ঢাকা, ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার, ২০২৬ || ৪ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৫

সংসদ সদস্য কি প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০১:৪০ ২০ অক্টোবর ২০২৬  

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন গাড়ি থেকে নামছেন, হাতে পিস্তল। 

তার ভাষ্য, অস্ত্রটি বৈধ; ৩০-৩৫ জন মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসায় আত্মরক্ষার জন্য অল্প সময় তা উঁচিয়ে ধরেছিলেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রিসভা ছাড়তে বলেছেন বলে খবর বেরিয়েছে, যা প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরও শুরুতে অস্বীকার করে।

কে ঠিক, কে ভুল, সেটি তদন্তের বিষয়। এই লেখার প্রশ্ন আরও গোড়ার। একজন সংসদ সদস্য কি আদৌ প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চলতে পারেন? উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ তে আটকে নেই।

সংবিধান যা বলে, যা বলে না

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সংশোধনীর মতো অস্ত্র রাখার কোনো মৌলিক অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানে নেই। এখানে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সনির্ভর অনুমতি, অধিকার নয়। ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। ফলে লাইসেন্সের শর্ত সংসদ সদস্যের বেলায় আলাদা হয় না।

৩৭ অনুচ্ছেদ সমাবেশ ও শোভাযাত্রার অধিকার দিয়েছে ‘শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায়’। জনসভা বা মিছিলে অস্ত্র হাতে উপস্থিতি এ শর্তের সঙ্গে কতটা মেলে, সে প্রশ্ন থাকেই।

৭৮ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তিও এখানে কাজে আসে না। সেটি কেবল সংসদ বা সংসদীয় কমিটিতে কিছু বলা বা ভোট দেওয়ার জন্য, রাস্তার আচরণের জন্য নয়। বিশেষ অধিকার নির্ধারণে আইন করার সুযোগ একই অনুচ্ছেদে আছে; সেই আইন আজও হয়নি।

বহন করা যায়, দেখানো যায় না

মূল আইন ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন। এর ১৩ ধারা বলছে, লাইসেন্স থাকলেও অস্ত্র নিয়ে চলতে হবে লাইসেন্সে অনুমোদিত সীমা ও পদ্ধতির ভেতরে। ১৮ ধারায় জনশান্তির স্বার্থে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে।

সেই পদ্ধতি স্পষ্ট করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫। এর ২৫(ক) অনুচ্ছেদে লাইসেন্সধারী আত্মরক্ষার জন্য নিজের অস্ত্র বহন বা ব্যবহার করতে পারবেন, ‘তবে অন্যের ভীতি/বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।’ ২৫(খ) ইউনিফর্মধারী প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষী ছাড়া প্রকাশ্যে প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে, ২৫(গ) নিষেধ করেছে অন্যের সশস্ত্র প্রহরী হওয়া। শর্ত ভাঙলে লাইসেন্স বাতিলযোগ্য। সহজ কথায়, বহন করা যায়, দেখানো যায় না।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার তিন দিন পর ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ও সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের জন্য বিশেষ নীতিমালা আসে। তাতে সাময়িক লাইসেন্স ও একজন সশস্ত্র রিটেইনারের সুযোগ রাখা হয়, শর্ত পূরণে সাধারণ লাইসেন্সে রূপান্তরের পথও। সেখানেও ১৬ অনুচ্ছেদে অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি নিষিদ্ধ।

ভোটের আগে সাধারণ লাইসেন্সধারীদের অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ হলেও বৈধ প্রার্থী ও তাদের রিটেইনার প্রদর্শন-নিষেধাজ্ঞার বাইরে ছিলেন। অথচ নির্বাচন কমিশনের আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ১৫ আগ্নেয়াস্ত্র বহনে নিষেধ দেয়। দুই নির্দেশনার সুর তাই এক নয়।

বিধির নীরবতা, আত্মরক্ষার সীমা

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৭ ও ২৭০ বিধি অধিবেশনকক্ষে সদস্যদের আচরণ বেঁধে দেয়। কিন্তু সংসদের বাইরে তারা কীভাবে চলবেন, সে বিষয়ে আলাদা কোনো আইন বা আচরণবিধি নেই। ২০০৩ সালে বিএনপির আবদুল মান্নান ও ২০১০ সালে পতিত আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরী এমন বেসরকারি বিল আনলেও তা আইন হয়নি। জুলাই সনদে সদস্যদের অধিকারের সীমা ও দায় আইনে বাঁধার সুপারিশও এখনো কাগজে। ফলে সংসদ সদস্য এখানে আর দশজন লাইসেন্সধারীর মতোই। বাড়তি অধিকার নেই, বাড়তি নিষেধও নেই।

দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০২ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। তবে ৯৯ ধারা সীমা টেনেছে: প্রয়োজনের বেশি ক্ষতি নয়, আর কর্তৃপক্ষের সুরক্ষা নেওয়ার সময় থাকলে এ অধিকার খাটে না। অভিযানের প্রশ্ন আলাদা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ২১ ও ২৩ ধারায় তল্লাশি-গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের, সংসদ সদস্যের নয়। বিশেষজ্ঞরাও একমত নন। 

সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নূরুল হুদা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আত্মরক্ষার জন্যই লাইসেন্স দেওয়া হয়; তার মতে আইন ভাঙা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেছেন, যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে, তা বেআইনি।

অন্য দেশে কী নিয়ম

যেখানে সংসদ সদস্যরা অস্ত্র রাখতে পারেন, সেখানেও সীমা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস সদস্যরা দপ্তরে অস্ত্র রাখতে পারেন, কিন্তু ১৯৬৭ সালের বিধি অনুযায়ী ক্যাপিটল চত্বরে সশস্ত্র হয়ে ঘোরা যায় না; হাউস বা সিনেটের ফ্লোরে তো নয়ই। ইসরায়েলে লাইসেন্সধারী নেসেট সদস্যরা অস্ত্র বহন করেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে ইতামার বেন গভির পূর্ব জেরুজালেমে পিস্তল বের করে বলেছিলেন, তিনি হুমকি বোধ করছিলেন; এক প্রতিপক্ষ সদস্য তার লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগের কথা জানান। 

ইউক্রেনে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোনো আইন সংসদ সদস্যকে অস্ত্র নিয়ে অধিবেশনকক্ষে ঢুকতে বাধা দিত না। নাদিয়া সাভচেঙ্কো পিস্তল ও তিনটি গ্রেনেড নিয়ে ঢোকার পর দরজায় অস্ত্র জমা রাখার নিয়ম হয়।

উল্টো চিত্রও আছে। ব্রিটেনে ১৯৯৬ সালের ডানব্লেন হত্যাকাণ্ডের পর বেসামরিক মানুষের হ্যান্ডগান কার্যত নিষিদ্ধ; আত্মরক্ষা লাইসেন্সের গ্রহণযোগ্য কারণই নয়। জো কক্স (২০১৬) ও ডেভিড অ্যামেস (২০২১) খুনের পরও সমাধান খোঁজা হয়েছে পুলিশি নিরাপত্তায়। 

জাপানের ১৯৫৮ সালের আগ্নেয়াস্ত্র ও তলোয়ার নিয়ন্ত্রণ আইন বেসামরিক মানুষের অস্ত্র রাখা প্রায় বন্ধ রেখেছে; ২০২২ সালে শিনজো আবে হত্যার পরও জোর পড়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থায়। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৯৬ সালের জাতীয় আগ্নেয়াস্ত্র চুক্তি ব্যক্তিগত সুরক্ষাকে অস্ত্র রাখার ‘যথার্থ কারণ’ হিসেবেই মানে না।

যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়

সারকথা তাহলে মোটামুটি স্পষ্ট। বৈধ লাইসেন্স থাকলে একজন সংসদ সদস্য আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সঙ্গে রাখতে পারেন। তবে এমনভাবে দেখাতে পারেন না, যাতে মানুষ ভয় পায়; অস্ত্র হাতে পুলিশের ভূমিকাও নিতে পারেন না। অস্পষ্টতা অন্যখানে। ‘ভীতি’ কতটা হলে নিয়ম ভাঙা হয়, নীতিমালা তা মাপেনি। জনপ্রতিনিধির ঝুঁকিও কাল্পনিক নয়, হাদির ঘটনাই তার প্রমাণ। তার নিরাপত্তার দায় কতটা রাষ্ট্রের, কতটা নিজের? সংসদের বাইরে তার আচরণের মানদণ্ড কে ঠিক করবে? প্রতিটি ঘটনার পর নতুন তর্কের চেয়ে এসব প্রশ্নের জবাব আইনে লিখে রাখাই সবার জন্য স্বস্তির।

অপরাধ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর