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান তিনি। এইচএসসির রেজাল্টও মন্দ নয়। ২০১৮ সালে এতে জিপিএ-৪.৪২ পান ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক। শুধু খেলাধুলা নয়, পড়ালেখায়ও চ্যাম্পিয়ন তিনি।
হ্যাঁ, আরেকটি কথা। আকবরের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে আরেকজনের অবদান। তিনি বড় বোন খাদিজা খাতুন রানী। ছোট ভাই ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে মাঠে গেলেই জায়নামাজে বসে থাকতেন তিনি। সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে করতেন দোয়া। যেন ভাই ভালো খেলে সুস্থ শরীর আর জয় নিয়ে ফিরতে পারে। 
আকবর যুব বিশ্বকাপ জয় করেছেন। কিন্তু তা দেখে যেতে পারলেন না বোন খাদিজা। গেল ২৪ জানুয়ারি যমজ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান তিনি। একমাত্র বোনের মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করেন ১৮ বছর বয়সী ক্রিকেটার। 
রোববার পচেফস্ট্রমে ফাইনালে বৃষ্টি আইনে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতে বাংলাদেশ। এরপর  আনন্দে কাঁদেন আকবরের বাবা-মা। মা সাহিদা আক্তার বলেন, আমার ছেলে জয় নিয়ে দেশে ফিরবে-এ পণ করেই খেলতে গিয়েছিল। সন্তান আমার অদম্য। তার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। সঙ্গে আমরা একটা বিশ্বকাপ জিতলাম।
বিশ্বজয় শেষেই আকবরের বাড়ি রংপুরের পশ্চিম জুম্মাপাড়ায় ভিড় জমান সাংবাদিকরা। এসময় আনন্দে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে তাদের এসব কথা বলেন সাহিদা আক্তার। আকবরের মা বলেন, আমার দোয়া নিয়ে খেলতে গিয়েছিল ছেলে। আল্লাহর রহমতে দেশের মুখ বিশ্বে উজ্জ্বল করেছে সে। তার এ জয় পুরো দেশবাসীর।
টিভি পর্দায় খেলা দেখেন আকবরের বাবা মোস্তফা। ছেলের পারফরম্যান্সে অভিভূত তিনি। দলের বৈশ্বিক শিরোপা জয়ে উদ্বেলিত। তার চোখে বেয়ে নামে আনন্দাশ্রু। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মোস্তফা বলেন, আমি কান্না থামাতে পারছি না। এ কান্না খুশির কান্না। আল্লাহ আমার ছেলের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। তাই পুরো বিশ্বে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পেরেছে সে।
এ সময় সবার কাছে ছেলের জন্য দোয়া চান তিনি। আকবরের বাবা বলেন, আমার ছেলে স্বপ্ন দেখত, সে একদিন দেশের হয়ে খেলবে। তার সেই মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। ওর ইচ্ছে ছিল বিজয় ছিনিয়ে আনবে। দৃঢ় মনোবলে তা পূরণ করেছে ও।
আকবরের ছোটবেলার কোচ অঞ্জন সরকার বলেন, রংপুর জেলা স্কুল মাঠে অসীম মেমোরিয়াল ক্রিকেট একাডেমিতে সে তিন বছরের বেশি ক্রিকেট খেলেছে। আমি শুরুতে ব্যাটিং স্টাইল ও তার মেধায় বুঝে যাই ও একদিন বড় ক্রিকেটার হবে। আকবর ব্যাটিং অলরাউন্ডার ছিল। তাকে আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন ক্রিকেট শিখিয়েছি। আমার কাছে তার ক্রিকেটে হাতেখড়ি। সে মেধাবী ও ভদ্র ছেলে। ও ভালো নেতৃত্ব দিতে পারে। শুরু থেকে সে সহ-অধিনায়ক অথবা অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। তার এমন সাফল্যে আমিসহ রংপুরবাসী খুবই খুশি।
রংপুরের ক্রিকেট খেলোয়াড় তারিক আনাম রুবেন বলেন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বন্ধ থাকা খেলাগুলো চালু করলে আরও ভালো খেলোয়াড় তৈরি হবে। রংপুরের অপর ক্রিকেট খেলোয়াড় মন্টি ও শিমুল সরকার জানান, আমরা অনেক খুশি আকবরের ব্যাটিং-নৈপুণ্যে। যুব ক্রিকেটারদের আরও প্রশিক্ষিত করলে তারাও জাতীয় পর্যায়ে সেরা খেলা প্রদর্শন করবে।
সবকিছুতে ভালো করার ধারাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশ যুবদলের নেতৃত্বের ভার তার কাঁধে। দক্ষিণ আফ্রিকার আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে নেতৃত্বের ভার সামলে চমক দেখালেন রংপুরের সন্তান আকবর। বিশ্বকাপ জয়ে দেশের অন্যান্য জেলার মতো বিভাগীয় নগরী রংপুরেও আনন্দে ভাসছে ক্রিকেট অনুরাগীরা। রোববার রাতে নগরীর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, লালবাগ, সিটি বাজার, কাচারীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল হয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়ে খুশিতে আত্মহারা অধিনায়ক আকবরের বাবা-মা। দেশের জন্য প্রথম বিশ্বজয়ের সাফল্যে তারা দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আনন্দ উৎসর্গ করেছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের। আকবরের জন্য আনন্দে ভাসছে রংপুরবাসী। নগরীর বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল বের করা হয় রাতে। ক্রিকেটভক্তরা ভিড় জামান আকবরের নগরীর পশ্চিম জুম্মাপাড়া হনুমানতলার বাড়িতে। সন্ধ্যায় রংপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে তার বাড়িতে ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান এমপি টেলিফোনে আকবরের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি এ বিজয় অর্জনের জন্য তার পরিবারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই আকবরের বাড়িতে সংবাদকর্মীসহ অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীর ঢল নামে। পরে বিজয় আনন্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে তার বাড়িসহ পুরো এলাকা। জয় উৎসবে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনন্দ মিছিল এসে ওই বাড়ির সামনেও সমবেত হয়।

খেলাধুলা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর