ঢাকা, ০৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার, ২০২৬ || ২৬ মাঘ ১৪৩২
good-food

আমেরিকার ইতিহাসে আলোচিত ১১ নির্বাচন

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২২:০৩ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানেই পুরো বিশ্বের নজর আটকে থাকা এক মহাযজ্ঞ। আমরা সাধারণত ভাবি যে মানুষ ভোট দেবে আর যার ভোট বেশি সেই জয়ী হবে। কিন্তু আমেরিকার আড়াইশ বছরের ইতিহাসে এমন কিছু নির্বাচন হয়েছে যা সাধারণ যুক্তি বা বুদ্ধির বাইরে। কোথাও জেতার পর প্রার্থী মারা গেছেন আবার কোথাও জেলখানা থেকে প্রচারণা চালিয়ে লাখ লাখ ভোট পেয়েছেন প্রার্থী। আজকের ফিচারে আমরা জানব আমেরিকার ইতিহাসের এমন ১১টি অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর নির্বাচনের গল্প যা শুনলে আপনি সত্যি অবাক হবেন।

১. ১৮০০ সালের নির্বাচন: সংবিধান সংশোধন

আমেরিকার শুরুর দিকের এই নির্বাচনে টমাস জেফারসন এবং জন অ্যাডামসের লড়াই এতটাই অদ্ভুত ছিল যে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন করতে হয়েছিল। তখন নিয়ম ছিল যে ইলেকটোরাল কলেজের সদস্যরা প্রত্যেকে দুটি করে ভোট দেবেন। যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে সে হবে প্রেসিডেন্ট এবং যে দ্বিতীয় হবে সে হবে ভাইস প্রেসিডেন্ট। সমস্যা বাঁধল যখন জেফারসন এবং তার রানিং মেট অ্যারন বার দুজনেই সমান ৭৩টি করে ভোট পেলেন। টাই ভাঙার জন্য তখন কংগ্রেসের দ্বারস্থ হতে হলো। ফেডারেলিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন জেফারসন বা বার কাউকেই পছন্দ করতেন না। কিন্তু বারের তুলনায় জেফারসনকে তিনি কম ক্ষতিকর মনে করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত হ্যামিল্টনের প্রভাবে জেফারসন জয়ী হন। এই শত্রুতার রেশ ধরে কয়েক বছর পর এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে অ্যারন বার হ্যামিল্টনকে গুলি করে হত্যা করেন।

২. ১৮২৪ সালের নির্বাচন: “দুর্নীতির চুক্তি” অভিযোগ

এই নির্বাচনটি শুরু থেকেই ছিল অন্যরকম। তখন ফেডারেলিস্ট পার্টি বিলুপ্ত হওয়ার পথে এবং প্রধান চারজন প্রার্থীই ছিলেন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকান দলের। অ্যান্ড্রু জ্যাকসন পপুলার ভোট এবং ইলেকটোরাল ভোট দুটিতেই এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু কোনো প্রার্থীই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের ওপর। স্পিকার হেনরি ক্লে নিজে দৌড়ে পিছিয়ে পড়লেও তিনি জন কুইন্সি অ্যাডামসকে সমর্থন দেন। ফলে জ্যাকসন বেশি ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। অ্যাডামস ক্ষমতায় বসার পর হেনরি ক্লের হাতেই তুলে দেন সেক্রেটারি অফ স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। জ্যাকসন রেগে গিয়ে একে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চুক্তি হিসেবে আখ্যা দেন এবং পরের নির্বাচনে জিতে প্রতিশোধ নেন।

৩. ১৮৬০ সালের নির্বাচন: দেশ ভাঙন

আব্রাহাম লিঙ্কনের এই জয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং করুণ। এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে নির্বাচনের মূল লড়াই ছিল দাসপ্রথা নিয়ে। ডেমোক্রেটিক পার্টি নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ফলে ডেমোক্র্যাটদের থেকে দুইজন আলাদা প্রার্থী দাঁড়ান। লিঙ্কন মাত্র ৪০ শতাংশ পপুলার ভোট পেলেও উত্তরের রাজ্যগুলোর সমর্থনে জয়ী হন। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দক্ষিণ ক্যারোলিনা আমেরিকা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর ফলে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ যা আমেরিকাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

