ঢাকা, ০৩ আগস্ট মঙ্গলবার, ২০২১ || ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
good-food
১২৩

টানা ১শ’ বছর কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে যে মসজিদে 

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২৩:০৭ ১২ জুলাই ২০২১  

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নওয়াব শাহী জামে মসজিদ। ইসলামী ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের ধারক ও বাহক এ মসজিদটি। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পৌরসভায় অবস্থিত এটি। 

 

এই মসজিদের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীর প্রথম পুরুষ শাহ আতিকুল্লাহ, বাগদাদ হতে দিল্লীতে আসেন। তৎকালিন দিল্লীর বাদশাহ্ তার কাছে মুরীদ হন এবং তৎকালিন পূর্ব বাংলায় বসবাসের জন্য জায়গীর প্রদান করেন।

 

প্রথমে তিনি পাবনা জেলার নাকালিয়াতে বসবাস করতে থাকেন। পরবর্তী বংশধররা নাকালিয়া থেকে ঢাকা জেলার হাসমিলানে চলে আসেন। শাহ আতিকুল্লাহ্’র অধস্তন বংশধর শাহ সৈয়দ খোদাবখশ। তার এক ছেলে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহ, এক মেয়ে সাইয়িদা তালিবুন নেছা চৌধুরানী। পাঠানদের পতনের যুগে তুর্কীদের জমিদারী ছিল ধনবাড়ীতে। এ বংশের উত্তর পুরুষ ছিলেন রাজা আলী খাঁ সাহেব।

 

বংশাই ও বৈরান নদীর মাঝখানে অপূর্ব নৈসর্গিক প্রকৃতির মাঝে এ বাড়ির অবস্থান। চন্দ্র বংশীয় রাজা যশোধর সাবেক পুখুরিয়া (বর্তমানে ধনবাড়ি এই পরগণার অন্তর্গত ছিলো) শাসক ছিলেন মোগল আমলে। তার সেনাপতি ছিলেন গৌড়ের সুলতানের ওমরাহ ধনুয়ার খাঁ। তিনি কৌশলে রাজ্যটি দখল করে পুত্র ইস্পিঞ্জার খাঁকে দিয়েছিলেন।

 

এই ইস্পিঞ্জার খাঁ ও তার ভাই মনোয়ার খাঁ ধনবাড়িতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য জমিদারি প্রতিষ্ঠা নিয়ে অন্য মতবাদও রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, সম্রাট আকবরের সময় এই দুই ভাই ধনবাড়ির অত্যাচারি জমিদারকে পরাজিত করে এ অঞ্চলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। 

 

ধনবাড়ি জমিদার বাড়ির প্রধান আবাস ভবন, কাচারি ভবন, তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ ও কবরস্থান সমন্বয়ে পরিকল্পিত। প্রধান আবাস ভবনটি একটি বেষ্টনি প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত। এর ভেতরে রয়েছে প্রশস্ত একটি বাগিচা। ধারণা করা হয় ইস্পিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ছিলেন ধনবাড়ি মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। 

 

সুদর্শন মসজিদটি ধনবাড়ি নবাব মঞ্জিলের বাইরে দিঘির পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় আশপাশে এক মনোরম পরিবেশ বিরাজমান।

 

মসজিদটির প্রথম খণ্ড তুর্কি বংশোদ্ভূত ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ দুই সহোদর নির্মাণ করলেও পরবর্তী সময়ে এর সম্প্রসারণ কাজ করেন বাংলা ভাষার প্রথম প্রস্তাবক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যুক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, ধনবাড়ীর বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। প্রায় ১১৫ বছর আগে মসজিদটির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আধুনিক রূপ দেন তিনি।

 

প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর বানানো মসজিদটি সংস্কারের আগে ছিল আয়তাকার। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৩.৭২ মিটার (৪৫ ফুট) এবং প্রস্থ ছিল ৪.৫৭ মিটার (১৫ ফুট)।

 

বর্তমানে এটি একটি বর্গাকৃতির মসজিদ এবং সাধারণ তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকার মোগল মসজিদের সঙ্গে কিছুটা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। সংস্কারের পর মসজিদের প্রাচীনত্ব কিছুটা লোপ পেলেও এর চাকচিক্য ও সৌন্দর্য বেড়েছে অনেক। 

 

দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের ভেতরের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে কড়িপাথরের লতা-পাতা আঁকা অসংখ্য রঙিন নকশা ও কড়িপাথরের মোজাইক, যা প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে। বাইরের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে সিমেন্ট আর কড়িপাথরের টেরাকোটা নকশা।

 

মসজিদে প্রবেশের জন্য বানানো হয়েছে পাঁচটি প্রবেশপথ। পূর্ব দিকে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি আর উত্তর ও দক্ষিণে আরো একটি করে দুটি — সর্বমোট পাঁচটি।

 

৩৪টি ছোট ও বড় গম্বুজ মসজিদটিকে করেছে আরো নান্দনিক। আরো আছে ১০টি বড় মিনার। প্রতিটির উচ্চতা ছাদ থেকে প্রায় ৩০ ফুট। মসজিদের দোতলার মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। মিনারের ওপর লাগানো তামার চাঁদগুলো মসজিদের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

মসজিদের ভেতরটা অলংকৃত করেছে মোগল আমলের তিনটি ঝাড়বাতি। শোভা পাচ্ছে সংরক্ষিত ১৮টি হাঁড়িবাতি, যা নারকেল ব্যবহার করে জ্বালানো হতো। সুপ্রাচীন মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ২০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

 

মসজিদের পাশেই রয়েছে শান-বাঁধানো ঘাট ও কবরস্থান। এখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর দুই বছর আগে তিনি এই মসজিদে চালু করেন ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াতের ব্যবস্থা (নামাজের সময় বাদে), যা গত প্রায় এক শ’ বছরে এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন তিলাওয়াত সচল রাখতে নিয়োজিত আছেন পাঁচজন হাফেজ, যা প্রতিদিন মসজিদে আসা মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের অভিভূত করে।

 

এক কথায় প্রাচীন আমলের মানুষের ইবাদত-বন্দেগি ও ইসলামী ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে ইতহাসিক কারুকার্যময় ধনবাড়ী শাহী মসজিদ।