ঢাকা, ২৯ মে শুক্রবার, ২০২০ || ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
good-food
১১০

মা মারা যান ৪ দিন আগে

তিপ্পান্নতেই বিদায় নিলেন ইরফান খান

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৪:৩৫ ২৯ এপ্রিল ২০২০  

গতকাল মঙ্গলবারই ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। পরদিন বুধবার সকালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন পর্দাকাঁপানো অভিনেতা ইরফান খান। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে। 
 

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, মাত্র চার দিন আগে তাঁর মা  জয়পুরে মারা যান। লকডাউনের কারণে সেখানে পৌঁছতে পারেননি ইরফান। তবে বেশ কিছু  সংবাদমাধ্যমের দাবি, অসুস্থতার জন্যই মায়ের শেষকৃত্যে যেতে পারেননি ভারতের এই শক্তিমান অভিনেতা।

 

বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের খবর অনুযায়ী, করোনভাইরাস লকডাউনের কারণে ইরফান মুম্বাই থেকে জয়পুর যেতে পারেননি, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মৃত মাকে শেষ বিদায় জানান তিনি।

 

তার পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরফান খান তার জীবনের শেষ সময়গুলো তার প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ছিলেন।”

এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইরফানের ব্যক্তিগত মুখপাত্র এক বিবৃতিতে ‘খান এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন’ বলে জানিয়েছিলেন।

ইরফানকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন এই মুখপাত্র। পরে ইরফানের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে তা নাকচ করেছিলেন তিনি।

ব্রেনে টিউমার নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে লড়াই করেছেন তিনি। সুস্থ হয়ে 'আংরেজি মিডিয়াম' ছবির মধ্যে দিয়ে কামব্যাকও করেছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার মুম্বইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে ভর্তি হন কোলন ইনফেকশন নিয়ে। আজ সকালে হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুই ছেলে আর আর স্ত্রীকে রেখে ইরফান পাড়ি দিলেন নতুন দুনিয়ায়।

 

অনুরাগীদের উদ্দেশে কিছুদিন আগে টুইটারে ইরফান লেখেন, “জীবনে জয়ী হওয়ার সাধনায় মাঝে মধ্যে ভালবাসার গুরুত্ব ভুলে যাই আমরা। তবে  দুর্বল সময় আমাদের তা মনে করিয়ে দেয়।  জীবনের পরবর্তী ধাপে পা রাখার আগে তাই খানিক ক্ষণ থমকে দাঁড়াতে চাই আমি। অফুরন্ত ভালবাসা দেওয়ার জন্য এবং পাশে থাকার জন্য আপনাদের সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। আপনাদের এই ভালবাসাই আমার যন্ত্রণায় প্রলেপ দিয়েছে। তাই ফের আপনাদের কাছেই ফিরছি। অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সকলকে।”

 

ফিরে এসেছিলেন ইরফান। তাঁর শেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘আংরেজি মিডিয়াম’ লকডাউনের জেরে থিয়েটার রিলিজ হয়নি।

 

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কখনও মুহূর্তের জন্য দুর্বল হননি তিনি। ইরফান সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন , ‘‘নমস্কার ভাই-বোনেরা। আমি ইরফান। আপনাদের সাথে একপ্রকার রয়েছি আবার নেইও! ‘আংরেজি মিডিয়াম’ ছবিটি আমার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করুন, যেভাবে ভালবেসে ছবিটা তৈরি করেছি, ঠিক সেভাবেই এর প্রচার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার শরীরে কিছু অযাচিত অতিথি এসে বাসা বেঁধেছে, তাদের সঙ্গেই আপাতত কথাবার্তা চলছে। দেখি কী হয়! যাই হোক না কেন, আপনাদের জানাব।’’

 