৪. ১৮৭২ সালের নির্বাচন: ভোটের আগেই প্রার্থীর মৃত্যু

ভিক্টোরিয়া উডহুল প্রথম নারী হিসেবে এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে লড়েন। তার সাথে ছিলেন প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ফ্রেডরিক ডগলাস। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের জনপ্রিয়তা তখন তলানিতে। তার দলেরই কিছু সদস্য আলাদা হয়ে হোরাস গ্রিলির পাশে দাঁড়ান। প্রচারণার মাঝামাঝি সময়ে গ্রিলির স্ত্রী মারা যান এবং তিনিও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন পরেই এবং ভোট গণনার আগেই গ্রিলিও মারা যান। আমেরিকার ইতিহাসে এটিই একমাত্র ঘটনা যেখানে একজন প্রধান প্রার্থী নির্বাচনের ঠিক পরেই মারা যান। গ্রিলির পাওয়া ভোটগুলো পরে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। গ্রান্ট সহজেই জিতে যান এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীর শেষকৃত্যে অংশ নেন।

৫. ১৯২০ সালের নির্বাচন: জেলখানা থেকে ভোটযুদ্ধ

এই নির্বাচনটি ছিল মূলত রিপাবলিকান ওয়ারেন জি হার্ডিং এবং ডেমোক্র্যাট জেমস কক্সের মধ্যে। হার্ডিং বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী ইউজেন ডেবস। ডেবস ১৯০০ সাল থেকে কয়েকবার নির্বাচন করেছিলেন। ১৯১৮ সালে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভাষণ দেওয়ার কারণে তাকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে দমে যাননি তিনি। ১৯২০ সালে আটলান্টা জেলখানায় বসেই তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রচারণা চালান। তার কয়েদি নম্বর ছিল ৯৬৫৩। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে জেলখানায় বন্দি থেকেও তিনি প্রায় নয় লাখ ভোট পেয়েছিলেন। এটি ছিল তার পঞ্চম এবং শেষ চেষ্টা। পরবর্তী বছর বড়দিন উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট হার্ডিং তার সাজা মওকুফ করে তাকে মুক্তি দেন।

৬. ১৯৪৮ সালের নির্বাচন: সংবাদপত্রের বিশাল ভুল

নির্বাচনের আগে সব জরিপ বলছিল যে হ্যারি ট্রুম্যান শোচনীয়ভাবে হারবেন এবং টমাস ডিউই বিশাল ব্যবধানে জিতবেন। নির্বাচনের দিন শিকাগো ডেইলি ট্রিবিউন পত্রিকা এতটাই নিশ্চিত ছিল যে তারা ফলাফল আসার আগেই বড় করে শিরোনাম ছাপে ডিউই ট্রুম্যানকে হারিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল উল্টো ঘটনা। ট্রুম্যান বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। ট্রুম্যানের সেই বিখ্যাত ছবি আজও ইতিহাস হয়ে আছে যেখানে তিনি ডিউই জেতার ভুয়া শিরোনামের পত্রিকাটি হাতে নিয়ে হাসছেন।

৭. ১৯৬০ সালের নির্বাচন: টেলিভিশনের জাদু

জন এফ কেনেডি এবং রিচার্ড নিক্সনের এই নির্বাচনটি ছিল আধুনিক প্রচারণার শুরু। প্রথমবারের মতো আমেরিকার মানুষ ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে নির্বাচনী বিতর্ক দেখার সুযোগ পায়। নিক্সন অসুস্থ ছিলেন এবং মেকআপ নিতে অস্বীকৃতি জানান। টিভিতে তাকে খুব ক্লান্ত এবং ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। অন্যদিকে কেনেডি ছিলেন ঝকঝকে এবং আত্মবিশ্বাসী। যারা রেডিওতে বিতর্ক শুনেছিলেন তারা ভেবেছিলেন নিক্সন ভালো করেছেন, কিন্তু যারা টিভিতে দেখেছিলেন তাদের কাছে কেনেডিই ছিলেন জয়ী। এই টিভি বিতর্কই কেনেডিকে সামান্য ব্যবধানে জিতিয়ে দেয়।

