ঢাকা, ১০ এপ্রিল শুক্রবার, ২০২০ || ২৬ চৈত্র ১৪২৬
good-food
১৮০

স্বাধীনতার মাসে রেকর্ড রাঙা জয়

বিদায় অধিনায়ক মাশরাফি

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২৩:৪৭ ৬ মার্চ ২০২০  

যেকোনো বিদায়ই বেদনার, যন্ত্রণার। আর সে বিদায়টা যখন বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ও সফলতম ওয়ানডে ‘অধিনায়ক মাশরাফির বিদায়’ - তখন ভক্ত, সমর্থক, অনুরাগীর মন খারাপের একশটা কারণ থাকতেই পারে।  মাশরাফি নিজেই বলেছেন, 'আমি ওয়ানডে অধিনায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। তবে নির্বাচকরা মনে করলে আমাকে ওয়ানডের জন্য বিবেচনায় রাখতে পারেন।'

 

তার মানে ধরেই নেয়া যায়, ৬ মার্চ শুক্রবার সিলেটে অধিনায়ক মাশরাফি বিদায় নিলেও পেসার মাশরাফি থেকে যাচ্ছেন। হয়তো খেলা চালিয়ে যাবেন আরও কিছুদিন। তারপরও ‘ক্যাপ্টেন মাশরাফির বিদায়ের’ রাগিণীটা অন্যরকম। দেশের ক্রিকেট ভক্তদের মনে বাজছিল বিদায়ের করুণ সুর। চারদিকে রাজ্যের আফসোস, ইশ মাশরাফি আর অধিনায়ক থাকবেন না, টস করতে নামবেন না। ভাবতেও যে কষ্ট হয়!

 

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের লক্ষ্য ছিল নেতৃত্বের শেষটায় মাশরাফী বিন মর্তুজাকে জয় উপহার দেয়া। শুধু জয়ে নয়, লিটন দাস এবং তামিম ইকবাল উড়ন্ত ব্যাটিং করে রেকর্ড রাঙা জয়ের পথ রচনা করে দেন। শুধু ব্যাটিং তাণ্ডবে নয়, বোলিংয়েও রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়েছে টাইগার বাহিনী। বৃষ্টিবিঘ্নিত তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ১২৩ রানে হারিয়ে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েকে ধবলধোলাইয়ের সঙ্গে কীর্তিমান মাশরাফীর তার নেতৃত্ব শেষ করলেন ৫০তম জয়ের কীর্তি গড়ে।


শুক্রবার  সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। আর এ  ম্যাচ দিয়েই অধিনায়কত্বের ইতি টানলেন মাশরাফী। তবে নেতৃত্ব দানের শেষ ম্যাচে টসে হারেন তিনি। অবশ্য টস জিতলেও বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় জিম্বাবুয়ে।
 

তবে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। অধিনায়ক মাশরাফির গৌরবময় পথচলা শেষ হলো বড় জয় দিয়ে। শেষ ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়েকে ১২৩ রানে হারিয়ে বাংলাদেশ সিরিজ জিতল ৩-০ ব্যবধানে।

 

সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের ২২ গজে শুক্রবার লিটন ও তামিম ব্যাট হাতে হয়ে ওঠেন বিধ্বংসী। সেই ঝড়ে এলোমেলো রেকর্ড বইও। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ৪৩ ওভারেই বাংলাদেশের রান ৩২২। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধদিতে পাওয়া ৩৪২ রানের লক্ষ্যে ছুটে জিম্বাবুয়ে থেমেছে ২১৮ রানে।

 

আগের ম্যাচেই গড়া তামিমের ১৫৮ রানের রেকর্ড ভেঙে লিটন করেছেন ১৭৬। ১৪৩ বলের ইনিংসে ছিল ৮ ছক্কা। এখানেও পেছনে ফেলেছেন তামিমকে (৭ ছক্কা)।

 