এর পরেই সেই ভিডিয়োতে ইরফান খানকে বেশ মজা করে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘প্রবাদ রয়েছে যে, ‘জীবন যখন আপনার হাতে লেবু ধরিয়ে দেবে ওটা দিয়ে লেমোনেড (শরবত) বানিয়ে খাওয়া উচিত।’ এমন বলা কিন্তু খুবই সহজ, কিন্তু বাস্তবে যখন সত্যি আপনার হাতে জীবন একটা লেবু ধরিয়ে দেবে ওটা দিয়ে ‘শিকাঞ্জি’ বানানোটা বড়ই কঠিন। বাস্তবটা খুবই মুশকিল। যদিও পজিটিভ ভাবনাচিন্তা নিয়ে বেঁচে থাকাই জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আশা করছি, এই ছবি থেকে আপনারা অনেক কিছু শিখতে পারবেন। আপনাদের যেমন হাসাবে, তেমন কাঁদাবেও। ট্রেলারের আনন্দ নিন এবং ছবিটা দেখুন। আর হ্যাঁ আমার জন্য অপেক্ষা করবেন।’’



ইরফান ১৯৬৭-র ৭ জানুয়ারি ভারতের জয়পুরে একটি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইরফানের মা, বেগম তন্ক হাকিম পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং এবং তার মরহুম পিতা জাগিরদার তন্ম জেলার বাসিন্দা ছিলেন সেখানে পাগড়ির ব্যবসা করতেন। তিনি ১৯৮৪ সালে নয়া দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) থেকে স্কলারশিপের অর্জন করেন, যদিও তিনি তখন এমএ ডিগ্রীর জন্য অধ্যয়নরত ছিলেন।

 

বড় হয়ে ইরফান খান প্রথমে ক্রিকেটার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার পর ছোটখাট ব্যবসার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। এরপর তিনি এম.এ কোর্সে ভর্তি হলেন। এম.এ কোর্সে পড়াশোনা চলাকালীন সময়েই ১৯৮৪তে ইরফানের কাছে আসে এক সুবর্ণ সুযোগ। তিনি নিউ দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপ সহ সুযোগ পেয়ে যান। সেখান থেকে তিনি ড্রামাটিক আর্টসে ডিপ্লোমা করেন। 

 

ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে পাশ করার পর ইরফান খান মুম্বইয়ে চলে যান। এখানে এসে তিনি টেলিভিশন সিরিয়াল দিয়ে নিজের কেরিয়ার শুরু করলেন, যদিও প্রথমদিকে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তিনি প্রথমদিকে টিউশন করিয়ে এবং মানুষের বাসায় এসি ঠিক করে দিতেন।

 

মুম্বইয়ে আসার পর তিনি একে একে অভিনয় করলেন চাণৌক্য, ভারাত এক খোঁজ, সারা জাহা হামারা, বানেগী আপনে বাত, চন্দ্রকান্ত, শ্রীকান্ত, আনুগুঞ্জ, স্টার বেস্টসেলারস ও স্পার্স নামক টিভি সিরিয়ালে। এর অনেকগুলোই ছিল দূরদর্শন এবং স্টার প্লাসের মত বড় বড় টিভির সিরিয়াল। স্টারপ্লাসের ‘ডার’ নামক এক সিরিজের প্রধান ভিলেন ছিলেন ইরফান। এতে তিনি কে কে মেননের বিপরীতে এক সাইকো সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ ভাবে তিনি থিয়েটার আর টিভি সিরিয়ালের মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন।

 

১৯৮৮ সালে এসে তাঁর কেরিয়ার নতুন দিকে মোড় নেয়া শুরু করে। ডিরেক্টর মিরা নায়ের তাঁকে তাঁর সিনেমা সালাম বোম্বেতে একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল তার চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত ফিল্মের এডিটিংয়ে বাদ চলে যায়। সালাম বোম্বে সিনেমাটি পরে ইন্ডিয়া থেকে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। সিনেমাটি ইন্ডিয়ার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতেছিল। তবে সিনেমার এডিটিংয়ে তাঁর চরিত্র বাদ পড়লেও থেমে থাকেননি ইরফান খান।

 

অবশেষে স্ত্রী সুতপা সিকদার ও দুই সন্তান, বাবিল ও আয়ান খানকে রেখে ৫৩ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই খ্যাতিমান অভিনেতা।