৮. ১৯৬৪ সালের নির্বাচন: বিজ্ঞাপনের লড়াই এবং বর্ণবাদ

এই নির্বাচনটি পরিচিতি পায় ডেইজি নামক একটি বিতর্কিত বিজ্ঞাপনের জন্য। বিজ্ঞাপনে একটি ছোট মেয়েকে ফুল ছিঁড়তে দেখা যায় আর তার পরেই পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ দেখানো হয়। এর মাধ্যমে লিন্ডন জনসন তার প্রতিপক্ষ ব্যারি গোল্ডওয়াটারকে একজন বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন। এছাড়া বর্ণবাদ এবং নাগরিক অধিকার এই নির্বাচনের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জনসন বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন এবং আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে যায়।

৯. ১৯৭২ সালের নির্বাচন: মানসিক চিকিৎসার কেলেঙ্কারি

ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জর্জ ম্যাকগভার্ন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন থমাস ইগলটনকে। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক পরেই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ইগলটন অতীতে বিষণ্নতার জন্য চিকিৎসা নিয়েছিলেন এবং তাকে ইলেকট্রোশক থেরাপি দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে এই খবরটি ভোটারদের মনে বিশাল প্রভাব ফেলে। চাপের মুখে ইগলটন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। এই ঘটনার কারণে ম্যাকগভার্ন মানুষের বিশ্বাস হারান এবং রিচার্ড নিক্সন ঐতিহাসিক ব্যবধানে জয়ী হন।

১০. ২০০০ সালের নির্বাচন: ফ্লোরিডার ব্যালট নাটক

জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং আল গোরের এই নির্বাচনটি ছিল আধুনিক সময়ের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা। পুরো নির্বাচনের ভাগ্য ঝুলে ছিল ফ্লোরিডার ওপর। ভোট গণনায় দেখা গেল বুশ মাত্র কয়েকশ ভোটে এগিয়ে আছেন।  সেখানে ভোটের ব্যবধান এতই কম ছিল যে বারবার গণনা করার প্রয়োজন পড়ে। ফ্লোরিডার পাঞ্চ কার্ড ব্যালট পেপারের ছিদ্র ঠিকমতো হয়েছে কি না তা নিয়ে শুরু হয় বিশাল বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ভোট গণনা বন্ধের নির্দেশ দেয় এবং বুশ মাত্র ৫৩৭ ভোটে ফ্লোরিডায় জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন। এটি ছিল আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম আইনি লড়াই।

১১. ২০২০ সালের নির্বাচন: বিতর্কের নতুন অধ্যায়

২০২০ সালের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের নির্বাচনেও উত্তেজনা চরমে ওঠে। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এই নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ট্রাম্প এবং বাইডেনের মধ্যে লড়াই এতটাই তীব্র ছিল যে ভোট গণনার পরও ট্রাম্প হার স্বীকার করতে রাজি হননি। তিনি ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। এমনকি ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়। জো বাইডেন শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেও এই নির্বাচন আমেরিকার সমাজে এক গভীর বিভাজন তৈরি করে যা আজও বিদ্যমান।

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার নির্বাচন কেবল ভোটের হিসাব নয়, বরং নাটক, ভুল সিদ্ধান্ত, মানবিক দুর্বলতা আর বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প। কখনো কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ঠিক করেছে, কখনো আদালত, কখনো সংবাদপত্র ভুল করেছে, কখনো আবার একটি টিভি বিতর্কই ফল বদলে দিয়েছে। তাই আমেরিকার নির্বাচন ইতিহাস আসলে গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ নাট্যমঞ্চ, যেখানে প্রতিটি ভোটের পেছনে আছে একটি গল্প।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর