ঢাকা, ২১ এপ্রিল রোববার, ২০১৯ || ৮ বৈশাখ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৫১

কাজ করেনি নির্বাচনে

৪৬ কোটি টাকার ট্যাব’র দায় নেবে কে?

প্রকাশিত: ১২:০৩ ৮ এপ্রিল ২০১৯  


অকাতরে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি টাকারও বেশি। কেনা হয়েছে ৪২ হাজার ২০০ ট্যাব। কিন্তু সব টাকাই এখন ‘জলে’!

 

উপজেলা নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)-এর সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ হাজার ২০০ ট্যাব কেনে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু ট্যাবও ব্যর্থ হয়েছে।

 

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ছয়টি আসনে ভোট নেয়া হয়। কিন্তু সে সময় এই যন্ত্র নিয়ে নানা সমস্যা সামনে আসে। অল্প সময়ের মধ্যে ভোটের ফলাফল জানা যাবে বলা হলেও সেটিও সম্ভব হয়নি।

 

সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে চারটি ধাপে। তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে দুটি উপজেলার ইভিএমে নেয়া ভোটের তথ্য দ্রুত পাঠানোর জন্য সেখানে দায়িত্ব পালনরত নির্বাচন কর্মকর্তাদের ট্যাব দেয়া হয়। কিন্তু সেই ট্যাব ইসির কাছে ভোটের ভুল তথ্য পাঠিয়েছে। ট্যাবের ‘ভুতুড়ে’ আচরণ থেকে রক্ষা পেতে শেষ পর্যন্ত উপজেলার চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে এই যন্ত্রটি আর ব্যবহার করা হয়নি। ভবিষ্যতে এই যন্ত্রটি আর কোনো নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

যে কারণে খোদ ইসিতে এখন আলোচনা, ৪৬ কোটি টাকা অপচয় করে কেন এই যন্ত্র কেনা হয়েছে। তবে যন্ত্রটি কেনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা আশাবাদী, ভবিষ্যতে ট্যাবগুলো কাজে লাগবে।

 

গেল বছরের মাঝামাঝিতে দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে ইসি। সরকারের কাছ থেকে টাকা না পাওয়ায় তারা সব ইভিএম কিনতে পারেনি।

তবে সংসদ নির্বাচনের আগেই অনেকটা তড়িঘড়ি করে কিছু ইভিএম কিনে নেয় নির্বাচন কমিশন। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি এসব ইভিএম সরবরাহ করে।

বিএনপিসহ সব বিরোধী দল সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রহ দেখানো হয়নি।

শেষ পর্যন্ত সব দিকের রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করেই ইসি ঢাকা-৬, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, খুলনা-২, রংপুর-৩ ও সাতক্ষীরা-২ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।

 

ইভিএমের গুণাবলী সম্পর্কে ইসি থেকে বলা হয়, এই যন্ত্র ব্যবহার করা হলে জাল ভোট হবে না এবং ভোটের ফল বদলানো সম্ভব হবে না। এ ছাড়া নির্বাচনের ফল দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে।

কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ শেষে রাতে দেখা যায়, ইভিএমের ফল সবার পরে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর ফলও ঘোষণা করা হয়েছে প্রায় সবার শেষে।

জানা যায়, যন্ত্র বিকল হয়ে পড়ায় অনেক জায়গায় ভোট গ্রহণ শুরু করা হয় দুপুরের পর। অনেক জায়গায় যথাসময়ে ভোট শুরু করা হলেও যন্ত্রটি মাঝপথে বিগড়ে যায়।

 

এই সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়েই ইসি ৪২ হাজার ২০০ ট্যাব কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি কম্পিউটার সার্ভিসেস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ট্যাব কেনার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি এরইমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ট্যাব ইসিতে সরবরাহ করেছে। সিদ্ধান্ত হয়, যেসব এলাকায় ইভিএম ব্যবহার হবে সেখানে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা এই ট্যাব ব্যবহার করবেন এবং কেন্দ্রের ফল দ্রুত সন্নিবেশ করে তা ট্যাবের মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ইসি সচিবালয়ে পাঠাবেন।

 

কিন্তু ইসি কোনো ধরনের পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ না করেই ২৪ মার্চ উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে গোপালগঞ্জ সদর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ইভিএমের সঙ্গে ট্যাব সরবরাহ করে।

ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনের ফল সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেন, ট্যাবের মাধ্যমে পাঠানো ফল ভুল। শেষ পর্যন্ত ট্যাবের মাধ্যমে পাঠানো তথ্য বাতিল করে পুরোনো পদ্ধতিতে ফল সংগ্রহ করা হয়। যে কারণে এই দুটি উপজেলার ফল ঘোষণা করতে বিলম্ব হয়।

 

এই ঘটনার পর গেল ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে ট্যাবের ব্যবহার বাতিল করে ইসি। ২৮ মার্চ ইসি সচিবালয়ের এক চিঠির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত মাঠ প্রশাসনকে জানানো হয়। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ধাপে ময়মনসিংহ সদর, পটুয়াখালী সদর, বাগেরহাট সদর, কক্সবাজার সদর, ফেনী সদর ও মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় ইভিএমের সঙ্গে ট্যাব ব্যবহার করার কথা ছিল।

গত ২৮ মার্চ জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সহকারী পরিচালক মো. রশিদ মিয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ‘পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ধাপে ময়মনসিংহ সদর, পটুয়াখালী সদর, বাগেরহাট সদর, কক্সবাজার সদর, ফেনী সদর ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার সব কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। তৃতীয় পর্যায়ে ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জ সদর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ট্যাব ও সফটওয়ার ব্যবহার করে ফল প্রেরণে কারিগরি সমস্যা দেখা যায়। উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করায় ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য উল্লিখিত ছয়টি উপজেলায় ইভিএম কেন্দ্রগুলোয় ট্যাব ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ অবস্থায় ছয়টি উপজেলায় ইভিএম কেন্দ্রগুলোয় ট্যাব ব্যবহার না করা এবং ইভিএম প্রশিক্ষণ ও মক ভোটিংয়ে এ সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য আদিষ্ট হয়ে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’

 

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের কারও কারও মতে, ট্যাব ব্যবহারের আগে পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করার দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণেরও। কিন্তু ইসি থেকে এসবের কিছুই না করে অপরিকল্পিতভাবে ট্যাব কেনা হয়েছে। ইভিএমের বিষয়ে উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা যন্ত্রটির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য রাতারাতি ট্যাব কিনে তা মাঠ পর্যায়ে সরবরাহ করেন।

 

কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন, সব ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ভুল করতে পারেন না। ট্যাবের মধ্যেও সমস্যা আছে। ট্যাবটি দুই অঙ্কের হিসাব সঠিকভাবে সরবরাহ করে, তিন অঙ্কের হলেই হিসাব ভুলভাবে আসতে থাকে।

সরবরাহ করা ট্যাবের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইসি কর্মকর্তারা।

২০১৮ সালের ১৯ মার্চ কমিশনের ২২তম সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পাইলটিং হিসেবে কিছু ট্যাব কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এর আলোকে সে বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের জন্য ট্যাব কেনার প্রস্তাব করে ইসির আইসিটি অনুবিভাগ।

 

 


এই বিভাগের আরো খবর