খুব পিছিয়ে ছিলেন না তামিমও। ৬ ছক্কায় অপরাজিত থাকেন ১০৯ বলে ১২৮ রান করে। এই নিয়ে দুই দফায় পেলেন টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি।

 

দুজনের জুটিও জায়গা করে নিয়েছে রেকর্ড বইয়ে। ২৯২ রানের জুটি যে কোনো উইকেটে বাংলাদেশের সেরা অনায়াসেই। দুই ওপেনারের ব্যাটে সেঞ্চুরিও এই প্রথম দেখল বাংলাদেশ।

 

এই রেকর্ড রথেই চাপা পড়েছে জিম্বাবুয়ে। সোনায় সোহাগা হয়ে এসেছে বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসের প্রথম ওভারেই মাশরাফির উইকেট। নিজেকে নিজের বিদায়ী উপহার। তার অধিনায়কত্বকে বিদায় জানাতে গ্যালারিতে ভীড় জমানো দর্শকদেরও উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার মুহূর্ত!

 

ক্যারিয়ারের শেষ টস অবশ্য হেরেছেন মাশরাফি। শুরুটায় ছিল না ঝড়ের ইঙ্গিত। প্রথম ৫ ওভারে তামিমই যা একটু এগিয়ে নিয়েছেন দলকে, লিটনের ব্যাট ছিল প্রায় নিশ্চুপ। ষষ্ঠ ওভারে চার্লটন সুমাকে দুটি বাউন্ডারিতে যেন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন লিটন। চলতে থাকে নান্দনিক সব শটের মহড়া। তামিমকে ২৯ রানে রেখে লিটন পৌঁছে যান পঞ্চাশে। ৫৪ বলে স্পর্শ করেন ফিফটি। পরের বলেই দুর্দান্ত ছক্কায় তামিম জানান দেন, তিনি স্রেফ দর্শক হয়ে থাকবেন না।

 

রান আসতে থাকে বানের জলের মতো। চার-ছক্কা এসেছে প্রায় প্রতি ওভারেই। দুজনের জুটি ছাড়িয়ে যায় উদ্বোধনী জুটির আগের রেকর্ড। ১১৪ বলে লিটন ছুঁয়ে ফেলেন তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি।

 

পরের ওভারেই বৃষ্টির হানা। ৩৩.২ ওভারে বাংলাদেশের রান তখন ১৮২। সেঞ্চুরি থেকে ২১ রান দূরে তামিম।

 

এরপর বৃষ্টি থামার দীর্ঘ অপেক্ষা। একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ বুঝি আর ব্যাটিংয়ে নামতেই পারবে না।

 

আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় পর শুরু হয় খেলা। প্রথম বলেই লিটনের ক্যাচ ছাড়েন ব্রেন্ডন টেইলর। খেসারত দিতে হয় জিম্বাবুয়ের বোলারদের। তাদের ওপর দিয়ে বয়ে যায় তাণ্ডব। চার-ছক্কার বৃষ্টিতে বল উড়তে থাকে মাঠের নানা প্রান্তে।

 

৯৮ বলে তামিম পা রাখেন ত্রয়োদশ সেঞ্চুরিতে।

 

লিটন জীবন পান আরও দুই দফায়। ১২২ রানে ক্যাচ ছাড়েন সিকান্দার রাজা, ১৪৪ রানে ওয়েসলি মাধেভেরে। তুলোধুনো করতে থাকেন বোলারদের। আসতে থাকে একের পর এক ছক্কা।

 

প্রথম একশ রানে ছক্কা ছিল না একটিও। সেঞ্চুরির পর মারেন ৮টি ছয়! ইনিংসে চার ছিল ছক্কার দ্বিগুন।

শেষ পর্যন্ত আরেকটি ছক্কার চেষ্টায় থেমেছে লিটনের ইনিংস। অপরাজিত থেকে গেছেন তামিম।

 

অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ নাঈম শেখ ব্যাটিংয়ের সুযোগ পাননি। শেষ দিকে উইকেটে গিয়েছিলেন আরেক অভিষিক্ত আফিফ হোসেন।

 

বৃষ্টি বিরতির পর ৫৮ বলে বাংলাদেশ তুলেছে ১৪০ রান। দলের মোট সংগ্রহ ছাড়িয়ে গেছে ৩০০।

এই প্রথমবার টানা তিন ম্যাচে তিনশ রানের দেখা পেল বাংলাদেশ। আগের দুই ম্যাচে ছিল ৩২১ ও ৩২২।

 

লক্ষ্য এমনিতেই ছিল জিম্বাবুয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রথম ওভারে মাশরাফির উইকেটে আরও চাপে পড়ে যায় তারা।

 

এরপর রেজিস চাকাভা একপ্রান্ত আগলে রেখেছেন কিছুক্ষণ। ওয়েসলি মাধেভেরে আবার রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। মিডর অর্ডারে সিকান্দার রাজা খেলেছেন ৫০ বলে ৬১ রানের ইনিংস। কিন্তু জিম্বাবুয়ে জয়ের সম্ভাবনাও জাগাতে পারেনি কখনও।

 

ওয়ানডে অভিষেকে দ্বিতীয় বলেই শন উইলিয়ামসকে বোল্ড করেছেন আফিফ হোসেন। ওয়ানডেতে প্রথমবার ৪ উইকেটের স্বাদ পেয়েছেন সাইফ উদ্দিন, কয়েকদিন আগেই মাশরাফি যাকে বলেছেন দলের সম্পদ।

 

বৃষ্টির চোখরাঙানির পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি পেয়েছেন জয়ের ফিফটি।

 

জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই সবাই ছুটে গেছেন মাশরাফির দিকে। ‘হাই ফাইভ’, পিঠ চাপড়ে দেওয়া আর আলিঙ্গনের পালা চলেছে। অধিনায়ককে কাঁধে তুলে নিয়েছেন তামিম ইকবাল, মাঠ প্রদক্ষিণ করেছে গোটা দল। নেতৃত্বে যিনি হয়ে উঠেছেন মহানায়ক, এমন বিদায়ই তো তার প্রাপ্য!


 
সংক্ষিপ্ত স্কোর:


 
বাংলাদেশ :

৪৩ ওভারে ৩২২/৩ (তামিম ১২৮*, লিটন ১৭৬, মাহমুদউল্লাহ ৩, আফিফ ৭; মুম্বা ৮-০-৬৯-৩, সুমা ৬-১-৪৮-০, রাজা ৭-০-৬৪-০, মাধেভেরে ৫-০-২৯-০,  টিরিপানো ৮-০-৬৫-০, উইলিয়ামস ৯-১-৪৬-০)।


 
জিম্বাবুয়ে :

(লক্ষ্য ৪৩ ওভারে ৩৪২) ৩৭.৩ ওভারে ২১৮ (কামুনহুকামউই ৪, চাকাভা ৩৪, টেইলর ১৪, উইলিয়ামস ৩০, মাধেভেরে ৪২, রাজা ৬১, মুটুমবামি ০, মুটুমবোদজি ৭, টিরিপানো ১৫, মুম্বা ৪*, সুমা ০; মাশরাফি ৬-০-৪৭-১, সাইফ ৬.৩-০-৪১-৪, মিরাজ ৮-০-৪৭-০, মুস্তাফিজ ৬-০-৩২-১, আফিফ ২-০-১২-১, তাইজুল ৯-০-৩৮-২)। 
 
ফল :

বাংলাদেশ ১২৩ রানে জয়ী
 
সিরিজ :

৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ৩-০তে জয়ী
 
ম্যান অব দ্য ম্যাচ :

লিটন দাস
 
ম্যান অব দা সিরিজ :

তামিম ইকবাল ও লিটন দাস

খেলাধুলা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর