ঢাকা, ১৬ নভেম্বর শনিবার, ২০১৯ || ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৩৫২

আলোচনার তুঙ্গে ক্রিকেটপাড়া

সাকিবের কী হবে ?

প্রকাশিত: ১১:২৯ ২৯ অক্টোবর ২০১৯  


দেশের ক্রিকেটে এখন নানান নাটকীয়তা। কিছু খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার তুঙ্গে এখন বাংলা ক্রিকেট।
ভারত সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে ক্রিকেটারদের আন্দোলন, একাধিক ক্রিকেটারের সফরসঙ্গী হতে অনিশ্চয়তা, বিসিবি থেকে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ; এসব বিষয় নিয়ে গেল কয়েকদিন ধরেই উত্তাল ক্রিকেটপাড়া। এই সফরে সাকিবের সঙ্গী হওয়া না হওয়া নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন দেশের ক্রিকেট ভক্তদের জন্য এসেছে নতুন দুঃসংবাদ।

বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা মিরপুরের ক্রিকেট পাড়া থেকে শুরু করে দেশজুড়ে। ধর্মঘটের পর থেকে নানা ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। ভারত সফরে তার অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা থেকে শুরু করে এখন ফিক্সিং ইস্যুতেও তার নামটি জড়ালো সবশেষ। মোটের ওপর সংবাদমাধ্যমের এখনকার ‘হটকেক’ইস্যু এখন সাকিব!

সিরিজে অংশগ্রহণের বিষয়ে সাকিবের এখন নাকি মত দেয়ারই সুযোগ থাকছে না। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাকে নিষিদ্ধ করছে ১৮ মাসের জন্য। অভিযোগ, এক জুয়াড়ির সঙ্গে কথোপকথনের পরও তা গোপন রাখা। বিসিবি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ সংবাদ দিয়েছে একটি জাতীয় দৈনিক।

বিসিবি’র একটি সূত্র জানিয়েছে, দুই বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের আগে এক ক্রিকেট জুয়াড়ির কাছ থেকে অনৈতিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। সেটা প্রত্যাখ্যান করলেও নিয়মানুযায়ী আইসিসির দুর্নীতি দমন সংস্থা - আকসুকে জানাননি সাকিব। 
তবে ওই জুয়াড়ির কল ট্র্যাকিং করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে কিছুদিন আগে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে কথা বলে আকসুর প্রতিনিধি দল। সেখানে সাকিবও বিষয়টি স্বীকার করেন।

ওই সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছে, সম্ভবত আইসিসির দুর্নীতি দমন সংস্থার রায়ে ১৮ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছেন সাকিব। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জুয়াড়ির কাছ থেকে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ পেয়েও নিশ্চুপ থেকেছেন।

তবে আইসিসির কোড অব কন্ডাক্টে বলা আছে, বাজিকরদের কাছ থেকে ম্যাচ বা স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে জানাতে হবে। না হয় আইসিসির দুর্নীতি দমন সংস্থা - আকসুকে অবহিত করতে হবে। সে খবর নিজে লুকিয়ে রাখলে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। সাকিব তার কোনোটাই করেননি।

বলা হচ্ছে শুধু বিসিবি নয়, আইসিসির বিধিবিধানও ভেঙেছেন তিনি। এই ‘ভুল’আরো বড়। আরো ভয়াবহ। সেই ভুলের শাস্তি হিসেবেই এখন তার সামনে আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞার শাস্তি ঝুলছে। আর এই পরিস্থিতির কারণেই সাকিব আল হাসানের ভারত সফরে যাওয়া হচ্ছে না, এটা নিশ্চিত। 

বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এরইমধ্যে একাধিক ব্রিফিং ও সাক্ষাৎকারে ৩০ অক্টোবর আইসিসির একটি রিপোর্ট পাওয়ার কথা বলেছেন। গেল ২২ অক্টোবর মঙ্গলবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের বিষয়েও ইঙ্গিত দেন তিনি। সাকিব যে ৩০ অক্টোবর দলের সঙ্গে ভারত যেতে পারছেন না, সেটিও এক সাক্ষাৎকারে বলেন বিসিবি সভাপতি। ভারত সফরে নতুন অধিনায়ক পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কথাও উল্লেখ করেন পাপন। সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, এত কিছুই ঘটেছে সাকিবের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাকে সামনে রেখে।

আইসিসি এরইমধ্যে সাকিবের ব্যাপারে বিসিবিকে বিস্তারিত জানিয়েছে। তাকে জাতীয় দলের সঙ্গে অনুশীলন না করার নির্দেশনাও দেয় আইসিসি। এ কারণে অসুস্থ বলে জাতীয় দলের অনুশীলনে যোগ দিচ্ছেন না সাকিব। সোমবার বিসিবির একাধিক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাকিব পরবর্তী সময়ে আকসুকে সহায়তা করায় একটু নমনীয় তারা। শাস্তি ১৮ মাস নির্ধারণ করা হলেও সাকিব আপিল করলে সেটা কমিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। বিসিবির সহযোগিতা চাওয়ার পাশাপাশি সাকিব আইসিসির কাছেও ক্ষমা চেয়ে শাস্তি মওকুফের আবদেন করবেন। আইসিসি দুর্নীতি দমন বিভাগের নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে চললে এই শাস্তি ছয় মাসে নেমে আসতে পারে। এটাই এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন শাস্তি।

আইসিসির দুর্নীতি দমন নীতিমালায় আছে, কোনো ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ, আম্পায়ার, স্কোরার, গ্রাউন্ডসের সদস্য, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংশ্নিষ্ট যে কেউ জুয়াড়ির কাছ থেকে যে কোনো ধরনের প্রস্তাব পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা আইসিসি বা সংশ্নিষ্ট দেশের ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি দমন কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। যতটা দ্রুত সম্ভব সেটা করার নির্দেশনা আছে। এজন্য প্রতিটি সিরিজ বা টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আইসিসি থেকে ক্রিকেটার এবং অফিসিয়ালদের সচেতন করতে জুয়াড়িদের সম্পর্কে অবগত করা হয়। আইসিসির তালিকাভুক্ত জুয়াড়িদের ছবি ও ফোন নম্বর টানিয়ে দেওয়া হয় ড্রেসিংরুমের পাশে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক সিরিজে আকসুর সদস্য উপস্থিত থাকেন। 


বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেট মৌসুম শুরুর আগেও আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের নির্দেশনা মেনে খেলোয়াড়, টিম অফিসিয়াল, ম্যাচ অফিসিয়াল এবং গ্রাউন্ডস কর্মীদের সচেতন করা হয়। এ কাজটি করেন বিসিবির দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোর্শেদুল ইসলাম। ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং জুয়াড়িদের ছায়া থেকে দূরে রাখতে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ দলের সঙ্গে রাখা হয়েছিল তাকে।

ফিক্সিং প্রতিরোধে আইসিসির সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলোতে সাকিব বরাবরই উপস্থিত ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে চালু হওয়া 'আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস' ভালোই জানা বাংলাদেশ অধিনায়কের। এই নিয়ম অনুসরণ করে আগে একবার জুয়াড়ির ফোন পাওয়ার বিষয়ে আকসু ও বিসিবিকে জানিয়েছিলেন তিনি। অথচ সেই সাকিবই কি-না দুই বছর আগে এত বড় একটা ভুল করে ফেলেছেন। 


আকসুর নিয়মে আছে, কোনো ক্রিকেটার, ম্যাচ অফিসিয়াল, টিম অফিসিয়ালসহ সরাসরি ক্রিকেটে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তি জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অনৈতিক প্রস্তাব না জানিয়ে চেপে গেলে, লুকানোর চেষ্টা করলে বা আকসুর জিজ্ঞাসাবাদেও অস্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে 'আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন' ধারা ২.৪.২, ২.৪.৩, ২.৪.৪, ২.৪.৫ ও ২.৪.৬ কার্যকর হবে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ছয় মাস আর সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে আইসিসি। সাকিব আকসুর জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগিতা করায় ১৮ মাস শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে আপাতত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে আইসিসি।

সূত্র বলছে, সাকিব আল হাসান হয়তো আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন এবং ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়ে নিজ বোর্ড কিংবা আইসিসি দুর্নীতি দমন সংস্থা আকসুকে না জানানোর অভিযোগ খণ্ডনের চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে যে ১৮ মাস নিষিদ্ধ হবার আইন আছে, তা কমাতে অনুরোধ করবেন।

এদিকে সাকিবের সঙ্গে ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সম্পর্কটাও খুব একটা সুখকর কিছু নেই। ক্রিকেটারদের আন্দোলন এবং তার বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে বিসিবি সাকিবের ওপর ভীষণ বিরক্ত। ঠিক এমন সময় সাকিবের ওপর আইসিসির এমন সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাকে অনেকে বাঁকা চোখে দেখছেন। এই বিষয়ের সহজ যুক্তি হল-আইসিসি সাকিবের মতো একজন হাইপ্রোফাইল ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনার আগে তো যথেস্ট প্রমাণ নিয়েই মাঠে নামবে। সেই তথ্য-প্রমাণাদি যোগাড়েই আইসিসি এতো লম্বা সময় নিয়েছে।

বিসিবির এক কর্মকর্তা বলেন, স্পট ফিক্সিং বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি বা অভিযোগও তোলা হয়নি। আইসিসি পরিস্কার জানিয়েছে, সাকিব জুয়াড়ির কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি জানাননি। এতেই আইন ভাঙা হয়েছে। তবে সাকিব কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আকসু ভালো করেই জানে, সাকিব ক্রিকেটে যে কোনো অনৈতিক বিষয়কে ঘৃণা করেন।

তিনি আরও বলেন, সাকিবের কেসটা মোহাম্মদ আশরাফুলের মতো নয়। তবে এটা অবশ্যই এ দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় দুঃসংবাদ।
 


এই বিভাগের আরো খবর